সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মানস চক্রবর্ত্তী – ১৩

মর্তকায়ার অন্তরালে

||১৩ ||

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলন ও বিবেকানন্দ
|| এক ||

বিবেকানন্দকে বলা হয় ‘সাইক্লোনিক মঙ্ক’| ইহা তাঁর চরিত্রের একটি উল্লেখযোগ্য পরিচয়| তিনি সংসার ত্যাগী, সদা ধ্যানজপে নিমগ্ন তথাকথিত কোনো সাধু নন| কন্যাকুমারীর শিলাখণ্ডে বসে তিনি ইষ্টদেবের ধ্যান করলেন না| তিনি যা দর্শন করলেন, উপলব্ধি করলেন বঙ্কিমচন্দ্রের পরিভাষায়, “মা যা ছিলেন| মা যা হইয়াছেন| মা যা হইবেন|” ( আনন্দমঠ ) মা যা হবেন সেই স্বপ্নে বিভোর করে দিন গুণতে বসলেন না| মা যা হয়েছে সেই কঙ্কাল মালিনী রূপ দেখে স্বামীজি উপলব্ধি করলেন মায়ের এই হৃতসর্বস্ব রূপের জন্য দায়ী পরাধীনতা এবং বিট্রিশদের বেপরোয়া শোষণ| এই পরাধীনতার নাগপাশ থেকে দেশ মুক্ত না হলে মায়ের সেই জ্যোতির্ম্ময়ী মূর্তি দৃষ্টিগোচর হবে না| উপায় কী? সকল সন্তানকে উচ্চস্বরে মা বলে ডাকতে শিখতে হবে| স্বামীজি বললেন: “আগামী পঞ্চাশ বছর আমাদের গরীয়সী ভারতমাতাই আমাদের আরাধ্য দেবতা হউক, অন্যান্য অকেজো দেবতা এই কয়েক বৎসর ভুলিলে কোন ক্ষতি নাই|” ১ বেঙ্গল ভলাণ্টিয়ার্স এর প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষকে স্বামীজি বলেছিলেন: “পরাধীন জাতির কোন ধর্ম নেই | তোদের এখন একমাত্র ধর্ম হচ্ছে মানুষের শক্তি লাভ করে আগে পরস্বাপহারীদের দেশ থেকে তাড়ানো|” ২
লাহোরের বিখ্যাত ‘ট্রিবিউন’ পত্রিকার সম্পাদকের কাছে স্বামীজি একবার বলেছিলেন: “আমি জেলে গেলে যদি দেশের কোন উপকার হয় , আমি জেলে যেতে প্রস্তুত|” ৩
এখন আমরা স্বামীজির রাজনৈতিক দর্শনের গতিপ্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করব| ভগিনি ক্রিস্টিনকে স্বামীজি একসময় বলেছিলেন :”নিবেদিতা ভারতের পরিস্থিতি ও রাজনীতি সম্পর্কে কী জানে? আমার জীবনে আমি তার চেয়ে অনেক বেশী রাজনীতি করেছি| বিদেশী শাসন উচ্ছেদ করবার জন্য আমি ভারতীয় নৃপতিদের নিয়ে একটি শক্তিজোট তৈরি করতে চেয়েছিলাম| সেইজন্যই আমি হিমালয় থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত দেশের সর্বত্র ঘুরে বেড়িয়েছি| সেইজন্যই আমি বন্দুক নির্মাতা স্যার হাইরাম ম্যাক্সিমের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিলাম, কিন্তু দেশের কাছ থেকে আমি কোন সাড়া পাইনি| দেশটা মৃত!” ৪ শঙ্করী প্রসাদ বসু লিখছেন: “ভগিনী নিবেদিতার প্রখ্যাত জীবনীকার লিজেল রেঁম তাঁকে চিঠিতে জানিয়েছেন যে, মিস ম্যাকলাউড সূত্রে তিনি ( লিজেল রেঁম ) অবগত হয়েছেন স্বামীজীর ইচ্ছায় মিস ম্যাকলাউড বিদেশ থেকে অস্ত্রশস্ত্র আমদানি করার জন্য টাকা দিয়েছিলেন|” ৫ আর একটি তথ্য এখানে উল্লেখ করব যেটি লিজেল রেঁম স্বয়ং শঙ্করী প্রসাদ বসুকে লিখেছেন| “মিস ম্যাকলাউড স্বামী বিবেকানন্দের কিছু চিঠি দেখিয়ে আমাদের বলেছিলেন, ‘ এগুলি একেবারে আগুনে, রাজনৈতিক অস্থিরতার কালে লেখা | স্বামীজী অনেক কিছুই করেছিলেন| চন্দননগরের মধ্য দিয়ে ভারতে চালান হয়েছে! আমি সেগুলি কিনেছি| অস্ত্রসহ একটি নৌকা ধরা পড়ে, কিন্তু তাঁর সূত্রে কাউকে ধরা যায়নি|” ৬
