সাপ্তাহিক ধারাবাহিক প্রবন্ধে মানস চক্রবর্তী – ২

পূর্বানুবৃত্তি

এক মাস্টারমশায় তাঁর প্রিয় ছাত্রীর উত্তর ঠিক হওয়া সত্ত্বেও লিখে দিয়েছেন ” গাধা নিয়ম ” | ছাত্রীটির অহংকারে আঘাত | সোজা গিয়ে উপস্থিত মাস্টারমশায়ের কাছে |
ছাত্রীটি বীজগণিতের একটি সমীকরণ দু’টি দিক কষে সমান দেখিয়েছে | অপরাধ কোথায় , তা ছাত্রীটির বোধগম্য হয়নি | তাই খাতা হাতে সোজা মাস্টারমশায়ের কাছে | মাস্টারমশায়ের অমূল্য উপদেশ , ” একটি সাইড কষে দেখালে অর্ধেক সময় লাগবে | জীবনে একটি কাজ করার জন্য দ্বিগুণ সময় নষ্ট করা উচিত নয় | ” পরবর্তীতে ছাত্রীটির সশ্রদ্ধ স্বীকারোক্তি , ” সময়ের মূল্য সম্পর্কে তাঁর এই অমূল্য উপদেশ আজও আমাকে পরিচালিত করে | ” ৪ অধ্যাপিকা ভারতী মুখার্জির স্মৃতিচারণায় শিক্ষক শ্যামদাস বশিষ্ঠ এই ভাবেই জায়গা করে নিয়েছেন |
তিনি শুধু ছেলেদের অঙ্ক কষাতেন বললে ভুল বলা হবে | ছেলেদের নিয়ে অঙ্ক কষিয়ে নিতেন | তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ স্কুলের শিক্ষক রণেন্দ্রনাথ সান্যাল | তাঁর অঙ্ক শেখানোর কৌশল বলতে গিয়ে অধ্যাপক অশোক কুমার মুখোপাধ্যায় বলছেন , ” বোর্ডে দুটো সমান্তরাল রেখা , একটি ছেদক এঁকে দুটো কোণকে চিহ্নিত করে বললেন , এই দুটো একান্তর কোণ | প্রমাণ করতে হবে – তারা সমান | কী করে করা যায় বলো তো ? একজন উঠে কিছু বলল , ভুল বলুক , শুদ্ধ বলুক , তিনি বাধা দিতেন না | বন্ধুটির প্রমাণ গ্রাহ্য হল না | তখন আরেকজন উঠল | এইভাবেই তিন-চার-পাঁচ জন চেষ্টা করতেই প্রমাণ পদ্ধতিটি খুঁজে পাওয়া যেত | তখন বলতেন এবার লেখো | তিনি ঘুরে ঘুরে দেখতেন | হয়ে গেলে আবারও একটা | আবার প্রমাণ হয়ে গেলে আবারও একটা | আবার প্রমাণ করা হল , লেখা হল | ঘণ্টা শেষ হলে যাওয়ার সময় বলতেন , এটা তোমাদের বইয়ের এত নম্বর উপপাদ্য | জ্যামিতি বই , অঙ্কের বই , আমরা খুবই কম খুলেছি , কোনোদিন চেঁচিয়ে পড়তে হয়নি , ‘ মনে করি এবিসি একটি ত্রিভুজ | ‘ ক্লাসের সবগুলো ছাত্রকে এইভাবে ভাবিয়ে তুলতে খুব বেশি শিক্ষককে দেখিনি | ” ৫
অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজের আর এক অঙ্ক শিক্ষকের কথা শুনিয়েছেন | নাম কৃতান্তকুমার বসু | অ্যালজেবরা পড়াতেন | তিনি লেখককে বলেছিলেন , ” প্রশ্নমালার অঙ্কগুলো পর পর করবি না | প্রশ্নমালার অঙ্কগুলো সহজ থেকে কঠিন – এইভাবে সাজানো থাকে | পর পর করে গেলে প্রত্যেকটা অঙ্ক তোর পূর্ণ মনোযোগ পাবে না , আগেরটা পরেরটাকে গাইড করবে | ১ নম্বর করলি, ৫ নম্বর কর , ১২ নম্বর কর | তারপর ছেড়ে দে | পরের দিন আবার ধর | আর সব অঙ্ক যে কাগজে কষতে হবে , তাও নয় | মনে মনেও করতে পারিস | অঙ্কের মধ্যে মূল কথা তো লজিক | দ্যাট মাস্ট পারকোলেট ইন মাইন্ড , অ্যাণ্ড পারকোলেশন ইজ এ স্লো প্রসেস | ” ৬.
