সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মানস চক্রবর্ত্তী – ২১

মর্তকায়ার অন্তরালে

এক পড়ুয়া সন্ন্যাসীর কথা

||২১||
আজ এমন একজন পড়ুয়া সন্ন্যাসীর কথা আলোচনা করব যাঁর বিদ্যানুরাগ সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে একটি শিক্ষনীয় বিষয় হতে পারে | তিনি ছিলেন ধর্মবিজ্ঞানী | পৃথিবীতে বিজ্ঞান ও বেদান্তের সমন্বয় সাধক | তিনি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের এয়োদশ অধ্যক্ষ স্বামী রঙ্গনাথানন্দজি মহারাজ |

মহারাজ বলতেন : “একটি উচ্চজীবন যাপন করা এবং ভাব প্রচার করা- এটিই আমাদের দায়িত্ব | এটাই আমাকে পড়তে এবং মুখস্ত করতে আগ্রহ জুগিয়েছে |”১

তিনি পড়তেন কেন ? উত্তরে বলতে হয় – একটি সৃজনশীল জীবনযাপন করার জন্য | শুধু পড়তেন না, বলতে হবে মুখস্ত করতেন | মানে আত্মস্থ করতেন |

তিনি বইগুলোকে বারংবার পড়ছেন | ক্লান্তহীন ভাবে পড়ছেন | অসক্তানন্দ মহারাজকে জানাচ্ছেন, “জানো, স্বামীজীর ‘complete work ‘ আমি কমপক্ষে একশোবার পড়েছি |২ আরো জানাচ্ছেন, ” ‘মদীয় আচার্যদেব’ পড়েছি পঁচিশবার, ‘ভারতের ভবিষ্যৎ’ ত্রিশবার |”৩ স্বামীজির বাণী ও রচনার অনেকগুলি ভাষণ তিনি অন্তত কুড়িবার পড়েছেন |

সাধুজীবনের গোড়াতেই যে বইগুলি তিনি পড়েছিলেন সেইগুলির লিস্ট করলে মোটামুটি এই রকম দাঁড়ায় – A.J.Thompson _এর ‘Introduction to Science’ , H.G.Wells এর ‘Outline of History’, Julian Huxley এবং H.G.Wells এর ‘The Science of Life’, McDougall এর ‘Introduction to Social Psychology’, Herbert Spencer এর ‘First Principles ও Thillyএর ‘History of Philosophy’ |

আর মুখস্তর ব্যাপারে যদি বলতেই হয় তাহলে বলব- সম্পূর্ণ ভগবদগীতাটাই তাঁর মুখস্ত ছিল | এবং কথা বলার সময় স্বামীজির বাণী ও রচনা, উপনিষদ, শাঙ্করভাষ্য থেকে অনর্গল উদ্ধৃতি দিতে পারতেন |

জীবনের শেষের দিকে শরীর খুব অসুস্থ | ডাক্তারের পরামর্শে বিশ্রামে আছেন | তখনও তিনি সাত আট ঘণ্টা ধরে বই পড়ছেন | তাঁর কাছে ‘অধ্যয়নং তপঃ’ ছিল ধ্যেয় বাক্য |

তাঁর পড়ার যে সারকেল সেটা বড়ো কম কথা ছিল না | স্বামী বেদস্বরূপানন্দ মহারাজের কথা এই প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য : “নবাগত ব্রহ্মচারীগণ বেলুড়মঠের ট্রেনিং সেণ্টারে থাকাকালীন যাতে বিরল প্রকাশনার মূল্যবান সব বই পড়তে পারেন, তার জন্য ওখানে তিনি প্রায় সাড়ে তিন হাজার বই এর একটি লাইব্রেরি রাখেন তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে | ঐ সব বই-ই তিনি খুব ভালভাবে পড়েছেন এবং যে কোনও বইয়ের যে কোনও বিষয় অনায়াসে মনে রাখতে পারতেন |”৪

তাঁর এই যে অদ্ভুত স্মৃতি, অসম্ভব মনে রাখার ক্ষমতা- এর কি কোনো রহস্য আছে, না সবটাই দৈবী কৃপা ? প্রব্রাজিকা শ্রীকান্তপ্রাণার স্মৃতিচারণায় এই প্রসঙ্গের উল্লেখ আছে | মহারাজকে বিনীতভাবে এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হয় – মহারাজ, আপনি যাই-ই পড়েন সবকিছু এত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ছবির মতো মনে রাখেন কী করে ? মহারাজ তাঁর উত্তরে বলেন: “দেখো এটি খুব কঠিন কিছু নয় | শুধু তোমাকে দেখতে হবে, যে বিষয়টা তুমি মনে রাখতে চাও, শুধু সেটিই তুমি গ্রহণ করছ, অন্য কিছু নয় | যেমন কোনও নির্দিষ্ট ছবির ক্ষেত্রে তুমি শুধু সেই ছবিটাকেই দেখবে তার বাইরে কোনও কিছু তুমি দেখবে না |”৫

