সাপ্তাহিক ধারাবাহিক প্রবন্ধে মানস চক্রবর্তী – ১৯

শিক্ষয়িত্রী নিবেদিতা  
“যত্র নার্যস্তু পূজ্যন্তে রমন্তে তত্র দেবতাঃ” – এ স্বয়ং ঋষি( মনু ) বাক্য | স্বামীজির কণ্ঠে একইৌ সুর , “আমাদের দেশ সকলের অধম কেন , শক্তিহীন কেন ? – শক্তির ( নারীজাতীর ) অবমাননা সেখানে বলে |” ” শক্তি বিনা জগতের উদ্ধার হবে না ” – এ স্বামীজির দৃঢ় অভিমত | কিন্তু উন্নতি সাধনের পন্থা-পদ্ধতি নিয়ে অন্যান্য সমাজ সংস্কারক গণের সঙ্গে স্বামীজির মৌলিক পার্থক্য ছিল | “নানা সম্প্রদায় কর্তৃক গৃহীত সমাজ সংস্কারের উপায়গুলি গ্রহণ অথবা উহা লইয়া আন্দোলনের পক্ষপাতী তিনি একেবারেই ছিলেন না | নারীজাতী ও নিম্নশ্রেণির লোকদিগকে শিক্ষাদান পর্যন্তই অপরের অধিকার ; তাহাদের ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত সকল প্রশ্নের মীমাংসার ভার তাহাদের নিজেদের উপর | নারীগণ কিরূপ জীবনযাপন করিবে – বাল্যবিবাহ থাকিবে কি না , বিধবাবিবাহের প্রয়োজন আছে কি না , অথবা যথাযথ শিক্ষালাভের পর কেহ কৌমার্যব্রত অবলম্বন পূর্বক নিজের জীবন উৎসর্গ করিবে কি না – এ সকল সমস্যার সমাধানের ভার নারীগণের উপর |”

