।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় মৌসুমী বিশ্বাস

আশ্রয়

তখনও ভোরের আলো ঠিক মতো ফোটে নি । কানাই লাল সরকার পায়ে জুতো গলিয়ে হাতে ছড়ি নিয়ে বাড়ির গেট খুলে বাইরে বেরিয়ে এল। ঘরের মানুষ জানে– এই সময় রোজ তিনি প্রাতঃ ভ্রমণে বের হন। ঝড় জল তাকে দমাতে পারে না ।
হাঁটতে হাঁটতে কানাইলাল রেল লাইনের পাশের ঝুপড়ি গুলোর সামনে এসে দাঁড়াল । তারপর একটা দরমার বেড়া দেয়া ঘরের সামনে গিয়ে তিন বার টোকা দিল। বেড়া দিয়েই তৈরি দরজাটা আস্তে করে খুলে গেল ।
— কি রে লতু, তোর পোলার জ্বর কমল!
— না বাবু, জ্বর টা কিছুতেই কমছে না । ডাক্তার বাবুর কথামতো মাথায় জল পট্টি দিচ্ছি । তবুও– – – – – । কিছু খেতে চাইছে না । খুব দুর্বল হয়ে গেছে ।
— হ্যাঁ । ধৈর্য ধর। সব ঠিক হয়ে যাবে ।
লতু মানে লতিকার এই একটাই ঘর। দরমার বেড়া দেয়া । মাঝে একটা প্লাস্টিক দিয়ে ঘর দু ভাগে ভাগ করা হয়েছে । ও পাশে ছেলে টা একটা তক্তা পোষের ওপর নির্জীব হয়ে শুয়ে আছে । এ পাশে কোনো তক্তা পোষ নেই । তবে মাটির মেঝেতে ছেঁড়া মাদুরের ওপর কাঁথা পেতে বসার বা শোয়ার ব্যবস্থা করা আছে।
তাতে বসতে বসতে কানাইলাল বলল
— তাড়াতাড়ি আয় লতু। কাজ সেরে আজ তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরতে হবে । আদালতে একটা ভারী কাজ আছে।
— না বাবু ; আজ পারব না।
— পারবি না মানে! অবাক হয় কানাইলাল ।
এ রকম কথা যে শুনতে হতে পারে ভাবেই নি।
— পারব না বাবু; পারব না । আমার শরীর খারাপ ।
— তোরও কি জ্বর এসেছে না কি!
চিন্তিত হয় কানাইলাল ।
— না তা নয় । মেয়ে ছেলের যেমন শরীর খারাপ হয় তেমন।
— আরে আয় আয় । ওতে কিছু হবে না ।
— না বাবু; গত মাসে তুমি জোরজার করলে । আমার কথা টা শুনলে নাই। কিন্তু এক হপ্তা ভুগলাম তো আমিই!