তাঁর এই অদ্ভুতভাবে স্মৃতিতে সবকিছু ধরে রাখার আর একটি কারণ হয়তো তাঁর পড়ার ধরণ , পড়ার আঙ্গিক | কখন বইটি পড়া শুরু করলেন এবং কখনই বা শেষ করলেন, তা পাতার মধ্যেই লিখে রাখতেন | অনেক ক্ষেত্রে দাগ দিয়ে রাখতেন |

এই অদ্ভুত স্মৃতিশক্তির আর একটি উল্লেখযোগ্য কারণ পড়ায় তাঁর ধ্যানমগ্নতা | স্বামী ঋতানন্দ এই প্রসঙ্গে এক জায়গায় লিখছেন : “মহারাজ তখন দিল্লিতে | এক ছুটির দিন দুপুরবেলা তাঁর স্নেহভাজন একজন স্বেচ্ছাসেবককে মহারাজ তাঁর ঘরের বই এর আলমারী ও র ্যাক গুলো গুছিয়ে দিতে বলেন | তিনি সেই ঘরেই তাঁর বিছানায় শুয়ে একটি বই পড়ছিলেন | এদিকে মই বেয়ে উপরের র ্যাকের বই গোছাতে গোছাতে অতর্কিতে উক্ত স্বেচ্ছাসেবক মই এবং র ্যাক আলগা হয়ে সমস্ত বইসুদ্ধ একেবারে মাটিতে পড়ে যায় | প্রচণ্ড শব্দ হওয়ায় আশেপাশের ঘর থেকে সাধু-ব্রহ্মচারী ও আশ্রম কর্মীরা ছুটে আসে এবং স্বেচ্ছাসেবককে তুলে উঠায় | মহারাজ এত নিবিষ্টমনে বই পড়ছিলেন যে এত বড় কাণ্ড কিছুই বুঝতে পারেননি | ওপাশ থেকে এপাশ ফিরে শুধু দেখলেন নীচে অনেক বই পড়ে রয়েছে |”৬

Home study ( স্বশিখন) দ্বারা মানুষ যে কোন্ উচ্চতায় উঠে যেতে পারেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলেন রাম মহারাজ ও স্বামী রঙ্গনাথানন্দজি মহারাজ | কারণ মহারাজজির ডিগ্রি হলো স্কুলের শেষ পরীক্ষা | কিন্তু যদি আমরা একটি তথ্যের দিকে তাকাই তাহলে আমরা বিস্মিত না হয়ে পারি না তাঁর প্রগাঢ় পাণ্ডিত্যে | ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জুলাই থেকে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৬৯ পর্যন্ত ভারতীয় সংস্কৃতির দূত হিসাবে মহারাজ বিশ্ব ভ্রমণ করেন এবং এটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে বড়ো সফর | ধর্মসমন্বয় ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের বাণী প্রচার সংক্রান্ত অভিজ্ঞতার কথা সঞ্চিত আছে ‘A pilgrim Looks at the World'( 2 vols) গ্রন্থে | এই সফরে বক্তৃতা ও প্রশ্নোত্তর অধিবেশনের মোট সংখ্যা ৯৩৪টি | যার মধ্যে ৯০টি ছিল টেলিভিশনে, রেডিও ও সংবাদপত্রের সাক্ষাৎকার, ৩০টি হয়েছিল গির্জা ও মন্দিরে, ১৪১টি বেদান্ত সোসাইটি ও রামকৃষ্ণ আশ্রমে, ১৫৬টি ব্যক্তিগত মহলে, ১৯৭টি হয়েছিল প্রকাশ্য আলোচনাসভাতে এবং ৩২০টি হয় ১১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ে | অন্য আর একটি তথ্য – ১৯৬৪ থেকে ৬৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি Indian National Commission for Co-operation with UNESCOকমিশনের সদস্য ছিলেন | এই সফরকালে তিনি বিশ্বের পঞ্চাশটির বেশি দেশে ভ্রমণ করেছেন কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৬র ৩১অক্টোবর তদানীন্তন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী রাজীব গান্ধীর কাছ থেকে প্রথম ইন্দিরা গান্ধী পুরস্কার পান | এই সব তথ্য তুলে ধরার পিছনে যুক্তি – তাঁর প্রজ্ঞার পরিচয় | অথচ ডিগ্রি স্কুলের শেষ পরীক্ষা | তাহলে আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি এটা তাঁর স্বশিখনের ফল | এই স্বশিখনের কথা স্বামী ভজনানন্দের স্মৃতিকথায় পাই | “মাত্র আঠারো বছর বয়সে স্কুলের শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েই রামকৃষ্ণ সঙ্ঘে যোগদান করেন | কিন্তু সে সময় থেকেই নিয়মনিষ্ঠা ভরে পড়াশুনা ও বিদ্যার্জন করার প্রয়াস থেকে তাঁর প্রথাগত পড়াশুনার শূন্যতা ভরানোর চেষ্টা করেছিলেন | সঙ্ঘে যোগদানের পরই তাঁর উপর রান্না ও থালাবাসন ধোয়াধুয়ির দায়িত্ব পড়ে | সেই কাজের ফাঁকে রান্নাঘরেই পড়তেন | ভাত বা সবজি সেদ্ধ হতে থাকলে উনুনের পাশে একটা টুলে বসে তিনি পড়তেন |”৭

ক্রমশ ……

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।