ক্যাফে গল্পে লিপিকা ঘোষ

ঠাকুর দর্শন

হরিণগুলো আমার মতই, নাদুস-নুদুস! এই ডিয়ার পার্কটা আমার কী যে ভালো লেগেছে। এখানে বিশাল বড় জঙ্গল, কিন্তু বাঘের ভয় নেই। সবুজ জঙ্গলের মধ্যে সরু রাস্তা, দুধারে ছোটবড় গাছ, মা বললেন,- ‘বুক ভরে শ্বাস নিয়ে নে! এমন অক্সিজেন কলকাতা গেলে পাবি না।’ কমলিকা আন্টি গাছ দেখিয়ে বললেন- ‘এটা জার্মান তুলসী, কেটে গেলে এর আঠা আর্নিকার মলমের থেকেও ভালো কাজ দেয়, ছোটবেলায় লাগাতাম! আর ওটা তেলাকুচা, এর পাতা রান্না করে খেলে ব্লাডসুগার কমে যায়। অর্পিতা আন্টি বিরক্তির সুরে বললেন,
-‘তাহলে আর দেশে ওষুধ বিক্রি হত না! এইসব বেটে খেয়ে ভালো হয়ে যেত! সত্যি বাবা, তুমি বলোও ভালো’! যাগ্গে!
আসার সময় ড্রাইভার কাকু শান্তিনিকেতনের বেশ ক’টি জায়গা ঘুরে দেখালেন,- আশ্রম, তালধ্বজ, দেহলি। এখানে উনিই আমাদের গাইড। শান্তিনিকেতন বাড়িটাতে গিয়েই মুখস্ত বলতে লাগলেন-
“এই বাড়িটা 1863খ্রিঃএ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তৈরী করেন। প্রথমে একতলা, পরে দোতলা করেন। পাশে একটা পুকুরও করেন, অন্য জায়গা থেকে ভালো মাটি এনে বাগানও করেন।
এবার মা বললেন,- ‘রায়পুরের জমিদার ভুবন মোহন সিংহের সঙ্গে উনাদের খাতির ছিল যে! সেবার জমিদার ভুবন মোহন সিংহের বাড়ি যাবেন বলে দেবেন্দ্রনাথ পালকি করে এদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন, অসহ্য গরমে ফাঁকা এই ভুবন ডাঙা গ্রামের পাশে এই মাঠে ছাতিম গাছের ছায়াতে বিশ্রাম নিয়ে ছিলেন। এখানেই তিনি পেয়েছিলেন তাঁর প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি, বুঝিল? তাই পরে 1863 তে এখানকার কুড়ি বিঘে ফাঁকা মাঠ বছরে পাঁচ টাকা খাজনার বিনিময়ে মৌরসি পাট্টা করিয়ে নিয়েছিলেন।’ … সোনাই আমাকে কানে কানে বলল,- মোসাম্বির পাতা আবার কী গো?’
আমি ফিসফিস করে বললাম চুপ কর!, মোসাম্বি নয় মৌরসি!
-মানে?
-আমি জানি না, চুপচাপ শুনে যা, না হলে হোটেলে গিয়ে পিৎজা দেবে না, পিটানি দেবে। ‘ফোর’এ পড়িস কী করে কে জানে! কেমন পড়া শুনিস ইস্কুলে?
এদিকে ড্রাইভার কাকু যোগ করলেন -‘ঐ বছরেই 31শে মার্চ ষোল টাকার বিনিময়ে জমি হস্তান্তরের দলিল করিয়ে নিয়েছিলেন। উনি খুব ঈশ্বর ভক্ত ছিলেন! কলকাতার ভিড়ভাট্টা থেকে বেরিয়ে এই নির্জনে ঈশ্বরের উপাসনার জন্য আশ্রম করার কথা ভেবেছিলেন’।
-বাবা এসব শুনে যা রেগে যেতেন না! ভাগ্যিস আসেননি! বেড়াতে এসে লেকচার শুনে চটে যেতেন! এসব বন্ধ করে দিতেন। যাগ্গে!
