সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে মানস চক্রবর্ত্তী – ২৩

মর্তকায়ার অন্তরালে
||২৩||
তবু অনন্ত জাগে
২২ শা শ্রাবণ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুদিনে একটি কবিতা লিখেছিলাম শ্রদ্ধাঞ্জলি জানিয়ে | তার শেষ কয়েকটি লাইন এইরকম –
“মৃত্যুতে রেখে গেলে
বিত্ত নয়, মাভৈঃ মাভৈঃ নৃত্য |
শোক নয়, বিরহ নয়,
দিয়ে গেলো বেঁচে থাকার পরিমিতি
রবীন্দ্রগীতি |”
মৃত্যুদিনে লিখলাম বেঁচে থাকার কবিতা | অনুপ্রেরণার কবিতা | ঠিক জন্মদিনে লিখলাম মৃত্যুর উপর একটি কবিতা -‘একটি রবীন্দ্রজয়ন্তী’ | রবীন্দ্রজয়ন্তীকে ঘিরে একটি মধ্যবৃত্ত পরিবারের এক কিশোরীর করুণ মৃত্যুদৃশ্য |
এমনটা কেনো ? মৃত্যুদিনে প্রেরণার কবিতা আর জন্মদিনে মৃত্যুর ভাবনা | এই বৈপরীত্য কেনো ? রবীন্দ্রনাথ পড়তে গিয়ে আমার মনে হয়েছে জন্ম ও মৃত্যু একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ | একথা হয়তো পূর্বে অনেকেই বলেছেন, কিন্তু আমার অনুভবে এটা স্বীকৃত পেলো |
রবীন্দ্রনাথ লিখছেন:
“আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহ দহন লাগে
তবুও শান্তি, তবু আনন্দ,তবু অনন্ত জাগে |”
( গীতবিতান )
যে আনন্দ, যে অনন্তের কথা রবীন্দ্রনাথ লিখছেন আমার মনে হয়েছে তা আর্ট | আর্টের সাধনা ছাড়া তিনি কখনোই বলতে পারতেন না – “মরণ রে তুঁহুঁ মম শ্যাম সমান |”
রবীন্দ্র প্রতিভার সমস্ত দিক যদি ছেড়েও দিই কেবল এই একটি ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ কত সাবলীল তা স্বীকার করে নতজানু হতে হয় আমাদের | জীবনের অন্তিম সত্যটাকে রবীন্দ্রনাথ খুব কাছ থেকে জেনেছেন, মেনেছেন এবং উত্তরণের পথ দেখিয়ে দিয়ে গেছেন | এর কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আমার মনে হয়েছে রবীন্দ্রনাথের জীবন উপনিষদের শ্লোকে বাঁধা – “ঈশাবাস্য মিদং সর্বং যৎ কিঞ্চ জগতাং জগত |” একথার স্পষ্ট নির্দেশ আমরা শমীর মৃত্যুতে অবলা বসুকে লেখা একটি পত্রে পাই | “ঈশ্বর আমাকে যাহা দিয়াছেন তাহা তিনি গ্রহণ করিয়াছেন | তাহা শিরোধার্য করিয়া লইব | আমি পরাভূত হইব না |” অন্য আর একটি পত্র জগদীশ বসুকে লেখা | কবি লিখছেন : “আমাদের চারিদিকে এত দুঃখ, এত অভাব, এত অপমান পড়িয়া আছে যে নিজের শোক লইয়া অভিভূত হইয়া এবং নিজেকেই বিশেষ রূপ দুর্ভাগ্য কল্পনা করিয়া পড়িয়া থাকিতে আমার লজ্জা বোধ হয় |”
কিন্তু রবীন্দ্রজীবনে এর ভিন্ন চিত্র আমরা দেখেছি | একটা সময় রবীন্দ্রনাথকে আত্মহননের প্রবণতা পেয়ে বসে | রথীন্দ্রনাথকে লেখা একটি চিঠির অংশবিশেষ দেখলেই তা পরিষ্কার হয় | “দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়না করছে | মনে হয়েছে আমার দ্বারা কিছুই হয়নি এবং হবেও না | আমার জীবনটা যেন আগাগোড়া ব্যর্থ …..|”
তবে এই অবসাদ রবীন্দ্রজীবনে বেশিদিন স্থায়ী হয়নি | ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের ২ফেব্রুয়ারি রথীন্দ্রনাথকে আবার লিখলেন : “কিছুকাল থেকে মনে হচ্ছিল মৃত্যু আমাকে শেষ বান মেরেছে এবং সংসার থেকে আমার বিদায়ের সময় এসেছে – কিন্তু তস্য ছায়ামৃতং তস্য মৃত্যু – মৃত্যু যাঁর ছায়া অমৃতও তাঁরি ছায়া – এতদিনে আবার সেই অমৃতেরই পরিচয় পাচ্চি |”
রবীন্দ্রনাথ প্রথম মৃত্যুকে দেখেন তার মায়ের মৃত্যুতে | সেদিন রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুকে ভয়ংকর বোধ হয়নি | কারণ তখন তিনি বালক | জীবনস্মৃতিতে লিখিত হয়েছে : “সেদিন প্রভাতের আলোকে মৃত্যুকে যেরূপ দেখিলাম তাহা সুখসুপ্তির মতোই প্রশান্ত ও মনোহর |” মৃত্যুশোক সেদিন রবীন্দ্রনাথের মনে স্থায়ী শূন্যতা সৃষ্টি করতে পারেনি | যখন সারদাদেবীর দেহ বাড়ির সদর দরজার বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো তখন কেবল একটি বারের জন্য চোদ্দো বছরের রবির মনে হয়েছিল- এই বাড়ির সদর দরজা দিয়া মা আর একদিনও তাঁহার নিজের এই চিরজীবনের ঘরকরনার মধ্যে আপনার আসনটিতে আসিয়া বসিবেন না |” এর অধিক শোক ছোট্ট রবি সেদিন পাইনি | জীবন স্মৃতিতে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন | “শিশু বয়সের লঘু জীবন বড়ো বড়ো মৃত্যুকেও অনায়াসেই পাশ কাটাইয়া ছুটিয়া যায় – কিন্তু অধিক বয়সে মৃত্যুকে এত সহজে ফাঁকি দিয়া এড়াইয়া চলিবার পথ নাই |”
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর সঙ্গে প্রথম স্থায়ী পরিচয় হলো ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১৯ এপ্রিল বৌদি কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুতে | বাংলা ৮ই বৈশাখ ১২৯১ সন | রবীন্দ্রনাথ লিখলেন : “আমার চব্বিশ বছর বয়সের সময় মৃত্যুর সঙ্গে যে পরিচয় হইল তাহা স্থায়ী পরিচয় |” কাদম্বরী দেবীর মৃত্যুকে রবীন্দ্রনাথ ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় ‘আত্মবিসর্জন’ অ্যাখ্যা দিলেন | এক্ষেত্রে অনেকে রবীন্দ্র পক্ষ সমর্থন করতে রাজী নয় | যাক সে অন্য প্রসঙ্গ | ( বানান অপরিবর্তিত )
ক্রমশ…….