সকালে প্রতিদিনই উঠতে দেরি হয়ে যায়, আসলে প্রত্যেক রাতেই আমার নতুন করে একটা মৃত্যুর আয়ুকে জয় করার চ্যালেঞ্জ থাকে। অনেক প্রশ্ন, তুচ্ছাতিতুচ্ছ জীবনের আরও নগন্য খুঁটিনাটি নিয়ে মনের মধ্যে প্যাঁচাল পারার স্বভাব বয়েসের সাথে সাথে পার হচ্ছে স্কুলের এক একটা জুনিয়র ক্লাস।
এই যেমন দুদিন পরে আমার অভাগা দেশে পঁচাত্তর তম স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন হৈ-হুল্লোড়ে কিটি পার্টি, রাতভর ফুটবল ম্যাচ, ক্লাবে হুইস্কি বরফের গদগদ প্রেমে, পাড়ায় পাড়ায় মাংস বিরিয়ানিতে একেবারে উপচে পড়বে।আর আমি বোকার হদ্দ সেই স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে কিনা স্বাধীনতা, বিপ্লব, দেশ প্রেম উপলব্ধি এসব নিয়ে মেলোড্রামা করছি?
হ্যাঁ সত্যিই তাই, সেলিব্রেশনে শামিল হতে পারিনা সবসময় এ যেমন অক্ষমতা তেমনি একটা বিশেষ দিনে জোর করে কিছু জীবনের ঋণ স্বীকার করার যে কৃত্রিম সমারোহ তাতেও সামিল হতে পারিনা এও তেমনি আর এক দুর্বলতা। এই দুর্বলতা নিয়েই থাকতে চাই, কারণ জন্ম ইস্তক এই দেশ আর দেশের খেটে খাওয়া, দীনদরিদ্র আধপেটা চাষী,কারখানার ৫০ ডিগ্রি তাপে পুড়তে পুড়তে ঘাম রক্ত ঝরা শ্রমিক, রাস্তায় ঝাঁকা মাথায় সারাদিনের ছাতু লঙ্কা খাওয়া মুটে, রিক্সাওয়ালা, ভোরের কাচরা নিতে আসা জমাদার, শুধু পেটের জ্বালায় ভোর চারটের ট্রেনে সবজি বয়ে আনা চার বাচ্ছার মা, আর আমার আরও হাজারো শুভাকাঙ্ক্ষী, হাত পোড়ানো, ভাগ্য খোয়ানো বুকের লাবডুব বুঝতে পারা সমাজবন্ধুদের থেকে শুধু নিয়েই চলেছি, শুধু তাদের অকল্পনীয় কায়িক শ্রমের বিনিময়ে নিজেদের জীবন কে সুরক্ষিত করছি, আয়াসের আরামের নিশ্চয়তা কায়েম করেছি। এই পঁচাত্তর বছরের স্বাধীনতা কি দিয়েছে তাদের?
যাদের জন্যে আমরা বাবুয়ানা করি আর তারা আজও সকালের পান্তা আর রাতে মুরি জলের অপেক্ষায় থাকে।
একটা আপাত সাম্যাবস্থার দেশ, সমবন্টনের দেশ গনতান্ত্রিক সরকারের দীর্ঘ শাসনে পুঁজিবাদের বদান্যতায়, উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের আনুগত্যের ধামা ধরে আজ সেই বিলাসী কিছু তথাকথিত ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কাছেই মাথা বেচে বসে আছে।
কিসের স্বাধীনতার গৌরব? কিসেরই বা মুক্তিযুদ্ধ? কোথায় মুক্তি?
একদিকে চূড়ান্ত ভোগ, বড়লোকি, অপচয় আকাশছোঁয়া অপব্যবহার আর অন্যদিকে চরমতম গরিবী, অনাহার, অপুষ্টি, শিশু মৃত্যু
রাতের অন্ধকারে কুকুরে মানুষে কাড়াকাড়ি করে খুঁটে খাওয়া রয়িসের এঁটো থালা।
কি লজ্জা! কি ভয়ংকর জ্বালা! শরীরে মনে দিনে দিনে এই স্বাধীনতার পেছনে জমে উঠছে কি ব্যাঙ্গাত্মক গ্লানিবোধ।
অন্ধ দাম্ভিক সরকারের পোষা পেয়াদাদের উপদ্রবে ধর্ম, জাতপাত, ধনী গরীব, নিয়ে মানুষ মানুষের সাথে উন্মাদের মতো লড়ে এখনো আর অশিক্ষিত এই লাগামহীন একশো ত্রিশ কোটি মুখগুলো কে এই নিছক নোংরা খুঁটিনাটিতে ব্যস্ত রেখে বিদেশের ব্যাঙ্কে যাচ্ছে দেশের জনতার ট্যাক্সের টাকা।
এখন কেউ আমায় এক চড় মেরে বললো, এই বেইমান, লজ্জা করেনা; আমাদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উচ্চ শিক্ষা, চিকিৎসা, বিদেশের পুঁজি আনতে পর্যটন কালচারাল উন্নয়ন, এসব দিক ভুলে গেলে? আমাদের ক্রিকেট হকি ভারোত্তোলন ইত্যাদি ইত্যাদি?