আর ঐ তালধ্বজ! তালগাছের নিচে কী অদ্ভূত ঘর, মাথাফুঁড়ে গাছ বেরিয়ে গেছে!, তেজেশচন্দ্র সেন নাকি সেখানে থাকতেন। এখন কারুসংঘের মেয়েরা বাটিকের কাজ শেখে! উহ্ গাছটা দেখে গা পিত্তি জ্বলে গেল! এটা নিয়ে নাকি রবিঠাকুর ‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে…’লিখেছেন। মা ছোটবেলায় কত বড় কবিতাটা মুখস্থ করিয়েছিলেন, রবীন্দ্রজয়ন্তীতে স্টেজে উঠেছিলাম অবশ্য ‘মনজিনিস’ এর প্যাকেটের লোভে। শেষের ক’ লাইন ভুলে গিয়েছিলাম। যাগ্গে!
তারপর দেখেছি ‘দেহলি’। এখানে রবিঠাকুর আর উনার স্ত্রী থাকতেন। পরে রবিঠাকুরের স্ত্রীর নামে একটা স্কুল করা হয়েছে। নাম ‘মৃণালিনী আনন্দ পাঠশালা’। বাবা হলে থোড়াই মায়ের নামে বাড়ি করতেন-যা ঝগড়া হয় দুজনের!যাগ্গে!
মা বললেন, ‘শান্তি নিকেতন না এলে রবি ঠাকুরকে পুরোটা জানা যায় না’।
রাস্তা থেকে ড্রাইভার কাকু অমর্ত্য সেনের বাড়ি দেখিয়ে বললেন,-
‘এই দেখুন, উনি এখানে এসেছেন’।
মা বললেন,- ‘কী করে বুঝলে?
-‘ঐ যে তাবু ফেলা আছে! উনি এলে উঠোনে তাবু ফেলা থাকে। আমরা বুঝতে পারি’।
*******
ডিয়ারপার্ক থেকে আমরা যাব রবি ঠাকুরের বাড়ি দেখতে। ওখানে প্রদীপ মামা আছেন, আমাদের ঘুরিয়ে দেখাবেন। বাবা পাহাড় আর সাগর ছাড়া কোথাও বেড়াতে যান না। এই নিয়ে মায়ের সঙ্গে কী ঝামেলা! মা শান্তিনিকেতন আসবেনই, বাবা কিছুতেই আসবেন না। শেষে মা জেদ করে এসেছেন বান্ধবীদের সঙ্গে। মিন্টু আর সোনাই এসেছে, ওদের মায়ের সঙ্গে। ওদের বাবারাও আমার বাবার মত, আসেনি। আমাদের তিন ছেলে আর তিন মায়ের গ্রুপ এটা। যাগ্গে!
********
প্রদীপ মামার সঙ্গে আগে রবীন্দ্র মিউজিয়ামে গেলাম, যাতে হাত দিতে যাই, মামা বলেন- ‘হাত দিও না -আ -আ -আ’! তার ওপর আবার সবই নকল। ট্রেনের কামরা, পালকী, নৌকা। ভালো লাগে? বড়রা হাঁ করে সব দেখছে। আমি ছটফট করছি। এরকম সময় আমার পাবজি খেলতে ইচ্ছে করে। মাকে লুকিয়ে ডাউনলোড করে খেলি তো!। মিন্টু আর সোনাইও জানে ডাউনলোড করতে,… ঐ যে প্লে স্টোরে গিয়ে…থাক, বলব না, মা তখন বলবেন নিজে নষ্ট হচ্ছ, আবার অন্যদেরকেও নষ্ট করছ। যাগ্গে!
মিউজিয়ামের পাশে রথীন্দ্রনাথের দোতলা বাড়ি। এবাড়ির একতলার নাম “গুহাঘর”, আর দোতলার নাম “চিত্রভানু”। একতলা রথীন্দ্রনাথের ওয়ার্কশপ ছিল, মানে কাজের জায়গা। আর দোতলায় রথীন্দ্রনাথের স্ত্রী প্রতিমা দেবীর স্টুডিও ছিল, উনি ছবি আঁকতেন তো! এ বাড়ির গোল কাঠের জানলাটা জাপানি ধাঁচের, এমন ভাবে কাঁচ লাগানো, জানলার পশ্চিম পাশে তাকালে পম্পা লেককে আঁকা বাঁকা নদী মত দেখায়। নানা রকম ফুল আর মশলার গাছ লাগানো আছে এখানে। মায়ের মোবাইলটা নিয়ে ছবি তুলে নিয়েছি। এটার পর দেখলাম আরও পাঁচটি বাড়ি। বাপরে!… একটা লোকের এক জায়গায় এতগুলো বাড়ি? আমরা তো কলকাতায় ছোট ফ্ল্যাটে থাকি! বাবা তো ফ্ল্যাট বানায় আর বিক্রি করে দেয়!যাগ্গে!