সত্যজিৎ রায় তাঁর স্কুলজীবনের স্মৃতিকথায় এক জায়গায় লিখেছেন , ” B.D Roy taught us English . He was a small man but he took great care to ensure that we pronounced English correctly .” এই রকম আর একজন শিক্ষক মহাশয়ের কথা শুনিয়েছেন অধ্যাপক মুখোপাধ্যায় | মাস্টারমশায় হলেন কিশোরীমোহন বাবু | তাঁর ক্লাসে কেউ ভুল বানান লিখলে তিনি শাস্তিস্বরূপ ঐ ছাত্রকে দিয়ে ঠিক বানানটি একশোবার লেখাতেন |
“A country is known by its stage .” – এই জীবন দর্শনের জন্য শিশিরকুমার অধ্যাপনা ছাড়লেন | নাট্যশালার জগতে তিনি একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র | সে এক অন্য গল্প | আমরা তাঁর অধ্যাপনা জীবনের দু’একটি ঘটনার কথা জানব | এক দিন ক্লাসে এসে দেখলেন একটি ছেলে ঘুমে ঢুলছে | বইয়ের ভাষাটি এখানে একটু উল্লেখ করব , ” উনি বললেন তাকে , Are you feeling sleepy ? ছেলেটি সামলে নিয়ে বললো, আজ্ঞে না ; শিশিরকুমার সংকুচিত ভাবে বললেন , Sorry , I beg your pardon . হেসে উঠল সবাই | ” ৭ কৌশলের তারিফ করতে হয় |
তিনি সত্যিই কৌশলী ছিলেন | এইরূপ আর একটি ঘটনা পিনাকী ভাদুড়ীর কলমের সুবাদে আমরা পেয়েছি | তিনি ক্লাসে একদিন পড়াচ্ছেন | দেখলেন একটি শব্দের মানে তার জানা নেই | একটি ছাত্র আবার ঐ শব্দটির মানেই জিজ্ঞাসা করলেন | পিনাকী ভাদুড়ীর বর্ণনায় , ” শিশিরকুমার মোটেই দমলেন না | চশমাটা খুলে রুমাল দিয়ে কাঁচ দুটো মুছতে মুছতে বললেন , ” ওহে শোন ! Do I look like a dictionary – কাল মানেটা Dictionary দেখে জেনে আসবে , এসে আমাকে বলবে | অর্থাৎ দায়িত্বটি সুকৌশলে ছাত্রটির ওপরেই চাপিয়ে দিলেন | ” ৮
তিনি অধ্যাপক হিসেবে ছাত্রদের খুব কাছাকাছি যেতে পেরেছিলেন তা তাঁর জ্ঞানের গভীরতার জন্য | তিনি একদিন ক্লাসে বললেন Sweet Scented flower , অধ্যাপক জে.এল.ব্যানার্জী শোনার পর সরাসরি বললেন , শিশিরবাবু ভুল বলেছেন | ওটা Sweet Scented flower হবে না | Sweet Smeelling flower হবে | ঘটনাটা ছাত্রমহলে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ালো | কথাটা শিশিরকুমারের কানে গেল | তিনি বইপত্র ঘেটে প্রমাণ করে দিলেন Sweet Scented flower টাই ঠিক | ছাত্রদের অভিব্যক্তি – যাক বাঁচা গেল | এই ঘটনার প্রসঙ্গে পিনাকী ভাদুড়ির অভিমত – এই প্রতিক্রিয়া থেকেই বোঝা যায় শিশিরকুমার অধ্যাপক হিসেবে কতটা জনপ্রিয় হয়েছিলেন |
————————————————————-
তথ্যসূত্র: ( ১ ) আমার শিক্ষক , দে’জ পাবলিশিং , জানুয়ারি ২০১০, পৃ: ৩৩ | ( ২ ) ঐ, পৃ: ৩২ | ( ৩ ) ঐ, পৃ: ৩৬ | ( ৪ ) ঐ , পৃ: ৮২ | ( ৫ ) ঐ , পৃ: ৩৮ | ( ৬ ) ঐ , পৃ: ৩৯ | ( ৭ ) কোরক সাহিত্য পত্রিকা বইমেলা ২০১৬ , পৃ: ১১২ | ( ৮ ) ঐ , পৃ: ১১৩ |
(চলবে )
পরবর্তী পর্বে থাকবে রামতনু লাহিড়ীর শিক্ষকতার গল্প
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।