সাপ্তাহিক ধারাবাহিক প্রবন্ধে মানস চক্রবর্তী – ১

শিক্ষক ও শিক্ষকতার গল্প

অধ্যাপক বিনয়কুমার সরকার সম্পর্কে ফরাসি সমালোচকের অভিমতটুকুই ওনার সম্পর্কে যথেষ্ট মূল্যবান মূল্যায়ণ |
” Dr. Benoy kumar Sarkar , well- known in all countries of Europe as one of the best representatives of modern Indian thought in the fields of sociology and education , in veritably an encyelopaedic spirit . ” ১
সুতরাং এখন আমাদের অধ্যাপক সরকারের অধ্যাপনা কৌশলটি জানতে ইচ্ছে হওয়াই স্বাভাবিক | তাঁরই ছাত্র অম্লান দত্তের বিনম্র স্মৃতিকথায় – ” পাঠ্যপুস্তক ধরে ধরে ইনি পড়াতেন না , শুধু চাইতেন যে , চিন্তার ক্ষেত্রে আমরা সাহসী হব , নিজে নিজে চিন্তা করব | …..কোনো একটা প্রশ্ন অথবা বিষয় তুলে উনি প্রথমে বলতেন নানা দেশের পণ্ডিতেরা সেই বিষয়ে কী লিখেছেন | তারপর জানাতেন , উনি নিজে সেই বিষয়ে কী ভেবেছেন | তারপরই জানতে চাইতেন আমাদের অভিমত | ছাত্রদের ভিতর কেউ ওঁর চিন্তাভাবনার সমালোচনা করলে উনি খুব খুশি হতেন , আনন্দ প্রকাশ করতেন | ” ২
তবে অধ্যাপক সরকারের বিশেষ একটি খেয়ালিপনার জন্য পেশাদারী অধ্যাপক ও প্রথাসিদ্ধ ছাত্রদের বিচারে তিনি কিছুটা অস্বাভাবিক ছিলেন | খেয়ালিপনাটি হল বিভাগীয় প্রধান হবার সুযোগে তিনি বিভিন্ন অধ্যাপকদের ক্লাসের শেষ লাইনে বসে থাকতেন |
অধ্যাপক অম্লান দত্ত মহাশয় তাঁর আর এক শিক্ষকের কথা উল্লেখ করেছেন ” আমার শিক্ষক ” প্রবন্ধে | কিন্তু সেই শিক্ষক মহাশয়ের নাম তিনি উল্লেখ করেননি | কিন্তু তাঁর পাঠদানটি ছিল অভিনব | ঐ মাস্টারমশাই তাঁকে বাড়িতে পড়াতেন | উনি তাঁকে একটা প্রশ্ন দিয়ে উত্তর লিখতে বলতেন | অন্য প্রান্তে উনি নিজেই সেই প্রশ্নের উত্তর লিখতেন | লেখা শেষ হলে ছাত্রের উত্তর তিনি নিতেন আর নিজের লেখা উত্তরটি ছাত্রকে দিতেন |
অধ্যাপক অমল ভট্টাচার্য প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরাজী বিভাগের একঝাঁক নক্ষত্র শিক্ষকের মধ্য একজন | নক্ষত্র শিক্ষক হওয়ার জন্য সাধনার প্রয়োজন | প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির উদারতা ও প্রসারতা | এ’রকমই একটি ঘটনার কথা জানতে পেরেছি তাঁরই সুযোগ্য ছাত্রী অধ্যাপিকা মালিনী ভট্টাচার্যের লেখা থেকে | তিনি তখন চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী | অধ্যাপক অমল ভট্টাচার্য তখন তাঁদের একটি পরীক্ষা নিয়েছিলেন | তিনটি প্রশ্নের উত্তরের মধ্যে লেখিকা একটি সম্পূর্ণ ও আর একটি প্রশ্নের প্রায় অর্ধেক লিখতে পেরেছিলেন এবং তিনি আশা করেছিলেন তিনি ফেল করবেন | কিন্তু অভাবনীয় ভাবে পরীক্ষায় তিনি শতকরা ছাপ্পান্ন নম্বর পান এবং সেটাই ছিল সর্বোচ্চ | অধ্যাপিকা মালিনী ভট্টাচার্যের মূল্যায়ণটি এরূপ ছিল , ” আমি যা লিখেছিলাম তারই ভিত্তিতে তিনি আমাকে নম্বর দিয়েছিলেন , যা লিখিনি তাকে গ্রাহ্যের মধ্যে আনেননি | নম্বর দেওয়ার এই পদ্ধতি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে কিনা জানি না , কিন্তু আমাকে তা আত্মবিশ্বাসী হতে সাহায্য করেছিল | তাঁর এই ঋণ শোধ করা যাবে না | ” ৩

( চলবে )

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।