গারো পাহাড়ের গদ্যে মাহফুজ আল-হোসেন

চার্লস বুকোওস্কির কবিতা:
আত্মসংলাপধর্মিতার স্বয়ম্ভূ উচ্চারণ

বৈশ্বিক মহামারী করোনার মধ্যে বিগত বছরের ১৬ আগস্ট বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী মার্কিন কবি চার্লস বুকোওস্কি’র জন্মশতবার্ষিকীর দিনটি সকলের অলক্ষেই চলে গেছে। শুধু মার্কিন মুল্লুকের নয় বিশ্বকবিতার গুরুত্বপূর্ণ এ কাব্যনির্মাতার ১০০তম জন্মবার্ষিকী এভাবে উদযাপনহীন অতিবাহিত হওয়া কবির মেলোড্রামাটিক যাপিত জীবনের শেষাঙ্কের পুনঃমঞ্চায়ন বললে অত্যুক্তি হবে কি? ১৯৯৪ সালের ৯ মার্চ কবির প্রিয় শহর লসএঞ্জেলেসে লিউকেমিয়ায় ভুগে এ বিরক্তিকর
পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ার একবছর আগে এরকমই ইঙ্গিত রেখে গিয়েছিলেন তাঁর বহুলপঠিত ‘ফেয়ারওয়েল, ফেয়ারওয়েল ‘ কবিতায়:
“ব্লেড কেটে নামায় এবং ভেতরেও কাটে, প্রত্যাহার করে নেয় , আবার ঢোকে উল্টোদিকে কাটতে, এটাই পরীক্ষা :
থুক দে ব্যাটা লেহনকারী, বহু আগেই তো তুই
প্রমাণ করেছিস তোর মুরোদ।
এই অসুখী দুনিয়ায়, আরে এই তেতো অসুখী
দুনিয়ায় বোকার হদ্দ ছাড়া কে আর আছে যে অযথা সময় ক্ষেপন করতে চায়।
( জেনে রাখ তুই ) কিছুই বদলাবে না। আর তোর স্বল্প সৌভাগ্য ইতোমধ্যেই নিঃশেষিত
হয়েছে।
থুক দে ব্যাটা লেহনকারী।
শেষ বিদায়টাই যে মধুরতম। ”
( দ্য ফ্ল্যাশ অব লাইটিং বিহাইন্ড দি মাউন্টেন ,
ভাষান্তর : লেখক )
এ কবিতা থেকে বুকোওস্কিকে যদি কেউ
জীবনবিমুখ কবি ভেবে নেন, তবে তিনি মারাত্মক ভুল করবেন।
জীবনের প্রতি তাঁর আসক্তি ছিল তীব্রতম মাত্রায়। শুধুই কি তাই – অর্থনৈতিকভাবে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকেও ইহজাগতিক জীবনবাদী এ কবির ফ্যান্টাসীপূর্ণ জীবনে অ্যালকোহল, সিগারেট, অবাধ যৌনতা বিশেষ করে বহুগামী অপ্রেমের আসক্তি
ছিলো লাগাম ছাড়া। এরচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো কোনো রকমের
ভানভনিতা ছাড়াই তিনি সেসব কথা অবাধে লিখে গেছেন আত্মসংলাপধর্মী অজস্র পাঠকপ্রিয়
কবিতায়। কবিতায় অশিষ্ট বক্রোক্তির মধ্য দিয়ে উপমাহীন
চরম সত্য প্রকাশ করে গেছেন তিনি দ্বিধাহীন চিত্তে।
আমার অকিঞ্চিৎকর পাঠ থেকে এসবের কিছু দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করছি।

১|
মহান মদ্যপ্রস্তুতকারী

সেই আঠারোশ’ তিরাশিতে
অ্যাঞ্জেলো মারিয়ানি নামের এক কর্সিকান