১৯০১ সালে ডিসেম্বর মাসে বাল গঙ্গাধর তিলক বেলুড় মঠে এসেছিলেন স্বামীজির সঙ্গে দেখা করতে| স্বামাজি তিলককে বলেছিলেন, “বাহুবল ছাড়া বিট্রিশকে ভারত থেকে উৎখাত করা যাবে না এবং তা-ই করতে হবে|” ৭
একটি বিস্ফোরক মন্তব্য স্বামী পূর্ণাত্মানন্দজি তাঁর ‘স্বামী বিবেকানন্দ এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বই এ উল্লেখ করেছেন| স্বামীজী প্রথমবার বিদেশ থেকে আসার পর একদিন স্বামী শুদ্ধানন্দকে ( তখন বহ্মচারী সুধীর ) বললেন, “দ্যাখ, আমি বিদেশ থেকে বোমা বানাতে শিখে এসেছি| আমি যদি বোমা বানিয়ে দিই তোরা তা লাটসাহেবের বাড়িতে ফেলে আসতে পারবি?” স্বামী শুদ্ধানন্দকে স্বামীজি কথাগুলি রহস্য করে বলেছিলেন কিনা তা অবশ্য জানা যায়নি| এই কথাটি স্বামী পূর্ণাত্মানন্দজি শুনেছিলেন মঠের প্রবীণ সন্ন্যাসী স্বামী হিরণ্ময়ানন্দের কাছে| স্বামী হিরণ্ময়ানন্দ আবার কথাটি শুনেছিলেন স্বয়ং শুদ্ধানন্দের কাছে| মরদেহ ত্যাগ করার আগে কামাখ্যা মিত্রকে স্বামীজি বলেছিলেন: “What India needs today is bomb.” ৮
স্বদেশে ফিরে স্বামীজি যুবশক্তিকে আহ্বান করলেন| “দেশে শ্রীরামচন্দ্র ও মহাবীরের পূজা চালিয়ে দে দিকি| বৃন্দাবন লীলা-ফিলা এখন রেখে দে| গীতাসিংহনাদকারী শ্রীকৃষ্ণের পূজা চালা; শক্তিপূজা চালা| এখন ঐ পূজায় [ বৃন্দাবন বিহারী শ্রীকৃষ্ণের পূজায় ] তোদের দেশে ফল হবে না| বাঁশী বাজিয়ে দেশের কল্যাণ হবে না| এখন চাই তোপ্ তাপ্ গোলাগুলি ঢাল তরোয়াল নিয়ে খেলা| মার্ মার্ কাট্ কাট্ করে…..উঠে পড়ে লাগতে হবে|” ৯
আবার বলছেন: “এখন চাই খাণ্ডা খরশান| এখন চাই মার্ মার্ কাট্ কাট্| ধনুর্ধারী রাম, মহাবীর, মা-কালী এদের পূজা চাই| মায়ের পূজায় রক্ত চাই- নরবলি চাই|” ১০
স্বামীজি ইংরেজ শাসনের বেপোকোয়া দিকটি সম্পর্কে যথেষ্ট কঠোরভাষী ছিলেন| “…… তারা আমাদের গলায় পা দিয়ে থেঁতলেছে, নিজেদের সুখের প্রয়োজনে আমাদের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত চুষে খেয়েছে, লুঠে নিয়ে গেছে আমাদের লক্ষ লক্ষ টাকা – আর আমাদের দেশের মানুষ সারাটা দেশ জুড়ে পেটে হাত দিয়ে পড়ে আছে|” ১১ আরো বললেন: “এক হাতে বাইবেল, অন্য হাতে বিজেতার তরবারি নিয়ে তোমরা আমাদের দেশে গিয়েছ ….আমাদের পায়ের তলায় দলেছ, ধুলোর মতো তুচ্ছ জ্ঞান করেছ, তোমরা মাংসাশী জানোয়ার| মদ খাইয়ে তোমরা আমাদের অধঃপতিত করেছ, অসম্মানিত করেছ আমাদের নারীকে, বিদ্রুপ করেছ আমাদের ধর্মকে|”১২

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।