একবারে শেষ প্রান্তে নিয়ে গেলেন মামা, ওখানেই পরপর চারটি বাড়ি-উদীচী, পুনশ্চ, শ্যামলী, কোণার্ক, আর একটু গেটের দিকে এলে বড় বাড়ি উদয়ন।
উদীচীর আগের নাম ছিল সেঁজুতি। আলো বাতাস যাতে বেশি বেশি করে ঢোকে সেভাবে এই বাড়িটা করা। দোতলায় একটাই ঘর, তার চারদিক খোলা।
পাশের বাড়িটার নাম পুনশ্চ। ছোট একতলা বাড়ি। এই বাড়িটা কী অদ্ভূত! দেয়ালগুলো মাটির আর ছাদ ছিল কংক্রিটের। এই ছাদ নাকি কোনও এক বর্ষায় ফেটে গিয়েছিল। এটাও বেশ খোলা মেলা বাড়ি।
এর পরে দেখলাম ‘শ্যামলী’। ‘গরুর নামে বাড়ি!’ -সোনাই হি হি করে হেসে উঠলো। এই বাড়িটা মাটির দেওয়াল আর ছাদ দিয়ে তৈরি। প্রদীপ মামা বললেন “যাতে করে সহজে আগুন না লাগে, আর গরমে ভিতরটা ঠান্ডা থাকে তার জন্যে এই মাটির দেওয়ালের ভিতরে ছোট ছোট কলসী বসানো হয়েছে। করেছেন সুরেন কর ও শিল্পী নন্দলাল বসু, ভাস্কর রামকিঙ্কর দেওয়ালে ছবি এঁকে দিয়েছেন। গান্ধীজি 1940 সালে এই বাড়িতে সস্ত্রীক এসেছিলেন’। …. তবে এটা ঠিক এমন বাড়ি বাবা কোনোদিনই বানাবেন না।
পাশের বাড়িটা কোণার্ক। আগে মাটির দেওয়াল আর খরের চাল ছিল। নাম ছিল ‘পর্ণ কুটির’। কবির বৌমা আগে এ বাড়িতেই থাকতেন। পরে অবশ্য পাকা বাড়ি হয়েছে। এর আর একটা নাম আছে ‘উত্তরায়ণ’। এই বাড়িটার ছাদে স্টেজ করা আছে। আগে নাকি নাটকও হত এখানে।
উদয়ন যাবার আগে রবি ঠাকুরের গাড়ি দেখলাম। কী বড় রাক্ষুসের মত কালো গাড়ি! ‘হাম্বার’ কম্পানির! আমার তো ল্যাম্বারগিনি’ বেশি পছন্দ। বড় হয়ে কিনব। যাগ্গে!