কোকেনওয়ালা মদ বোতলজাত করেছিল
যেটাকে সবাই ‘ভিন মারিয়ানি’ বলতো।
বহু সম্মানিত ইউরোপীয় মহারথী ওটা
পান করতেন
এমনকি পোপ ত্রয়োদশ লিও পর্যন্ত
এ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন
যিনি এ কৃতিত্বের জন্য মারিয়ানিকে
স্বর্ণপদকে ভূষিত করেন এবং তাঁর
দেয়া শংসাপত্রে মারিয়ানিকে
উল্লেখ করেন
‘একজন মানবতার পৃষ্ঠপোষক ‘ হিসেবে।
( দ্য গ্ৰেট ওয়াইন মেকার , ভাষান্তর : লেখক )
২|
আমার ৪৩তম জন্মদিনের জন্য কবিতা
একাই শেষ হয়ে যাওয়া
একটা ঘরের কবরে
বিনা সিগারেটে
কিংবা মদে–
ঠিক বিজলিবাল্বের মতন
আর ফোলা পেট নিয়ে,
ধূসর চুল,
আর সকালবেলায়
ফাঁকা ঘর পাবার জন্য
বেশ আহ্লাদিত
ওরা সবাই বাইরে
টাকা রোজগারের ধান্দায় :
জজসাহেবেরা, ছুতোরেরা,
কলের মিস্ত্রিরা, ডাক্তাররা,
খবরের কাগজের লোকেরা, ডাক্তাররা,
নাপিতেরা, মোটরগাড়ি যারা ধোয় তারা,
দাঁতের ডাক্তাররা, ফুলবিক্রেতারা,
তরুণী বেয়ারারা, রাঁধিয়েরা,
ট্যাক্সিচালকেরা
আর তুমি পালটি খাও
তোমার বাঁ দিকে
রোদের তাপ পাবার জন্য
পিঠের দিকে
আর তোমার
চাউনির বাইরে ।
( ভাষান্তর : মলয় রায়চৌধুরী )
৩|
সুধর্ষক
আর্নি আমাদের সকলের চেয়ে এগিয়ে ছিল
সে আমাদের সকলের আগে শেভ করা শুরু করে
আর প্রায়শই রহস্যময় টিনের বাক্স থেকে বের করে
রাবারের মতো ওই জিনিসটা আমাদের দেখাতো
সেই আমাদের মধ্যে প্রথম যার একখানা
অটোমোবাইল ছিল এবং সেই গাড়িতে
তার সাথে সবসময় মেয়েরা থাকতো
যাদের মধ্যে সবসময় একজন নতুন যে ভয়ে
জড়সড় স্থির হয়ে বসে থাকতো
আমরা জানতাম সে তাদের সবাইকে লাগাতো
এবং সে জানতো কোথায় জিন পাওয়া যায়
এবং জিনে মাতাল বানিয়ে সে
তাদের সাথে যা করার করতো
সেটা সে করতো নিম্নমাধ্যমিকে থাকতেই
আমরা সবাই যখন মাধ্যমিকে উঠে গেলাম
তখনও সে নিম্নমাধ্যমিকের মেয়েদের (ঐ কাজে)
গাড়িতে উঠাতো
সে ছিলো এমন যেন সে পুরোপুরি নিম্নমাধ্যমিকেরই হয়ে গেছে
কিছুদিন পর আর্নি যখন মাধ্যমিক থেকে
ড্রপ-আউট হলো
আমি তাকে একদম ভুলে গেলাম
বছর কয়েক পরে যখন আমি এই রাস্তা ধরে যাচ্ছি
এক বিকেলে আর্নির সাথে আমার আবার দেখা
হায় যীশু, সে দেখতে একদম চিকনা পটকা ,
প্রায় বিকৃত আর শেষ হয়ে গেছে
আমিও এর মধ্যে বড়োসড়ো হয়ে গেছি আর নিজের ভেতরের পরিবর্তনটাও বুঝতে শিখেছি
আমি ওর পশ্চাৎদেশে একটা চাপ্পড় মেরে বলি :
হাই আর্নি চুতমারানি ,কেমন চলছে?
