গল্পেরা জোনাকি তে মৃণালিনী ভট্টাচার্য

হলুদ হীরের দুল

স্কুলে যাওয়ার পথে রোজই দেখতাম একটি ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে একটা বড় বাড়ির বিপরীতে রাস্তার ফুটে বসে আছে মাথার উপরে প্লাস্টিক দিয়ে ঘেরাটার ভিতরেই ছেঁড়া নোংরা কাপড় পরা একটা ২৬-২৭ বছরের মেয়ে, প্লাস্টিক ঘেরাটার ভিতরেই কাপড়-চোপড় নোংরা বিছানা মাদুর, আর আছে দুটি স্টিলের থালা ও একটি ভাঙ্গা গ্লাস।
স্কুলে যাচ্ছি বউটি একদিন আমাকে বলল, ” আমি ও আমার ছেলে এখানে থাকি গো দিদিমণি ছেলে ছাড়া আমার এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই ”
আমি বললাম, তোমাকে তো রান্না করতে দেখি না খাও কি ,
ওই সামনের বাড়ির কাকিমা প্রতিদিন আমাদের খেতে দেন আমার ছেলেকে মাঝে মাঝে দুধও দেন। আর ওই দেখো দূরে যে ডাস্টবিন আছে তার থেকে আমি অনেক খাওয়ার পাই তাতেই আমাদের হয়ে যায় গো দিদিমনি।
সেই থেকে মাঝেমধ্যে আমিও কিছু খাবার ওদের দিতে লাগলাম, প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু সঙ্গে করে নিয়ে যেতাম। একদিন আমি যাচ্ছি দেখলাম সত্যিই বড় বাড়িটার এক মাঝবয়সী কাকীমা নাম লীলা, থালায় করে লুচি, তরকারি ও দুটি মিষ্টি ওদের দিয়ে গেল। তুই যেন একা খেয়ে নিস না বাচ্চাটাকে আগে খাইয়ে দে।।

