সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মানস চক্রবর্ত্তী – ২৭

মর্তকায়ার অন্তরালে
পরে অবশ্য তাঁর মত পরিবর্তন হয় | মত পরিবর্তনের একটা কারণ দেশভাগও হতে পারে | যদিও তিনি দেশভাগের অব্যবহিত পূর্বেই চলে এসেছিলেন | কিন্তু তিনি বরিশালে থাকতেই ১৫ আগস্ট দেশ বিভাজনের সিন্ধান্ত শুনে তিনিও বোধহয় দেশ( বরিশাল) ত্যাগের সিন্ধান্ত নেন | স্মরণ রাখতে হবে তিনি কিন্তু বরিশালের চাকরিতে পুরোপুরি ইস্তফা দিলেন না | যদি কলকাতায় তেমন কোনো সুবিধা করতে না পারেন তবে আবার বরিশালেই ফিরে আসবেন |
উঠলেন ১৮০নং ল্যান্সডাউন রোডে ছোটো ভাই অশোকানন্দের কাছে | কবি এই সময় কাজের অনুসন্ধান করতে লাগলেন দু’ভাবে | প্রথমত- পুরাতন ও পরিচিত বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যামে কাজের অন্বেষণ | আর দ্বিতীয়ত- খবরের কাগজে চাকরির বিজ্ঞাপনে দরখাস্ত করা |
কয়েকমাস পরে তাঁর একটি কাজ জুটল ‘স্বরাজ’ পত্রিকায় | নেপথ্যে ছিলেন ‘পূর্বাশা’র সম্পাদক সঞ্জয় ভট্টাচার্য | রবিবারের সাহিত্য বিভাগে সম্পাদনার দায়িত্ব পেলেন | মন্দভাগ্য কবির | পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলো | আবার বেকার হলেন জীবনানন্দ |
ভরা সংসার,এদিকে দু’আড়াই বছর বেকার | আয়ের উৎস বলতে কয়েকটা টিউশনি এবং কাগজে লিখে কিঞ্চিৎ উপার্জন |
আত্মসম্মানে হয়তো আঘাত লেগেছিল তবুও তিনি বরিশাল কলেজের সহকর্মী নরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের কাছে গিয়েছিলেন অধ্যাপনার সুযোগ যাতে হয় | নরেন্দ্রবাবু তখন দমদম মতিঝিল কলেজের অধ্যক্ষ | আত্মসম্মানের প্রসঙ্গ এ’কারণেই তোললাম নরেন্দ্রবাবু জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে কম ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেননি | যাইহোক চাকরি হলো না |
এ সময় তিনি আর একটি কাজ করেছিলেন | অনুমান করা যেতে পারে আত্মসম্মানী মানুষ হয়ে তিনি এটি স্বতর্স্ফুত ইচ্ছায় করেননি | বাধ্য হয়েই করেছিলেন | চাকরির আবেদন পত্রে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের রেফারেন্স | অচিন্ত্যকুমার সেনকে ১৩.৬.৪৯ তারিখে লেখা চিঠিতে এর উল্লেখ আছে | “….আমি বিশেষ কোনো কাজ করছি না আজকাল | লিখে পড়িয়ে অল্প-স্বল্প রোজগারেই চলে যাচ্ছে | একটি চাকরির জন্য দরখাস্ত করেছিলাম | রেফারেন্স চেয়েছিল – তার ভেতরে তোমার নাম দিয়েছি |”৯ তখন বন্ধু অচিন্ত্যকুমার আসানসোলের সাবজর্জ |
এবারেও চাকরি হলো না | তবে সাহিত্যের কাজও বন্ধ হলো না | তিনি এইসময় ‘সমকালীন সাহিত্য কেন্দ্র’র সহসভাপতি হয়েছিলেন | কিন্তু দরখাস্ত দেওয়ার কাজও সমানে চলতে লাগল | অবশেষে ভাগ্য কিছুটা সুপ্রসন্ন হলো | মেদিনীপুরের খড়গপুর কলেজে অধ্যাপনার সুযোগ পেলেন |