প্রত্যুত্তরে ‘হাই হ্যাঙ্ক’ বলে সে আমাকে।
আমরা করমর্দন করি, তার হাত ছিলো ঘর্মাক্ত এবং কাঁপছিলো
বেচারা নিজেকেই বলাৎকার করেছে, নিজেকেই
শেষ করেছে বলাৎকারে
আর আমার যা যা থাকবার দরকার ছিলো (প্রায়) সবই তো রয়েছে আমার
যখন নিজের একটা গাড়ী হবে তখন গোটা
লসএঞ্জেলেস শহরটাকেই আমি ধর্ষণ করবো
( দ্যা ফাক মাস্টার : কাম অন ইন,ভাষান্তর :লেখক )
জার্মানীতে 1920 সালে জন্ম নেয়া এ মার্কিন কবি, ঔপন্যাসিক এবং ছোটগল্পকার ছিলেন আমেরিকান সৈনিক পিতা ও জার্মান মায়ের একমাত্র সন্তান। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরেই বুকোওস্কি মাত্র 3 বছর বয়সে পরিবারের সাথে আমেরিকায় চলে আসেন এবং লস এঞ্জেলেস শহরে বেড়ে ওঠেন নানা বৈষম্য, বৈপরীত্য ও মর্মপীড়ার মধ্যে। তাঁর জার্মান ঘেঁষা ইংরেজি উচ্চারণ এবং পিতার চাপিয়ে দেয়া অনাকর্ষনীয় পোষাক-আশাকের কারণে তিনি সহপাঠী ও সমবয়সীদের ঠাট্টা-বিদ্রুপের লক্ষ্যবস্তু ছিলেন। তাঁর এসব হতাশা ও নৈরাশ্য পরবর্তীতে তাকে লেখালেখির সৃজনশীল জগতে ধাবিত করে। লস এঞ্জেলেস হাই স্কুল থেকে গ্রাজ্যুয়েশন করার পর বুকোওস্কির ২ বছর লস্ এঞ্জেলেস সিটি কলেজে অধ্যয়ন করেন শিল্পকলা, সাংবাদিকতা ও সাহিত্য নিয়ে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার পর লস এঞ্জেলেস শহর ছেড়ে নিউইয়র্কে পাড়ি জমান লেখক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। ১৯৪৪ সালে বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে পেনসিলভেনিয়ায় অবস্থানকালে তিনি এফবিআই এজেন্ট কর্তৃক গ্রেপ্তারবরণ করেন এবং ১৭ দিন ফিলাডেলফিয়ায় কারাভোগ করেন। এরপর কিছুদিন পর বাধ্যতামূলক মিলিটারি সার্ভিসে যোগদানের জন্য মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে আনফিট ঘোষিত হন। 24 বছর বয়সে বুকোওস্কির ছোটগল্প “ আফটার মেথ অফ এ্যা লেংদি রিজেকশন স্লিপ” প্রকাশিত হয় এবং এর পরপরই ব্ল্যাক সান প্রেস-এ তাঁর ছোটগল্প “20 ট্যাঙ্কস ফ্রম ক্যাসলডাউন” প্রকাশিত হয় এবং তাঁর আরও কিছু লেখা স্বল্প পরিচিত ছোটকাগজে প্রকাশিত হতে থাকে। কিন্ত‍ু কূলীন সাহিত্যজগতে ধারাবাহিক উপেক্ষো এবং সেভাবে পরিচিতি না পাওয়ায় তিনি অভিমানে 10 বছর লেখা থেকে নিজেকে বিরত রাখেন। যেটাকে তিনি উল্লেখ করেছেন “10 ইয়ার ড্রাঙ্ক”। এ হারিয়ে যাওয়া বছরগুলো এবং লেখক হিসেবে তাঁর অসাফল্যের বিষয়বস্তু নিয়ে ‘হেনরি চিনস্কি’ সিরিজের ফিকশন রচনা করেন। একজন নবীন সাহিত্যকর্মী যিনি জার্মান ব্যাকগ্রাউন্ডের আমেরিকান ইমিগ্র্যান্ট তার প্রতি