এর পর মামা উদয়নে নিয়ে এলেন। সামনে ঘেরা বারান্দায় বসার ব্যবস্থা করা, কিন্তু গেট আটকানো। মাঝখানে একটা চেয়ার, তাতে রবি ঠাকুরের ছবি দেওয়া। সেখানে সবাই ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রদীপ মামা দারোয়ানের কাছ থেকে চাবি চেয়ে আমাদের পাশের রাস্তা দিয়ে ঘুরপথে ভিতরে নিয়ে গেলেন। ঢুকতেই আমাদের তিনটেকে গম্ভীর গলায় বললেন, “কোনো জিনিসে হাত দেবে না”। তারপর শান্ত গলায় মাকে বললেন, “দেখ, ওরা যেন কোথাও হাত না লাগায়। এটা সংরক্ষিত এলাকা। তোমরা নিজের লোক বলে দেখাচ্ছি। এমনিতে দেখানোর নিয়ম নেই’।
এই বাড়িটা রথীন্দ্রনাথ বানিয়েছিলেন বাবার জন্য। 1919 সালে শুরু হয়, শেষ হয় 1928তে। এটার আগে নাকি নাম ছিল ‘রান্না বাড়ি’। শেষ দিন পর্যন্ত রবি ঠাকুর এই বাড়িতেই ছিলেন। অসুস্থ হলে তাঁকে এখান থেকে পালকি-চেয়ারে করে নামিয়ে রেলগাড়ির সেলুন কামড়া করে কলকাতা পাঠান হয়েছিল। এই সেলুন কামড়ার একটা মডেল মিউজিয়ামে রাখা আছে। মামা বললেন, ‘বাড়িটি অঙ্কোরভাট মন্দিরের আদলে তৈরি, বিশেষ করে থামগুলো। দরজায় মোঘল স্থাপত্য শিল্পের কারুকার্য করা হয়েছে। আবার একটা অংশে কোরিয়ান স্থাপত্য শিল্পের কারুকার্য করা হয়েছে। সুরেন্দ্রনাথ কর ও রথীন্দ্রনাথ বাড়িটির নক্সা তৈরি করেন। এ বাড়ির ইন্টিরিয়র ডিজাইনার ছিলেন কিমতারা কাশাহারা আর কিনো সান’।… কী নাম রে বাবা! সোনাই আর মিন্টু তো হেসেই পাগল! বলে চিকেনের কিমা, কিনে ফেলো, কিনে ফেলো! হা হা হা!… যাগ্গে!
একতলার ঘরে গিয়ে দেখি একটা পুরনো ফ্রিজ, কিছু চেয়ার টেবিল রাখা আছে। সোনাই তো বসতে যাচ্ছিল, কমলিকা আন্টি টেনে আনলেন। বসতে মানা! এই ফ্রিজটা রবি ঠাকুরের বৌমার, প্রতিমা দেবী ব্যবহার করতেন, এটা এখনও চলে। মামা সোজা সিঁড়ির কাছে এলেন। একে একে লাইন দিয়ে উঠতে হল। আগে প্রদীপ মামা পিছনে আমরা। সিঁড়ি শেষ করে প্রদীপ মামা দাঁড়ালেন, বললেন, “ঘরের চৌকাঠ ছুঁয়ে প্রণাম করো। এই ঘরেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থাকতেন। 1941খ্রিঃ এর 25শে জুলাই পর্যন্ত তিনি এই ঘরেই ছিলেন। তোমরা সেই ঘরে ঢুকছ। এখানে কারো আসার নিয়ম নেই। তুমি আমার প্রিয় ভাগ্নে, তাই এই ঘর দেখার সুযোগ পেলে। তোমাদের জন্য ওপর থেকে পারমিশন নিয়ে এসেছি। তোমরা, বাচ্চারা কোনো কথা বলবে না”। আমি দেখলাম সবাই চুপ করে গেছে। মাও গম্ভীর হয়ে গেছেন। মায়ের হাত ধরে রবি ঠাকুরের শোবার ঘরে ঢুকলাম। দেখি দেয়ালে শীতল পাটি টাঙানো। বিশাল বড় বেডরুম, তার মাঝখানে একটা খাট। খাটটা বেশ সুন্দর! সাদা ধবধবে বিছানার চাদর পাতা। দুটো বালিশ রাখা। মামা খাট দেখিয়ে বললেন “উনি হেলান দিয়ে বসতেন এই খানে”। …বাকি সবাই যেন বোবা হয়ে গেছে। আমার তো বিছানায় শুতে ইচ্ছা হচ্ছিল কিন্তু উপায় নেই। সোনাই আর মিন্টুও মিইয়ে গেছে দেখলাম! কথা বলছে না।
অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর মা বললেন, “মনে হচ্ছে স্বর্গে এসে গেছি! ঈশ্বরের ঘরে এসেছি।” …আমার অবশ্য এসব মনে হয়নি। যাগ্গে!