এবারে যে ঘটনাটির কথা উল্লেখ করব সেটি বোধহয় অচিন্ত্যবাবুর জানা ছিল না, নাহলে তিনি জীবনানন্দ সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতেন | জীবনানন্দ তখন খড়গপুরে চাকরি নিয়ে কলেজের হস্টেলে আছেন | কোনো ছুটি পেলে কলকাতার বাড়িতে আসতেন | এইরকম এক ছুটিতে তিনি বাড়ি এসেছেন | এসেই দেখেন স্ত্রী লাবণ্য অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন | জীবনানন্দ ছোটো ভাই অমলানন্দ দাশকে খবর পাঠালেন | অমলানন্দ তখন মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি করেন | অমলানন্দ এসেই পরীক্ষা করে বলেন -‘অ্যানজাইনা’ | অতএব নড়াচড়া বন্ধ | বৌদির দিকে তাকিয়ে কৌতুক করে বলেন : “বৌদিকে দড়ি দিয়ে খাটের সঙ্গে কয়েকদিনের জন্য বেঁধে রেখে দিন |”১০
স্ত্রীকে সুস্থ করার জন্য জীবনানন্দ প্রথমে কলেজ ছুটির দরখাস্ত লিখলেন | ছুটি মঞ্জুর হলো | কিন্তু লাবণ্যদেবী কোনোমতেই সুস্থ হচ্ছেন না | এদিকে ছুটিও শেষ হয়ে আসছে | জীবনানন্দ স্ত্রীকে একা রেখে যেতে সাহস পেলেন না | কারণ রোগীর সেবা করার মতো নিকট আত্মীয়-পরিজন কেউ ছিলেন না | বাধ্য হয়েই তিনি অনিশ্চিত জীবনকে মেনে নিলেন | কলেজের চাকরিটা ছেড়ে দিলেন | স্মরণ রাখতে হবে স্ত্রী লাবণ্যময়ী টানা চারমাস অসুস্থ ছিলেন |
উপরের ঘটনাটি ১৯৫০এর | ১৯৫২ তে তিনি যোগদান করলেন বড়িষা কলেজের অস্থায়ী অধ্যাপকের চাকরিতে | মাঝের বছর দুয়েক তিনি বেকার ছিলেন | কিন্তু এবারেও তাঁর ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না | চারমাস পরে চাকরিটা চলে গেলো | অভিযোগ মূলত দুটি | প্রথমত- তিনি পড়াতে পারেন না | দ্বিতীয়ত- বয়স জনিত অসুস্থতা |
তথ্যপ্রমাণ এই দুটি যুক্তিকেই ভ্রান্ত প্রমাণ করেছে | ‘জীবনানন্দ’ গ্রন্থের লেখক গোপালচন্দ্র রায় একদিন জীবনানন্দের ভাইয়ের স্ত্রী নলিনীদেবীর বান্ধবী, যিনি জীবনানন্দকে চাকরিটি পেতে সাহায্য করেছিলেন তাঁর কাছে গিয়েছিলেন | মহিলাটির দাদা ছিলেন বড়িষা কলেজের অধ্যক্ষ | গোপালবাবু উপরের দুটি তথ্য ঐ মহিলার কাছ থেকেই পান |
তিনি পড়াতে পারতেন না এর বিরুদ্ধাচরণ করে দুটি ঘটনার উল্লেখ করব |`হাওড়া গার্লস কলেজের ৪র্থ বার্ষিক শ্রেণির এক ছাত্রীর স্বীকারোক্তি : “মুখের উপর বিরাট গাম্ভীর্য, চোখে জ্ঞানের গভীরতা সমস্তটা মিলিয়ে একটা সম্ভ্রম জাগায় | র ্যালের একটি দুর্বোধ্য প্রবন্ধ তিনি পড়াচ্ছিলেন | অবাক হয়ে গেলাম তাঁর পড়ানোর পদ্ধতিতে | প্রতিটি কথাকে তিনি বিভিন্ন ইংরাজিতে সাত কি আটবার বলছিলেন আমাদের বোঝাবার জন্য | অপূর্ব তাঁর পড়ানো, চেষ্টা করেও কেউ অন্যমনস্ক হয়ে যেতে পারবে না | তাঁর আকর্ষণীয় বাক্ ভঙ্গি সরিয়ে আনবে তাকে অন্যমনস্কতা থেকে | চমক ভাঙ্গলো, রেজিস্টার হাতে উঠে দাঁড়ালেন | তারপর বেরিয়ে গেলেন ক্লাস হতে | কখন ঘন্টা পড়ে গিয়েছে, জানতে পারিনি; কোন্ এক কল্পনার রাজ্যে চলে গিয়েছিলাম তাঁর বক্তৃতার মাঝ দিয়ে | বক্তৃতার শেষে আবার আমাকে ফিরিয়ে আনলো এই বাস্তব পরিবেশে |”১১
ক্রমশ….