মার্কিন সাহিত্য সমাজের এই আরোপিত অনীহা একধরনের সাংস্কৃতিক নির্যাতনের পর্যায়ভুক্ত এবং গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক এর ভাষায় এটি ‘এপিসটেমিক ভায়োলেন্স’ হিসেবেও ব্যাখ্যাত হতে পারে। এ সময়ে তিনি আবার লস্ এঞ্জেলেসে ফিরে আসেন এবং স্বল্প সময়ের জন্য একটি আচারের কারখানায় চাকরি নেন। এ সময় তিনি এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ান এবং দারিদ্রের কারণে সস্তা বোর্ডিং হাউজে থাকতে বাধ্য হন। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে আমেরিকার ডাক বিভাগে তিনি পত্রবাহকের চাকরি নেন এবং ৩ বছর চাকরি সম্পন্ন হওয়ার পূর্বেই তা ছেড়ে দেন। ১৯৫৫ সালে কঠিন আলসারে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। হাসপাতাল ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন। এ সময় তিনি টেক্সাসের কবি বারবারা ফ্রাই এর সাথে বিবাহ বন্ধানে আবদ্ধ হন কিন্ত‍ু 1958 সালে তাদের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। পরবর্তীকালে ভারতে তাঁর স্ত্রীর রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। বিবাহ-বিচ্ছেদের পর থেকে পানাসক্ত বুকোওস্কি পুরোদমে কবিতা লিখতে থাকেন। ৫০ দশকের শেষদিকে তাঁর অনেকগুলো কবিতা “গ্যালোজ”-এ প্রকাশিত হয়। ১৯৫৯ সালে তাঁর দুটি কবিতা আভাগার্দ লিটারেরি ম্যাগাজিন ‘নোম্যাড’ এর সূচনা সংখ্যায় প্রকাশিত হয় এবং এর এক বছর পর ‘নোম্যাড’-এ তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ম্যানিফেস্টো : এ কল ফর আওয়ার ওন ক্রিটিকস প্রকাশিত হলে তিনি সাহিত্যজগতে দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হন। ৬০ সালে তিনি আবার ডাক বিভাগে লেটার ফাইলিং ক্লার্ক হিসেবে যোগদান করেন এবং একযুগের মতো ঐ চাকরিতে থিতু হন। এরপর আর তিনি ফিরে তাকাননি এবং ৬০ সালের অক্টোবার মাসে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ হিয়ারসে প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় যার নাম ছিল ‘ফ্লাওয়ার, ফিস্ট এন্ড বেস্টিয়াল-ওয়েইল’। ১৯৬২ সালে তাঁর প্রথম সিরিয়াস গার্লফ্রেন্ড জেন কুনি বেকার এর মৃত্যু হলে দুঃখ ভারাক্রান্ত হয়ে অসংখ্য কবিতা এবং ছোটগল্প লিখতে থাকেন। এরপর থেকেই প্রতি বছরই তাঁর নতুন নতুন কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হতে থাকে। তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত মৌলিক কাব্যগ্রন্থের তালিকা নিম্নরূপ :
ফ্লাওয়ার, ফিস্ট এন্ড বেস্টিয়াল ওয়েইল (1960)
