সাপ্তাহিক ধারাবাহিক প্রবন্ধে মানস চক্রবর্তী – ৫

|| ৫ ||

তিনি দায়ে পড়ে শিক্ষকতায় আসেননি এবং যেন তেন প্রকারে দায়মুক্ত হবার প্রয়াস তিনি কখনোই নেননি | হিন্দু কলেজ থেকে সর্বোচ্চ পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হয়ে তাঁর আর সকল সহপাঠীরা বড়ো বড়ো কার্যে নিযুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন | তিনিও অনায়াসে তাঁদের সকলের মতো অনুরূপ কার্যে জীবন ঢেলে দিতে পারতেন , কিন্তু অত্যন্ত সচেতনভাবে তা এড়িয়ে গেছেন | ধন-মানের অভিলাষ স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেবার কারণ – তাঁর মনে হয়েছিল দেশে উত্তম শিক্ষকের যথেষ্ট অভাব এবং সেই অভাব পূরণের জন্যই শিক্ষকতাকে পেশা ও নেশা করে ফেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ |
১৮৭২ সালে ব্রাহ্মদলের মধ্যে স্ত্রী স্বাধীনতার আন্দোলন উপস্থিত হয় | রামতনু লাহিড়ী স্ত্রী স্বাধীনতার পক্ষেই ছিলেন | সেই সূত্রেই স্বীয় ভাইঝিদের সঙ্গে নিয়ে টাউন হলে কেশবচন্দ্র সেনের বক্তৃতা শুনতে আসেন | এমন সময় ভ্রাতৃষ্পুত্রী সহ রামতনুকে দেখে পুরানো বন্ধু প্যারীচাঁদ মিত্র ঠাট্টা করে বললেন , ” কি হে রামতনু ! বুড়ো বয়সে শিং ভেঙে বাছুরের দলে মিশিলে নাকি ? ” ১০ রামতনু লাহিড়ী কথাটার কোনো আমল দিলেন না | কারণ তাঁর মনে হয়েছিল প্যারীচরণ তাঁর ভাইঝিদের সঙ্গে পরিচিত হতে চান | তিনি জানতেন প্যারীচরণ হালকা লোক | তাই ভাইঝিদের ত্রিসীমানায় প্যারীচরণকে ঠেসতে দিলেন না | স্ত্রী স্বাধীনতার পক্ষে হয়েও আদব কায়দার প্রতি তাঁর কড়া নজর ছিল |
কুমারী এক্রয়েড়ের নেতৃত্বে হিন্দু মহিলা বিদ্যালয় স্থাপিত হলে তিনি স্বীয় কন্যা ইন্দুমতীকে সেখানে ভরতি করে দিলেন | স্ত্রী শিক্ষার প্রসারে তাঁর চেষ্টার ত্রুটি ছিল না – দুপুরে আহারের পর খানিক বিশ্রামান্তে বাড়ির মেয়েদের একটি ঘরে একত্রিত করে মুখে মুখে অনেক ভাল বিষয়ের আলোচনা শুনাতেন | কখনো কখনো কোনো একজন মেয়েকে একটি বই থেকে পাঠ করে অপর সকলকে শুনাতে নির্দেশ দিতেন | তিনিও মধ্যে মধ্যে পাঠ চলাকালীন ঐ পঠিত বিষয় অবলম্বন করেই অনেক জ্ঞাতব্য বিষয়ের কথা অবতারণা করতেন | পরে মেয়েরা ঐ পঠিত বিষয়ের কথা অন্যদের কাছে আলোচনা করতেন | নিজ গৃহের বাইরে থাকলেও এই নিয়ম চালু করে সেখানকার মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলবার প্রয়াস নিতেন |
১৮৬১ সালে রামতনু লাহিড়ী বরিশাল থেকে কৃষ্ণনগর কলেজে আসেন এবং ১৮৬৫ সালে নভেম্বর মাসে পেনশন নিয়ে কৃষ্ণনগর কলেজ থেকে অবসর নেন | এখানে উল্লেখ্য পেনশন পাবার জন্য তিনি কৃষ্ণনগর কলেজের অধ্যক্ষ মিঃ আলফ্রেড স্মিথের কাছে আবেদন করেন | আবেদন পত্রটি শিক্ষা -অধিকর্তার কাছে পাঠাবার পূর্বে স্মিথ তার উপরে মন্তব্যে লেখেন –
” In parting with Baboo Ram Tanoo Lahiri I may be allowed to say that Government will lose the services of an educational officer , than whom no officer has discharged his public duties with greater fidelity, zeal and devotion , or has laboured more assiduously and successfully for the moral elevation of his pupils .”
শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয় এর বাংলা করেছেন এইভাবে – ” বাবু রামতনু লাহিড়ীকে বিদায় দিবার সময় আমি বলিতে চাই যে , ইনি চলিয়া গেলে গর্বণমেণ্ট এমন একজন শিক্ষক হারাইবেন যাঁহার অপেক্ষা আর কোনও শিক্ষক অধিক বিশ্বস্ততা , উৎসাহ ও তৎপরতার সহিত স্বীয় কর্ত্তব্যসাধন করেন নাই অথবা ছাত্রগণের নৈতিক উন্নতির জন্য অধিক শ্রম করেন নাই বা সে বিষয়ে অধিক কৃতকার্য্যতা লাভ করেন নাই | ” ১১
রামতনু লাহিড়ী শিক্ষকতা ব্রতের উপর এটি কি একটি শ্রেষ্ঠ সার্টিফিকেট নয় ? উপসংহারে শিবনাথ শাস্ত্রী মহাশয় এই চিঠির প্রসঙ্গে যে কথা বলেছেন তাই লিখে শেষ করব এই প্রবন্ধটি| ” কালেজের অধ্যক্ষ তাঁহার পত্রে যে কয়েকটা কথা বলিয়াছেন তাহা শত শত হৃদয়ের অন্তর্নিহিত বাণীর পুনরুক্তি মাত্র | ” ১২
—————————————————————
তথ্য প্রাপ্তি :
১| রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গ সমাজ , শিবনাথ শাস্ত্রী ,নিউ এজ পাবলিশার্স প্রা.লি., পৃ: ১৬০ | ২| ঐ, পৃ: ১১৭ ৩| ঐ , পৃ: ১৬০. ৪| ঐ , পৃ: ১৬০ ৫| ঐ , পৃ: ১৬০- ১৬১. ৬| রামতনু লাহিড়ী , বারিদবরণ ঘোষ , গ্রন্থতীর্থ , পৃ: ৪১ ৭| রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গ সমাজ , পৃ: ১৬১ ৮| ঐ , পৃ: ২৫৮ ৯| ঐ , পৃ: ২৫৯- ৬০ ১০| ঐ, পৃ: ২৩৭ ১১| ঐ , পৃ: ১৬০ ১২| ঐ , পৃ: ১৬০

( চলবে )

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।