— ভুগেছিস বটে ; তবে ডাক্তারের কাছে থেকে ওষুধ তো আমিই এনে দিয়েছি।
ঠিক এমন সময় ছেলেটা কেঁদে উঠল। ও ঘরে যেতে যেতে লতিকা বলল
— আজ যাও বাবু । তুমি বরং দুটো দিন পর এস।
মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল কানাইলালের। শালী বলে কী — দুটো দিন পর এস! নাহ্; তিনি রাগ করেও করতে পারেন না । কারন প্রতি দিন লতুকে না হলে তার চলে না।
কানাই লাল সরকার এক ভদ্র সভ্য মানুষ । বিবেচক কর্তব্যপরায়ণ । সমাজের মানুষ তাকে গন্য মান্য করে । ঘরে সতী লক্ষি স্ত্রী । পাঁচটি ছেলে মেয়ে । বড় ছেলে বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন । বড় ছেলে নদীয়া পুলিশে কর্মরত। মেজো ছেলে কে কাপড়ের কল খুলে দিয়েছেন। ছোট ছেলে মেয়ে দুটি স্কুলে পড়াশোনা করে । পয়সার অভাব নেই তার। সে নিজে এক জন সু দলিল লেখক । এত ভালো দলিল লেখক এ তল্লাটে আর নেই। গ্রামের সবাই প্রয়োজনে তার কাছেই আসে। আদালতের চক্কোরে কেউ ফেঁসে গেলে পরামর্শটা তিনিই দেন। তবে বিনা পয়সায় তিনি একটাও কাজ করেন না। তার প্রচুর পয়সা দেখে মানুষ একটু নিন্দা মন্দ করে । বদনাম করে । এ সবে তিনি বিশেষ আমল দেন না।
ঘরে লক্ষিমন্ত বৌ সারা গা ভর্তি গয়না পরে এ ঘর ও ঘর করেন। চৌরাস্তার মোড়ের মাথায় তিন তলা বিরাট বাড়ি । যত বিরাট বাড়ি; তত তার আশ্রিত । ঘরে এক বার কেউ ঢুকলে তাকে না খাইয়ে ছাড়েন না কানাইলালের স্ত্রী গৌরি দেবী।
তাই তার ঘরে রোজ কোনো না কোনো আশ্রিতের পাত পড়ে। তারপর জমিতে কাজ করার মানুষজন তো আছেই। তাদের সক্কলকে সকালের তরকারি মুড়ি দুপুরের মাছ ভাত আবার বিকালের চা মুড়ি খাইয়ে তবে তাদের বাড়ি পাঠায় গৌরি দেবী।
স্বামী কি করেন কোথায় যান; তার খুব একটা খবর তিনি রাখেন না । কানা ঘুষোয় যে কিছু শোনেন না; তা কিন্তু নয়! শোনেন ; বিশেষ আমল দেন না । পুরুষ মানুষের এমন একটু রোগ
থাকেই। তাবলে মানুষটাকে দোষ দিলে; সব সময় অশান্তি করলে তো চলে না! বরং চুপচাপ থাকলেই ঘরে শান্তি বজায় থাকে । আর তিনি চুপচাপ থাকেনও।
— কি হল ; খেতে দেবে । না কি না খেয়ে ই বেরিয়ে যাব।
— ছিঃ ছিঃ । তা কেন !
পরক্ষনেই হাঁক পারেন
— অ্যাই বুঁচি । তাড়াতাড়ি তোর দাদা বাবুর জন্য ভাত বেড়ে নিয়ে আয়।
কানাইলালের আজ মেজাজ খারাপ । ভোর ভোর লতু মেজাজটা খারাপ করে দিয়েছে। বলে কিনা শরীর খারাপ- – – – – । এই শরীর কোথায় থাকত ; যদি না তিনি তখন তাদের উদ্ধার করে আনতেন!
ঠিক সময়ে খবরটা দিয়েছিল ষষ্টি চরণ। ষষ্টি চরণ তার খাস লোক। যে কোনো খবর আদান প্রদান ; বিশেষ বিশেষ কাজ সব একা হাতে সামাল দেয়া তার কাজ। কানাই লালের বিশেষ স্নেহের পাত্র। বিশ্বস্ত হয়ার জন্য তাকে ভরিয়ে দেন তিনি । কোনো অভাবই রাখেননি। বিশ্বস্ততা প্রমাণ দেয়ার আর এক বার সুযোগ এসে গেল তার কাছে।
— বাবু একটা ভালো খবর আছে।
খুব নিচু স্বরে বলেছিল ষষ্টি চরণ । মা ঠাকরুণ শুনলে কি মনে করবেন ! তাই – – – –
বাবু তাকালেন ষষ্টির দিকে। চোখে এক রাশ জিজ্ঞাসা!
— পাশের গ্রামের মিলন সাপের কামরে মরেছে; সেটা তো আপনি জানেন!
— আমি যে টা জানি না সে টা বল।
— মিলন মরার পর ওর বৌ আর ছেলেটাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে ওর বাবা।
বিদ্যুতের বেগে যা চিন্তা করার চিন্তা করে নেয় কানাইলাল ।
— যা যা; নিয়ে আয় । বসে আছিস কেন!