লংশট পোয়েমস ফর ব্রোক-প্লেয়ারস (1962)
রান উইথ হানটেড (1962)
ইট ক্যাচেস মাই হার্ট ইন ইটস হ্যান্ডস (1963)
কোল্ড ডগস ইন দ্য কোর্টইয়ার্ড (1965)
ক্রুসিফিক্স ইন এ ডেথহ্যান্ড (1965)
এ্যাট টেরর স্ট্রিট এন্ড এগোনি ওয়ে (1968)
পোয়েমস রিটেন বিফোর জাম্পিং আউট অফ এন 8-স্টোরি উইন্ডো (1968)
এ বুকোওস্কি স্যাম্পলার (1969)
ডেইজ রান এওয়ে লাইক ওয়াইল্ড হর্সেস ওভার দ্য হিলস (1969)
ফায়ার স্টেশন (1970)
মকিংবার্ড উইশ মি লাক (1972)
বার্নিং ইন ওয়াটার, ড্রাউনিং ইন ফ্লেইম (1974)
লাভ ইজ এ ডগ ফ্রম হেল : পোয়েমস 1974-1977 (1977)
প্লে দ্য পিয়ানো ড্রাঙ্ক লাইক এ পার্কাসন্ ইনস্ট্রুমেন্ট আন্টিল দ্য ফিঙ্গারস বিগিন টু ব্লিড এ বিট (1979)
ড্যাংলিং ইন দ্য টুর্না ফোরলিয়া (1981)
ওয়ার অল দ্য টাইম (1984)
ইউ গেট সো এলোন এট টাইমস ইট জাস্ট মেকস সেন্স (1986)
দ্য রুমিং হাউস ম্যাড্রিগ্যালস :আরলি সিলেক্টেড পোয়েট্রি (1988)
বুকোওস্কির মেইন স্ট্রিম কবি-লেখক হিসেবে ওঠে আসার পেছনে ব্ল্যাক স্প্যারো প্রেসের প্রতিষ্ঠাতা জন মার্টিনের প্রত্যক্ষ সাহায্য ও সহযোগিতা ব্যতীত সম্ভব ছিলনা। দুঃখজনক হলেও একথা সত্য যে, বুকোওস্কির আধুনিক যুগের সূচনাকারী অনন্যকূশল সব কবিতা ব্ল্যাক স্প্যারোর সরাসরি সমর্থন ব্যতীত আমেরিকান কবিতায় প্রাগাধুনিক যুগে এডগার এ গেস্ট এর মতো জনপ্রিয় ব্যালাড রচয়িতাদের ভীড়ে সম্মুখ সারিতে উঠে আসা খুবই কঠিন ছিল। কবির জীবদ্দশায় এবং তৎপরবর্তীতে ব্ল্যাক স্প্যারোর এ ক্রিয়েটিভ পার্টনাশীপ অব্যাহত ছিল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৫০ এর দশকের শেষভাগে উত্তাল বিট জেনারেশনের আন্দোলনে বুকোওস্কি সরাসরি জড়িত না থাকলেও এ আন্দোলনের রথী-মহারথী এ্যালেন গিনসবার্গ, জ্যাক কেরুয়াক এবং উইলিয়াম বারোজ এর কর্মপরিধির সাথে বুকোওস্কির সেসময়ের সাহিত্যকর্মের তুলনা কোনোকোনো গবেষণায় উল্লিখিত হয়েছে। একটি গবেষণায় এরূপ মন্তব্য করা হয়েছে- তিনি বিট এর অন্তর্ভুক্ত না হতে পারেন কিন্ত‍ু তাঁকে ‘বিটেন ওয়ান’ হিসেবে ভাবাই যেতে পারে।
কবিতা ক্রমরূপান্তরনশীল এক নন্দন-আধার। সময়ের সাথে সাথে নদী যেভাব বাক বদলায় তেমনি কালপ্রবাহে রাষ্ট্রনীতি, সামাজিক কাঠামো ও স্তরবিন্যাস, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও রাজেনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিপ্লব, দর্শনশাস্ত্র ও শিল্প-সাহিত্যের নন্দনতত্ত্বের বিকাশের পরিক্রমায় সাহিত্যের অপরাপর শাখার ন্যায় কবিতার প্রকরণ, রীতি ও