সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মানস চক্রবর্ত্তী – ২৯

মর্তকায়ার অন্তরালে
প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে তিনি বলেছেন, “হৃদয়ে প্রেমের শীর্ষ আমাদের – প্রেমের অপূর্ব শিশু আরক্ত বাসনা | আমার মনে হয়েছে জীবনানন্দের অন্যতম একটি শ্রেষ্ঠ প্রেমের কবিতা এটি |
তিনি তাঁর জন্মভূমিকে ভালোবাসেন, খুব ভালোবাসেন, তাই তাঁর ফিরে ফিরে আসার প্রবল আকুতি –
“আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে -এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয়-হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে;
তিনি পলাতক কবি কবিতার ক্ষেত্রে এই যুক্তি নীতিবিরুদ্ধ |
জীবনানন্দের মৃত্যুৃপ্রসঙ্গ সমান প্রাসঙ্গিক , এই প্রবন্ধেতো বটেই | জীবনানন্দের মৃত্যু স্বাভাবিক মৃত্যু নয়, একটি দুর্ঘটনা | মৃত্যুর কারণ হিসাবে বলা হয় একটি ট্রামের ধাক্কা | এই মৃত্যু নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়েছে অনেক | লেখালেখিও হয়েছে পত্রপত্রিকায় প্রচুর | তাঁর এই অন্যমনস্কতার একটি বড়ো কারণ ভাড়াইয়া একটি মেয়ে | এটিকে মৃত্যুর মুখ্য কারণ হিসাবে গণ্য করা হয়, তবুও তৎকালীন খ্যাতিমানদের ব্যঙ্গবিদ্রূপ ও সমালোচনা জীবনানন্দ কোনোদিনই মন থেকে মেনে নিতে পারেননি |
সজনীকান্তের সমালোচনার একটি উদাহরণ এবার দিই | প্রকৃত কবিতার অর্থকে আড়াল করে তিনি ব্যঙ্গ করলেন | ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকায় জীবনানন্দের কবিতা ছাপা হয়ে বেরোল | সজনীকান্ত শনিবারের চিঠিতে লিখলেন : “কলিকাতার ফুটপাতে আমরা চলাফেরা করি এবং অনেক গভীর রাতে যে না করি হলফ করিয়া তাহা বলিতে পারিব না | কিন্তু ফুটপাতে সর্পিনী সহোদরার মতো বিষাক্ত ট্রামের লাইন দেখা কখনও ভাগ্যে ঘটে নাই | আমাদের বরাবরই সন্দেহ ছিল, হোটেলগুলি পুরা দাম লইয়া আমাদিগকে ঠকায়, এইবারে তাহা প্রমাণ হইয়া গেল | জীবনানন্দ বাবুর( জীবানন্দ নয় ) বরাত ভাল, খাঁটি জায়গার সন্ধান তিনি পাইয়াছেন | লক্ষণ সব ঠিক মিলিয়া যাইতেছে, কবি, ‘নির্জলা’ সত্য বলিতেছেন :
পায়ের তলায় লিক্ লিকে ট্রামের লাইন – মাথার ওপরে
অসংখ্য জটিল তারের জাল
শাস করছে আমাকে |….
সবুজ ঘাসের ভেতর অসংখ্য দেয়ালি পোকা মরে রয়েছে
দেখতে পাবে না তুমি এখানে?
শেষ পরিণতিতে আমরা সরিষা ফুল দেখিয়া থাকি, দেয়ালি পোকা সম্পূর্ণ অভিনব | জীবনান্দের( জীবানন্দের নহে ) অরিজিনালিটি আর অস্বীকার করা চলিবে না |
– কার্তিক ১৩৪৫
১৪৪৫এর চৈত্র সংখ্যায় আর একটি চিঠিতে পক্ষান্তরে জীবনানন্দকে পাগল বলা হয়েছে | ‘পরিচয়’ পত্রিকায় জীবনানন্দের ‘গোধূলি সন্ধির নৃত্য’ কবিতাটি প্রকাশিত হয় | তারই পরিপেক্ষিতে এই চিঠি | “গোধূলি সন্ধির নৃত্য দেখিয়াছেন ? চৈত্রের ‘পরিচয়ে’ দেখিতে পাইবেন| নাটোরের বনলতা সেনকে বিস্মৃতি হইয়া কবি জীবনানন্দের( জিহ্বানন্দ নহে ) এই টারণন্ টেলা নাচ! হায়রে যদি নাচ না হইয়া সোয়ান সঙ হইত ! ……
গোপালদা একবার আর্তকণ্ঠ | বলিলেন, থাম | তিনি ই.বি.আর. ও বি.এন.আর- এর টাইম টেবল ঘাঁটিতে লাগিলেন | বরিশাল হইতে রাঁচি | খানিক পরে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন- দেখছি, দুর্ভোগ বড় কম হবে না |