— বলছেন। যাই।
— আহ্; যা না । তাড়াতাড়ি কর। আর শোন ; রেল পারের বস্তিতে তাদের থাকার বন্দোবস্ত করে রাখবি। দেখবি কোনো অসুবিধা যেন না হয় ।
ব্যাস । সেই ঠাঁই হল লতিকা আর তার ছেলের। সে বাবুর প্রতি কৃতজ্ঞ । ও জানে — এ সংসারে দেওয়া নেওয়ার সম্পর্কটাই বেশি মজবুত । বাবুর থেকে পাচ্ছে; তাই দিচ্ছে।
যে দিন ওর শ্বশুর ও কে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল; সে দিন তো ও হারিয়েই যাচ্ছিল! ছেলে কে কোলে নিয়ে অনেক খন ধরে রেল স্টেশনের বেঞ্চিতে বসে ছিল ট্রেনের আশায়। ট্রেন আসে নি । এসে ছিল ষষ্টি চরণ । দশ হাত জলের তলায় ডুবে ছিল লতিকা । শুধু বুঁদ বুঁদ টুকু উঠছিল। হাত ধরে যদি টান না দিত ষষ্টি । তাহলে কি হত!
আর বেশি ভাবে না লতিকা। ভেবে কি হবে! রাতারাতি গ্রাম ছেড়ে এখানে চলে এল। মা নেই বাপ নেই; কার কাছে ঠাঁই পাবে! ঠাঁই দিল কানাইলাল । রেল পাড়ের বস্তিতে ঘর করে দিল। ভাতের জন্য পয়সা দিল। আর কি চাই! জীবনে তো এই টুকুই চাওয়া । কানাই লাল কে দেবতা জ্ঞান করে লতিকা।
কানাই লালের নেশা লতিকা ।
লতু যা চাইবে তাই পাবে। তবে লতু কিন্তু বেশি কিছু চায় না । লতু খারাপ মেয়ে নয়। পেটের জন্য ছোট ছেলে টার জন্য স্বভাব খারাপ করেছে। তা বলে সে বেইমান নয়। বাবু বলেছে
— ছেলে টা কে মানুষ করে দেবে। আর কি চাই! ছেলেটা মানুষের মতো মানুষ হয়েছে– এ টাই ও মরার আগে জেনে যেতে চায় ।
তাই বাবু কে ধরে রাখতেই হবে । ছাড়া চলবে না।
কিন্তু মানুষ ভাবে এক ; আর হয় এক।
নয়তো সে দিন নারকেল গাছের তলা দিয়ে যাবার সময় ইয়া বড় ঝুনো নারকেল টা তার মাথায় পড়বেই বা কেন!!
কানাইলালের ছেলেরা ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় পেল না । উঠোনের ওপর নারকেল গাছের তলাতেই পরে মরে গেল।
লতিকার কিন্তু তাতেও দিন শেষ হল না। এ গলি ও গলি ঘুরে ঘুরে গলির শেষে আবার প্রচন্ড একটা ধাক্কা । মুহূর্তে অন্ধকার দেখলেও একটা আলোর রশ্মি ও দেখতে পেয়েই গেল।
সেই ষষ্টি চরণ! ষষ্টি চরণের পরামর্শে লতিকা ছেলে কে কোলে করে কানাইলালের বিধবা পত্নী গৌরি দেবীর কাছে গিয়ে আশ্রয় ভিক্ষা করল।
ঘরে অতিথি এলে তাড়াতে নেই। অতিথি কে নারায়ণ জ্ঞানে সেবা করেন তিনি । লতিকার আর তার ছেলের আশ্রয় জুটল।
ওপর ওয়ালার ইচ্ছের ওপরে তো কেউ কোনো দিন হাত দিতে পারে নি! তাই লতিকা কৃতঙ্গ থাকবে ভগবান রূপী কানাইলালের বিধবা পত্নী গৌরি দেবীর কাছে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।