হ্যাঁগো কাকিমা, আমি তো মা আগে ওকে পেট ভরিয়ে খাইয়ে দিই তারপর যা থাকে সেটাই আমি খাই। কাকিমা এতসব খাবার আমাদের দিয়ে দিচ্ছ তোমরা খাবে না?।
একা মানুষ কত খাবো বল? অবশ্য কাল রাতে আমার ভাই নিতু এসেছে। তাইতো এত কিছু রান্না করেছি। কাল রাত থেকে এত বৃষ্টি পড়ছে তুই বাচ্চাটাকে নিয়ে আমার গ্যারেজের সামনে তো থাকতে পারতিস, তা না সারারাত বসে বসে বৃষ্টিতে ভিজলি বুঝি?। না গো কাকিমা, কাল রাতে আমি ওই দূরে কালী মন্দিরের সামনেটাই শুয়ে পড়েছিলাম একটুও বৃষ্টিতে ভিজিনি
বড়ো ভালো মানুষ এই লীলা কাকিমা , গরিবদের উপরে বড় দয়া ওনার। ওনার ভাই নিতু দাদাবাবু একদম ভালো মানুষ নন, উনি আমাদের সহ্য করতে পারেন না। জানো দিদিমণি নীতু দাদাবাবু কিন্তু লীলা কাকিমার নিজের ভাই নন, ওনার তিন কুলে কেউ নেই বলে কাকিমা ওনাকে ভাই বলে ডেকেছেন।
সেদিন মেয়েকে স্কুলে পাঠিয়ে সংসারের কাজ সারতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল, তাই হন হন করে হাঁটছি রাস্তা দিয়ে, উত্তেজিতভাবে আমাকে অনুসরণ করে ছুটতে ছুটতে এল মাধবী, মাধবী ওই বউটির নাম।
দিদিমণি ও দিদিমণি! উত্তেজিত কন্ঠে ডাকলো আমাকে, একটু দাঁড়াও না গো, দেখো দেখো ডাস্টবিন থেকে খাবার খুঁজতে খুঁজতে আমি এটা পেলাম, এই বলে হাতের মুঠো খুলে দেখালো আমাকে, আমার চোখটা ধাঁধিয়ে গেল সোনার উপরে বসানো খুব দামি হলুদ হীরের একটি কানের দুল।
কোথায় পেলি এটা? আমি জিজ্ঞাসা করি।
ডাস্টবিনের মধ্যে, মাধবী জবাব দিল। কেন দিদিমণি এটা কি খুব দামি? দেখে তো খুব দামি মনে হচ্ছে, কিন্তু ডাস্টবিনের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া জিনিসকে খাঁটি বলে মেনে নেয়া খুবই শক্ত।
মানে দিদিমণি এটা সোনার? আজ আর স্কুলে যাওয়া হলো না, অগত্যা একটা সি এল নিয়ে নিলাম।
চলো আমার সঙ্গে সামনের সোনার দোকানে স্যাকরা যা বলবে তাই হবে। বাচ্চাটাকে নিয়ে মাধবী আমার সঙ্গে চলল।
আরে এই তো সেই দাম এই হলুদ হীরে বসানো দুল যেটা ওই বড় বাড়ির লীলা কাকিমা দিন পাঁচেক আগে আমার কাছেই করিয়ে নিয়ে গেছেন। কিন্তু এটা এর কাছে এলো কি করে?। মাধবী এটা ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে।
না, এটা হতে পারে না ওই মাধবী লীলা কাকিমা কে খুন করে তার কান থেকে কানের খুলে নিয়েছে। না না খবর দেওয়া দরকার খবর দিচ্ছি ওনাদের ——–।
খবর পেয়েই এলেন থানার ওসি ও দুজন মহিলা সশস্ত্র পুলিশ কনস্টেবলকে সঙ্গে নিয়ে এসেই মাধবীকে গ্রেপ্তার করলেন। দুহাতে হাতকড়া পড়ে হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে মাধবী। বিশ্বাস করুন দারোগা সাহেব এটা আমি ডাস্টবিনের মধ্যেই পেয়েছি, আমার নিজের বলতে এই বাচ্চাটা ছাড়া আর কেউ নেই, লীলা কাকিমা কে আমি আমার মায়ের মত ভালবাসি। উনি প্রতিনিয়তই আমার বাচ্চাকে এবং আমাকে খাওয়ার দেন, উনি না খেতে দিলে এতদিনে হয়তো আমরা মারাই যেতাম। এটা আমি ডাস্টবিন থেকেই পেয়েছি,ওই দিদিমনি সাক্ষী বলে সে আমার দিকে তাকালো।
সত্যিই তো ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে পেয়ে মাধবী ছুটতে ছুটতে আমাকেই দেখিয়েছিল ওই দুলটা। আপনি কি ওকে ওটা ডাস্টবিন থেকে কুড়িয়ে নিতে দেখেছেন? আমার মুখের উপরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি দিয়ে পুলিশ ওসি পল্লব সেন প্রশ্ন করেন?। না, সেটা আমি দেখিনি।
রীতিমতো চালাক ওই মাধবী গরিবের বেশে থেকে অনেকের দয়া কুড়িয়ে নিয়ে তাদের খুন করে। তুমি দিদিমনির চোখে ধুলো দিতে পারলেও,আমার চোখে ফাঁকি দিতে পারবে না। তুমি ম্যাডামকে খুন করে কানের দুলটা ডাস্টবিনের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিলে, কানেরটা বের করে দিদিমণিকে দেখাতে এনেছিলে।
সোনার দোকানের লোকটা এসে বলল, দুলের জন্য খুন করা হয়েছে এ কথা ধরে নিচ্ছেন কেন? সামান্য একটা দুল যেকোনো সময় মাধবী খুলে নিতে পারতো কায়দা করে তার জন্য খুন করার প্রয়োজন কি?।
না না নিতু অর্থাৎ লীলা দেবীর ভাই তাই বলেছেন। উনি নিজে দেখেছেন দিদির কান থেকে কানের ছিনিয়ে নিয়ে মাধবী চলে যায়, তারপর ঘরে ঢুকে দেখেন দিদি মরে পড়ে আছে। আমার দিদিকে গলা টিপে খুন করে ও ঘরের অনেক জিনিসের সাথে কানেরও নিয়ে যায়।
হুজুর আমি চোর নই খুনি নই ফোঁপাতে ফোঁপাতে মাধবী বলে। বিশ্বাস করুন হুজুর ডাস্টবিনে আমি প্রতিদিন খাবার খুঁজি, আজ খাবার খুঁজতে খুঁজতে এই দুলটি আমি পেয়েছি।
দুলটা ধরা পড়ে গিয়েছে তুমি যে চোর সেটা প্রমাণ হয়ে গিয়েছে। তুমি খুনি কিনা সেটাও প্রমাণ হয়ে যাবে।
মাধবীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হল লীলা দেবীর বাড়িতে, আমিও সঙ্গে গেলাম।
লীলা দেবীর মৃতদেহের গলার উপরে আঙুলের ছাপ পরীক্ষা করছিলেন ফরেনসিক ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানী সৌমেন সিংহ। মাধবী কে নিয়ে গিয়ে ওসি বললেন খুনিকে ধরে নিয়েছি স্যার আপনি পরীক্ষা করে দেখুন লীলা দেবীর গলায় এরই আঙুলের ছাপ আছে।
এদিকে লীলা দেবীর ভাই নিতু বাবু বারবার বলতে লাগলেন দিদিকে অনেকবার বারণ করেছিলাম ওদের পাত্তা দিসনা, দিদি কোনদিন আমার কথা শোনেনি,তাই দিদিকে মরতে হলো।
মিস্টার সেন ওই নিতু বাবুর হাতের অর্থাৎ আঙুলের ছাপ নেব, একটু সাহায্য করবেন বললেন।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।