কি আর বলবো, সেতো লাখো দৈত্যকুলে দু’একটা প্রহ্লাদ! তবুও ওইটুকুতেই মাঝেমধ্যে চোখে জলের আলপনা আঁকা যায়, ঠিক অবকাশে, জাতীয় পতাকায় তেরঙ্গা চমকে ওঠে, ‘জনগণ মন অধিনায়ক ‘ শুনে গর্বে আনন্দে প্রাণ কেঁদে ওঠে। খুঁজে খুঁজে দেখি কোথায় এমন অপূর্ব দীপের শিখা জ্বলছে। যে ছেলেটা বাবার চায়ের দোকানে বসে মাধ্যমিক পরীক্ষায় স্টার পেল, যে মেয়েটি অসুস্থ বিধবা মায়ের সেবা করে ভোরের ট্রেনে কলকাতার বুকে নামে সরকারি স্কুলে চাকরি করতে, যে তরুণ ইঞ্জিনিয়ার দেশের উন্নতির জন্যে বিদেশের লোভনীয় চাকরি প্রত্যাখ্যান করল। যে স্বেচ্ছাসেবী ঝকঝকে ছেলেপুলের দল হইহই করে বন্যায়, রোগে, মহামারীতে, ঝড়জল মাথায় নেমে পড়ে দুহাত বাড়িয়ে… শীতে কাতর ভিখিরির গায়ে জড়িয়ে দেয় একখানা কম্বল। আছে এমনও আছে শতশত কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা যে নগন্য তুচ্ছতম। তার চেয়ে ঢের বেশী মজুত আছে ভারতের আটটা মহা ধনী মন্দিরে, লাখো জমা পড়ে ছাতা পড়ছে বিখ্যাত মাল্টি মিলিয়নারদের ব্যাঙ্কের তহবিলে।
কি এ শিক্ষা, কি এমন অসহায়তা যে পৃথিবীর আপাত বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশটাকে বিকিয়ে যেতে হয় ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্টদের পায়ে?
এর কারণ আমরা নিজেরাই খুঁড়েছি আমাদের কবর, শুধু মুষ্টিমেয় কিছু নেতা পলিটিশিয়ানদের উদ্দেশ্য সিদ্ধি আর পুরো শাসন যন্ত্রটাকে যুগ যুগ ধরে বিপথে কোরাপশান অর্থাৎ উল্টো পথে কায়েম রাখার জন্যেই এতো পণ্ডশ্রম। আজ পঁচাত্তর তম স্বাধীনতা দিবসের দিন গাঁজায় দম দিয়ে বলছে এসব হক কথা এই ঠোঁট কাটা কমলাকান্তের বংশধর। আছে আরও অনেক সাহসী বুক যারা ভয় পায় না আজকের সত্যিটাকে সবার কাছে স্পষ্ট করে নিতে। চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতে উলঙ্গ রাজাকে,
‘ রাজা তোর কাপড় কোথায়?’ হ্যাঁ, তারাও এগিয়ে এসে কলম তুলে নিয়ে লিখুক হীরক জয়ন্তী স্বাধীনতা দিবসের নগ্ন ছবি।
ততক্ষণ আমি আসি, দেখি ১৫ ই আগস্টের স্পেশাল ফ্যাশান শো, ফুটবল ম্যাচ, ক্লাবে ক্লাবে বড়বাবুদের রাজনীতি অর্থনীতি নিয়ে ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে আস্ফালনের বুকনি, পাড়ায় পাড়ায় পতাকা উত্তোলনের হিড়িক, নেতাদের ফুটবল ম্যাচ উদ্বোধন। আর তারপর প্রতিবারের মতো দুপুরে মাংস ভাত খেয়ে ভাবি, দূর শালা, আসছে বছর আবার হবে।