ছোট বেলা থেকে শুনেছি আমার বাবার জন্ম ওপার বাংলা।
চোখের সামনে ‘পার’ শব্দটিতে ভেসে উঠত মায়ের শাড়ির পাড় আর নদীর তীর।
স্কুল থেকে ফিরেই ছুট্টে রান্না ঘরে উঁকি দিয়ে দেখতে পেতাম মায়ের শাড়ির একফালি পাড়।
কচুর শাক ইলিশ মাছের মাথা দিয়ে
কখনো বা লতি। মা কত যত্নে সে রান্না করছে , সময় নেয় রাঁধতে তবু তার স্বাদটি! আহা!
বাবা বাজার থেকে ইলিশ মাছ এনে বলত কালোজিরে কাঁচা লঙ্কা আর বেগুন দিয়ে
পাতলা ঝোল কোরো ….
পশ্চিম আর পূর্বের ভেদ তেমন মাথায় ঢুকতনা ছোটতে। তারপর ভূগোলের মানচিত্র আলাদা আলাদা করে বলল, এটা পূর্ব বাংলা এটি পশ্চিম বাংলা বা পশ্চিমবঙ্গ।
কথা বলি বাংলাতে ঝরঝরে। জন্মাবধি স্থানীয় ভাষা শুনছি, বেশ লাগে। মধুর সে ভাষাও। ‘স’ আর ‘শ’ উচ্চারণে যা একটু হেরফের।
এই বাড়ির কচুর শাক, ও বাড়িতে চলে যায় বাটি ভরে!
ও বাড়িতে রাঁধা বিশেষ সুক্তো এই বাড়ির খাওয়ার টেবিলে,প্রথম পাতে!
তবে এপার ওপার হলটা কি?
বন্ধু বান্ধব আড্ডা মারামারি খেলাধুলা ….সব এক!
মাঝে মাঝে মনে হত বাবার জন্ম যেখানে, জ্যেঠুরা পুজো পার্বণে এক জায়গায় হলে যে জায়গার গল্প করে, এই মস্ত পুকুর, গোলা ভরা ধান, ঢাকা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় , মস্ত মস্ত দালান বাড়ি…. এইসব দেখে আসি।
কত দূর আর হবে! ট্রেনে যেতে পারব?
না রে, আটকে দেবে তো। কত কি কাগজপত্র লাগে! এদেশের টাকা ও দেশে চলে না যে….বড়রা বলত।
তবে কি হবে!
আর গেলে কি আর আগের মত সব আছে? সব ভাঙাচোরা, মাটিতে মিশে গেছে। লুকিয়ে লুকিয়ে চলে এসেছিলাম তো, রাতের অন্ধকারে! কি দিন গেছে!দীর্ঘশ্বাস জ্যেঠুদের গলায়। বাবার স্মৃতিতে কিছুই প্রায় নেই , তার বয়স তখন চার কি সাড়ে চার।
বুঝতাম না। এই নিজের বাড়ি ঘর উঠোন, গোলা ভরা ধান, গরু বাছুর, জমি জায়গা ছেড়ে অজানা শহরে আসা থাকা খাওয়া,একটা চাকরির ব্যবস্থা করা কতটা কঠিন!এখন তা কল্পনা করাও যায় না।তবু ঘটেছে একথা সত্য।
শুধু ভাবি, সেই এক ভাষা, এক রবীন্দ্রনাথ, এক নজরুল, এক প্রাণ, এক অনুভব, গঙ্গার সাথে পদ্মার সখ্য…. তবে মাঝে কেন এই কাঁটাতার!কিসের মানচিত্র!
এখন অনেক বড়।ওপারে কত অদেখা বন্ধু,কত ভাই,দাদা, দিদি…..
এপারেও তাঁদের কত বন্ধু, ভাই, দাদা-দিদি!আলাদা কোথায়! সে শুধু খাতায়-কলমে, আনন্দ উৎসবে, ভাবনায় ভালোবাসায় কাঁটাতার কবেই উঠে গেছে!
চাইলেই যাওয়া যায়। ব্যবস্থাপনা আর সময় এইটুকুই ….তবু মাঝে মাঝে মনে হয় কেন পাখিজন্ম হল না আমার! এটুকুও লাগত না….আকাশ যে সেটুকুও মানে না!