আবেদন ক্রমপরিবর্তিত হতে থাকে। বুকোওস্কির কবিতার নন্দনতত্ত্ব নিয়ে যতখানি আলোচিত কিংবা চর্চিত হওয়া প্রয়োজন ছিল সেটি ইতিঅগ্রে না হলেও বর্তমানে ব্যাপকমাত্রায় ঝোক ও প্রবণতা বেড়েছে। খুব গভীরে না গিয়েও বলা যায় যে, বস্তুকল্পনা ও প্রকাশের মধ্যে সম্পর্কহীনতা এবং তৎসংশ্লিস্ট ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা আধুনিক কবিতার প্রধানতম নন্দনসূত্র এবং তা শব্দায়িত হয় স্বত:স্ফুর্ত আবেগ ও অনুভবের একান্ত উচ্চারণে। চার্লস বুকোওস্কির কবিতাও আধুনিক কবিতার এ বৈশিষ্ট্যকে দৃঢ়মূলে ধারণ করেছে। তাঁর কবিতাগুলো মূলত: আত্মগত সংলাপ। অর্থাৎ বুকোওস্কির কবিতা পড়ে কবিতার মধ্যে বুকোওস্কিকেই প্রবলভাবে পাওয়া যায়। নগর কেন্দ্রিক মানুষের যন্ত্রনা, নৈরাশ্য এবং অবসাদগ্রস্ততা তিনি প্রতিস্থাপিত করতে চেয়েছেন ব্যক্তিগত পরিসরের স্বাধীনতা, ভোগস্পৃহা এবং খোলাখুলি উদ্দাম যৌনতা দিয়ে। যে জীবনকে তিনি অসঙ্গতি ও বৈপরীত্যের মধ্যেও উপভোগ করতে চেয়েছেন তার ক্রুর ও রূঢ় বাস্তবতাকে উৎপ্রেক্ষাবিহীন দৈনন্দিন শব্দায়োজনের মধ্য দিয়ে মোহাবিষ্টতায় রূপান্তরিত করেছেন। কবির জীবদ্দশায় যেমন তিনি একাডেমিক সার্কেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেননি কিংবা বিশ্বস্বীকৃত কোনো পুরস্কার বা সম্মাননায় তিনি ভূষিত হননি কিন্ত‍ু তার অমর অক্ষয় অবস্থান বিশ্বব্যাপী অগণিত পাঠক হৃদয়ে। মৃত্যুর পর বিশ্বকবিতায় ক্রমশ: উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে নাক্ষত্রিক দীপ্তি ছড়াচ্ছেন গণমানুষের কবি চার্লস বুকোওস্কি। তাঁর নামে সামাজিক গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত খোলা হচ্ছে নতুন নতুন ওয়েবপেইজ। প্রতিবছর প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর কবিতা ও লেখা নিয়ে শতসহস্র সংকলন। জিওফ্রে ম্যূর সম্পাদিত ‘দ্য পেঙ্গুইন বুক অব অ্যামেরিকান ভার্স’-এ যে সাতজন কবিকে আধুনিক মার্কিন কবিতায় সবচেয়ে প্রভাবশালী কাব্যনির্মাতা হিসেবে প্রচ্ছদপটে ঠাঁই দেয়া হয়েছে তাঁদের মধ্যে বুকোওস্কি অন্যতম। আধুনিকোত্তর, অধুনান্তিক কিংবা পোস্টমর্ডান কাব্যধারায় তাঁর অলঙ্ঘনীয় প্রভাব অস্বীকার করবার জো নেই। অথচ তিনি তাঁর লস এঞ্জেলেসের সমাধিস্থলের এপিটাফে লিখে গেছেন : ডোন্ট ট্রাই।
তথ্যসূত্র :
১| গুগল
২| দ্য পেঙ্গুইন বুক অব অ্যামেরিকান ভার্স,
‌ এডিটেড বাই , জিওফ্রে মুর,পেঙ্গুইন ,
‌‌ যুক্তরাজ্য ১৯৭৭, ১৯৮৩, ২০১১(রিভা.)
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।