এই প্রসঙ্গে জীবনানন্দ গবেষক গোপালচন্দ্র রায় তাঁর ‘জীবনানন্দ’ পুস্তকে লিখেছেন : “বরিশাল থেকে কলকাতায় আসার যে ট্রেন ছিল, তার নাম ছিল – ই.বি.আর. অর্থাৎ ইষ্ট বেঙ্গল রেলওয়ে | আর কলকাতা থেকে বাঁচি যাবার যে ট্রেন ছিল, তার নাম ছিল – বি.এন.আর. বা বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে | জীবনানন্দ ঐ সময় বরিশালে থাকতেন | সজনীকান্ত তাঁর গোপালদার মুখে ‘রাঁচি’ বসিয়ে রাঁচির পাগলা গারদের কথাই বলতে চেয়েছেন, অর্থাৎ জীবনানন্দকে পাগল বলেছেন | ” এখানে আর একটু তথ্য সংযোজন করব | শনিবারের চিঠিতে সজনীকান্ত জীবনানন্দের লেখা নিয়ে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন | সেই সঙ্গে জীবনানন্দের নাম নিয়েও ব্ঙ্গ করেছেন | ব্যাকেটের মধ্যে কোথাও ‘জীবানন্দ নহে’, কোথাও আবার ‘জিহ্বানন্দ নহে’ উল্লেখ করেছেন | এইরূপ আচরণের সম্ভাব্য কারণ গোপাল বাবুর বইয়ে পাই | জীবানন্দ নামে অন্য আর একজন ঐ সময় কবিতা লিখতেন | তাঁর থেকে পৃথক বোঝাবার জন্যই হয়তো ব্যাকেটের মধ্যে ‘জীবানন্দ নয়’ লিখতেন | কথিত আছে জীবনানন্দের একটি মুদ্রাদোষ ছিল – কথা বলার সময় জীবনানন্দ মাঝে মাঝে ঠোঁটের উপর জিভটা বুলিয়ে নিতেন | বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে জীবনানন্দের সহকর্মী হেরম্ব চক্রবর্তী কথাটার সত্যতা স্বীকার করে নিলেও ,তিনি কিন্তু এটিকে মুদ্রাদোষ বলেননি | হেরম্ববাবু লিখেছেন, মানুষের ভীড়ে কবি যেন নিঃসাড় হয়ে যেতেন |এমন কি ছাত্র-ছাত্রীদের ভিড়েও তাঁর গলা শুকিয়ে যেত | বার বার জিব দিয়ে বিশুষ্ক ওষ্ঠ্যপ্রান্ত লেহন না করলে ভাল করে বাক্য স্ফূর্তি হ’ত না | এই লেখার বিরুদ্ধ মতও আছে | মনে রাখতে হবে এই হেরম্ববাবু একসময়ে জীবনানন্দের কবিতা নিয়ে ব্ঙ্গ করেছেন , তা কাগজে ছাপিয়েছেন | সে যাই হোক যদি ধরেও নিই জীবনানন্দের ওই মুদ্রা দোষ ছিল তাহলেও মানুষকে ক্ষুদ্রার্থে ব্যবহার করা সাহিত্যে সুরুচির দৃষ্টান্ত নয় |
সজনীকান্ত তাঁর শনিবারের চিঠিতে ‘ক্যাম্পে’ কবিতাটি অশ্লীল আখ্যা দিয়ে জীবনানন্দকে তীব্রভাবে আক্রমণ করেন | জীবনানন্দ এর উত্তরে যে লেখাটি লিখেছিলেন তিনি তাঁর জীবিতকালে সে লেখা প্রকাশ করেননি | তাঁর মৃত্যুর পর এই লেখাটিই প্রকাশিত হয় ‘শতভিষা’ পত্রিকায় | পুরো লেখাটি এখানে উদ্ধৃত না করে একটিমাত্র লাইন উল্লেখ করব, যেখানে কবিতাটির মূলসুর ধরা আছে | ” ‘ক্যাম্পে’ অশ্লীল নয় | যদিও কোনো একমাত্র স্থির নিষ্কম সুর এ কবিতাটিতে থেকে থাকে তবে তা জীবনের- মানুষের-কীট-ফড়িঙের সবার জীবনেরই নিঃসহায়তার সুর | সৃষ্টির হাতে আমরা ঢের নিঃসহায়- ‘ক্যাম্পে’ কবিতাটির ইঙ্গিত এই; এইমাত্র |
সমালোচনার অনেক ঊর্ধ্বে জীবনানন্দ সত্যের প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন | ‘আট বছর আগের একদিন’ কবিতায় জীবনানন্দ যে সত্য উপলব্ধি লিপিবদ্ধ করেছেন জীবনের কোনো এক বিপন্নতায় একদিন আমরাও হয়তো উপলব্ধি করব-
“অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয়-
আরো এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতর
খেলা করে…..
ক্রমশ…