সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মানস চক্রবর্ত্তী – ১৪

মর্তকায়ার অন্তরালে
|| ১৪ ||
১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ৩০অক্টোবর রিজনি ম্যানর থেকে বিবেকানন্দ তাঁর স্নেহের ভগিনি মিস মেরী হেলকে এক দীর্ঘ পত্র লেখেন | লিখছেন : “কিন্তু রক্ত শোষণই যেখানে মূল উদ্দেশ্য, সেখানে মঙ্গলকর কিছু হতে পারে না | মোটের উপর, পুরান শাসন জনগণের পক্ষে এর চেয়ে ভাল ছিল, কারণ তা তাদের সর্বস্ব লুট করে নেয়নি এবং সেখানে অন্ততঃ কিছু সুবিচার – কিছু স্বাধীনতা ছিল |” তারপর আরো লিখলেন: “কয়েকশ অর্ধশিক্ষিত, বিজাতীয়, নব্যতন্ত্রী লোক নিয়ে বর্তমান বিট্রিশ ভারতের সাজান তামাশা – আর কিছু নয় | মুসলমান ঐতিহাসিক ফেরিস্তার মতে দ্বাদশ শতাব্দীতে হিন্দুর সংখ্যা ছিল ৬০কোটি, এখন ২০কোটিরও নিচে |” ১৩
ইংরেজ রাজত্বের কুফল সম্পর্কে বলতে গিয়ে লিখলেন : “ইংরেজ বিজয়ের কালে কয়েক শতাব্দী ধরে যে সন্ত্রাসের রাজত্ব চলেছিল , ব্রিটিশ শাসনের অবশ্যম্ভাবী পরিণামরূপে ১৮৫৭ ও ১৮৫৮ খ্রীষ্টাব্দে যে বীভৎস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে এবং তার চেয়েও ভয়ানক যে-সকল দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছে (দেশীয় রাজ্যে কখনও দুর্ভিক্ষ হয়নি), তা লক্ষ লক্ষ লোককে গ্রাস করেছে | ……….বর্তমান জনসংখ্যার অন্ততঃ পাঁচগুণ লোককে সহজেই ভরণপোষণ করার মতো জীবিকা ও উৎপাদনের সংস্থান ভারতে আছে – যদি সব কিছু তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া না হয় |” ১৪
আর কোনো দেশনেতা, দেশপ্রেমিক ইংরেজশাসনের অর্থনৈতিক কুফলের কথা এইভাবে বলেছেন ?
মেরী হেলকে আরো লিখলেন : “এই তো অবস্থা – শিক্ষাবিস্তারও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অপহৃত, (অবশ্য আমাদের নিরস্ত্র করা হয়েছে অনেক আগেই) যেটুকু স্বায়ত্তশাসন কয়েকবছর জন্য দেওয়া হয়েছিল, অবিলম্বে তা কেড়ে নেওয়া হয়েছে | দেখছি, আরও কী আসে ! কয়েক ছত্র সমালোচনার জন্য লোককে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, বাকিরা বিনা বিচারে জেলে | কেউ জানে না, কখন কার ঘাড় থেকে মাথা উড়িয়ে দেওয়া হবে |” এর ঠিক পরেই লিখলেন : “ভারতবর্ষে কয়েক বছর ধরে চলেছে ত্রাসের রাজত্ব | ব্রিটিশ সৈন্য আমাদের পুরুষদের খুন করছে, মেয়েদের মর্যাদা নষ্ট করছে, বিনিময়ে আমাদেরই পয়সায় জাহাজে চড়ে দেশে ফিরেছে পেনসন ভোগ করতে | ভয়াবহ নৈরাশ্যে ডুবে আছি | কোথায় সেই ভগবান ? মেরী, তুমি আশাবাদী হতে পার, কিন্তু আমি কি পারি ? ধর এই চিঠিখানাই যদি তুমি প্রকাশ করে দাও – ভারতের নূতন কানুনের জোরে ইংরেজ সরকার আমাকে এখান থেকে সোজা ভারতে টেনে নিয়ে যাবে এবং বিনা বিচারে আমাকে হত্যা করবে |” ১৫
বিট্রিশদের উপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে বিবেকানন্দ বলেছিলেন : “ইংরেজরা ভারতকে দিয়েছে তিনটি ‘ব’- বাইবেল, ব্র্যাণ্ডি আর বেয়নেট |” ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে এত কঠোর সমালোচনা আর কোন্ সন্ন্যাসীর মুখে শোনা গেছে ?
স্বামীজি তৎকালীন কংগ্রেস সরকারের আবেদন – নিবেদন নীতিকে পছন্দ করতেন না | খোদ লণ্ডনে বসেই তিনি বলছেন : “ভারতের লোকগুলো কংগ্রেস কংগ্রেস করে মিছিমিছি হৈ চৈ করছে কেন ? কতকগুলো হাউড়ে লোক এক জায়গায় জুটে কেবল গলাবাজি করলেই কি কাজ হয় ? চেপে বসুক, নিজেদের independent বলে declare করুক, হেঁকে বলুক, ‘আজ থেকে আমরা স্বাধীন হলাম’ , আর সমস্ত স্বাধীন Government কে নিজেদের Declaration পত্র পাঠিয়ে দিক, তখন একটা হৈ চৈ উঠবে | ….কেবল গলাবাজিতে কাজ হয় ? বেপরোয়া হয়ে কাজ করতে হবে | বিধিমতে কাজ করে যাব, তাতে যদি গুলি বুকে পড়ে, প্রথমে আমার বুকে পড়ুক |” ১৬
ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে স্বামীজি অহিংসাবাদী ছিলেন না | সশস্থ বিপ্লবেই স্বামীজির আস্থা ছিল | “মাকে রুধির দিয়ে পূজা করব | ….রুধির নইলে কি মার তৃপ্তি হয় ? মাকে বুকের রক্ত দিয়ে পূজা করতে হয়; তবে তিনি প্রসন্না হন | একি আলোচাল আর কাঁচকলার কর্ম ! মার ছেলে বীর হবে – মহাবীর হবে | নিরানন্দে, দুঃখে, প্রলয়ে, মহালয়ে ছেলে অভীঃ নির্ভীক হয়ে থাকবে |” ১৭
||২ ||
বিবেকানন্দের আলোকে উদ্ভাসিত বিপ্লবী সাধকগণ
বিপ্লবীদের গোপন পত্র পত্রিকার শীর্ষে থাকত বিবেকানন্দের মন্ত্রবাণী , “Arise, awake and stop not till goal is reached.” ( Tegart Report, dated 22.4.1914