১  

স্বামীজি ভারতবর্ষের মেয়েদের ও নিম্নশ্রেণির লোকেদের উন্নতি সাধনের কথা বললেন | আর তার একমাত্র উপায় শিক্ষা | তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন , “ভারতের ভবিষ্যৎ ভারতের পুরুষের চেয়ে নারীর উপর বেশি নির্ভর করছে |” স্বামীজি নারীগণের দুইটি চিত্র দেখলেন | পাশ্চাত্য নারীগণের বিদ্যা , বুদ্ধি , পবিত্রতা , সর্বোপরি স্বাধীনতা অন্যদিকে ভারতীয় নারীগণের দুঃখজনক পরিস্থিতি | স্বামীজির মনে হলো ভারতবর্ষীয় নারী সমাজের জন্য প্রয়োজন এমন একজন নারীর যাঁর মধ্যে থাকবে মায়ের হৃদয় আর বীরের দৃঢ়তা | সে হবে সেবিকা , বান্ধবী ও মাতা | নিবেদিতার প্রতি স্বামীজির আশীর্বাণী থেকেই তা স্পষ্ট –
        “মায়ের হৃদয় আর বীরের দৃঢ়তা ,
          মলয় সমীরে যথা স্নিগ্ধ মধুরতা ,
          যে পবিত্র- ক্লান্তি , বীর্য , আর্য-বেদিতলে ,
          নিত্য রাজে , বাধাহীন দীপ্ত শিখানলে ;
          এ সব তোমার হোক – আরও হোক শত
          অতীত জীবনে যা ছিল স্বপ্নাতীত ;
          ভবিষ্যৎ ভারতের সন্তানের তরে
          সেবিকা , বান্ধবী , মাতা তুমি একাধারে |
এই আশীর্বাণীতে স্পষ্ট অনন্ত করুণা ও প্রেমের সঙ্গে হৃদয়ের সমস্ত শক্তি দ্বারা সেবায় জীবন উৎসর্গ করবার মন্ত্র | মার্গারেটের জীবনে এই আশীর্বাদ জীবন্ত রূপ নিয়েছিল – সে কথায় পরে আসছি |
মার্গারেটকে দেখার পর স্বামীজির মনে হলো এই সেই নারী | মার্গারেটকে আহ্বান জানিয়ে স্বামীজি লিখলেন , “ভারতের জন্য বিশেষত: নারী সমাজের জন্য পুরুষ অপেক্ষা নারীর , একজন প্রকৃত সিংহীর প্রয়োজন |  ভারতবর্ষ এখনও মহীয়সী নারীর জন্মদান করতে  পারছে না , তাই অন্য জাতি থেকে তাঁকে ধার করতে হবে | তোমার শিক্ষা , ঐকান্তিকতা , পবিত্রতা , অসীম ভালোবাসা , দৃঢ়তা – সর্বোপরি তোমার ধমনীতে প্রবাহিত কেল্টিক রক্তের জন্য তুমি ঠিক সেইরূপ নারী , যাকে আজ প্রয়োজন |”২
ঠিক তারপরেই লিখলেন , “কিন্তু বিঘ্নও আছে বহু | এদেশের দুঃখ , কুসংস্কার , দাসত্ব প্রভৃতি কি ধরণের , তা তুমি ধারণা করতে পার না | এদেশে এলে তুমি নিজেকে অর্ধ-উলঙ্গ অসংখ্য নর-নারীতে পরিবেষ্টিত দেখতে পাবে | তাদের জাতি ও স্পর্শ সম্বন্ধে বিকট ধারণা ; ভয়েই হোক বা ঘৃণাতেই হোক – তারা শ্বেতাঙ্গদের এড়িয়ে চলে এবং তারাও এদের খুব ঘৃণা করে | পক্ষান্তরে , শ্বেতাঙ্গেরা তোমাকে খামখেয়ালী মনে করবে এবংতোমার প্রত্যেকটি গতিবিধি  সন্দেহের চক্ষে দেখবে |
তা ছাড়া জলবায়ু অত্যন্ত গ্রীষ্মপ্রধান | এদেশের প্রায় সব জায়গায় শীতই তোমাদের গ্রীষ্মের মতো ; ……….শহরের বাইরে কোথাও ইওরোপীয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য কিছুমাত্র পাবার উপায় নেই | এসব সত্ত্বেও যদি তুমি কর্মে প্রবৃত্ত হতে সাহস কর , তবে অবশ্য তোমাকে শতবার স্বাগত জানাচ্ছি |”৩
নিবেদিতাও এইরকম একটি আহ্বানের প্রতীক্ষাতেই ছিলেন | ভারতবর্ষে আসার আগে নিবেদিতা শিক্ষকতাই করতেন | কেউ তাঁর পরিচয় জিজ্ঞাসা করলে বলতেন , “আমি শিক্ষয়িত্রী |” তিনি নিজেকে শিক্ষয়িত্রী রূপেই নিবেদন করতে চেয়েছিলেন | এই হলো নিবেদিতার ভারতবর্ষে শিক্ষয়িত্রী হবার প্রেক্ষাপট |
শিক্ষয়িত্রী হিসাবে স্বামীজির নিবেদিতাকে বেছে নেওয়ার আরো কারণ আছে | শিক্ষাক্ষেত্রে স্বামীজি এমন  একজন নারী চেয়েছিলেন যে এর (শিক্ষার) জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত | “এই সকল ব্রতধারিণীর নিকট কর্মক্ষেত্রই গৃহ এবং ধর্মই একমাত্র বন্ধন হইবে এবং তাহাদের ভালোবাসা থাকিবে কেবল গুরু , স্বদেশ ও জনসাধারণের প্রতি |” ৪ এ’রূপ নারীর যথেষ্ট অভাব ছিল তখন ভারতবর্ষে | তাই নিবেদিতাকে দেখার পর তাঁরই নাম সর্বাগ্রে মনে এসেছিল স্বামীজির |
স্বামীজির ইচ্ছানুসারে বাগবাজারে নিবেদিতার বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ১৩ নভেম্বর এক কালীপূজার দিন | স্বামীজি , স্বামী ব্রহ্মানন্দ , স্বামী সারদানন্দ প্রমুখ রামকৃষ্ণ সংঘের সন্ন্যাসীদের উপস্থিতিতে ও শ্রী শ্রী মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে বিদ্যালয়ের কাজ শুরু হয় ১৪ নভেম্বর সোমবার |
প্রতিদিন বিদ্যালয় আরম্ভের পূর্বে মেয়েরা ঠাকুরদালানের টেবিলের উপরে রাখা শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণের প্রতিকৃতিতে পুষ্পাঞ্জলি , প্রণাম ও স্তবপাঠের পর বন্দেমাতরম গানটি গাইত | তারপর প্রাত্যহিক পঠন-পাঠন শুরু হতো |
প্রথম প্রথম স্কুলে পড়ানোর জন্য কোনও নির্দিষ্ট বই ছিল না | কিণ্ডার গার্টেন প্রণালিতে মুখে মুখে শিক্ষা দেওয়া হতো | পঠিত বিষয়গুলো হলো – বাংলা , ইংরেজি , ব্যাকরণ , অঙ্ক , ইতিহাস , ভূগোল , সংস্কৃত | সঙ্গে ছিল খেলাধূলা , ছবি আঁকা , সেলাই , তুলির কাজ , মাটির কাজ , পেপার ফোল্ডিং | নিবেদিতা নিজে প্রত্যহ অঙ্কন ও সেলাই এর ক্লাস নিতেন |
পাঠ নেওয়ার সময় তাঁর নিয়ম ছিল , যে ছাত্রীকে প্রশ্ন করা হবে সে ছাড়া অন্য কেউ উত্তর দেবে না | এর অন্যথা হলে তিনি খুব বিরক্ত হতেন |

( চলবে )

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।