এ ঘরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বড় বড় জানালা আর খোলা জায়গা, যাতে আলো-বাতাস ভালো করে আসে। বেডরুম সোজা উত্তর দিকে ঘেরা ছাদ আছে। বেডরুমের উত্তর পশ্চিমে একটা দরজা আছে। মামা ঐদিকে যেতে বললেন, ঐ দিকে বাথরুম আছে। বাথরুম শুনে অর্পিতা আন্টি বললেন, ‘থাক, থাক, বাথরুম দেখে আর কাজ নেই’। অর্পিতা আন্টি শান্তি নিকেতনে একটাই সাধ নিয়ে এসেছেন, সেটা হল সানগ্লাস পরে চুল খুলে ছবি তোলা। আর আমাকে পেয়েছেন তারঁ ‘ক্যামেরা ম্যান’। মোবাইল ধরিয়ে দিয়ে বলবে নে পটলা ছবি তোল!যাগ্গে!
বাথরুম দেখতে গিয়ে দেখি মামা এক বিশাল বড় ঘরে ঢুকছেন। এটাচ্ বাথরুম! আমি ফাইভের বই এ পড়েছি জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে তিন তলার দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঘরে নাকি ট্যাপকল ছিল। ছোটদের সে ঘরে যাওয়া নিষেধ ছিল। তা যদি হয় তবে এ আর আশ্চর্য কী? বিশাল ঘরটিতে বাথরুম খুঁজে পেলাম না। মামা বললেন, ‘এটা সাজঘর। বাথরুম থেকে স্নান করে বেরিয়ে এখানে জামা কাপড় চেঞ্জ করে সেজে গুজে তবে পাশের ঘরে যেতেন’। সামনের দেয়ালে বিশাল বড় আয়না। তার মাঝখানে কায়দা করা। ঘোরালেই আয়না ঝুঁকে পড়ে, আবার সোজাও হয়। নাটকের সাজঘর হয় জানি, তা বলে কবিদেরও সাজঘর? মা বললেন, রাজার নাতি বলে কথা, এটুকু বিলাসিতার ছোঁয়া তো থাকবেই। আমরা সাধারণ মানুষ কটা রাজ- রাজাদের ঘরেই বা ঢুকেছি যে জানবো। সব রাজাদেরই হয়ত বেডরুমের পাশে সাজঘর থাকত! কলকাতায় এটাচ্ বাথরুম ফ্ল্যাট সবাই বানায়। কিন্তু এই সাজঘরের আইডিয়া কারো নেই। যাগ্গে!
এই সাজঘরে ঢুকে বাঁ হাতে বাথরুম। আরেব্বাস, দেখি সিমেন্টের বাঁধাই করা বাথটাব। উনার ছেলে নাকি বানিয়ে দিয়েছিলেন।
‘উনি শুয়ে শুয়ে চান করতেন?’… মিন্টু বলে ফেলল।
-চুপ,…হাত দিয়ে মুখটা ওর চেপে ধরলাম।
মা কত বলেছিল বাবাকে, আমাদের বড় বাথরুমে বাথটাব বসাতে, বাবা শুনলোই না। মা বলেন, “ঘরামির মটকা ফাঁক”!
ঐ সাজঘরের ডানদিকে রবি ঠাকুরের পটির ঘর। শুনেই “ইসসসস” করে উঠলেন অর্পিতা আন্টি। মামা তো জোর করে দেখাবেন! সবাই মিলে যাওয়া হল। আমরা ছোট তিন জন সামনে এগিয়ে গেলাম। পটিতে আবার ঘেন্না কি! আমার তো ক’ বছর আগে পর্যন্ত সব চেয়ে প্রিয় জায়গা ছিল পটি। সারা দিন ওখানে থাকতাম । মা পড়তে বললে তো কথাই নেই! ঘন্টার পর ঘন্টা পটিতে বসে কাটিয়ে দিতাম। একটু পটি হত কি হত না, আরো হবে বলে বেলা পার করে দিতাম। পড়তে হত না! যাগ্গে!
গিয়ে দেখি সেটা কোমট পটি। আরিব্বাস তখনও কোমট পটি ছিল? আমরা ছোট তিনজন হামলে পড়েছি পটির সামনে। পরিস্কার পটি। প্রদীপ মামা বললেন, “পটির সিটটা রবি ঠাকুরের ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর মেহগনি কাঠ দিয়ে বাঁধাই করে দিয়ছিলেন, ঐ দেখ”। মা বললেন, “কেন?” মামা বললেন, “শীতের সময় বসলে ঠান্ডা লাগত তাই জন্য”। ঠিক কথা বলেছেন মামা, আমারও শীতের সময় পাটিতে বসলে ঠান্ডা লাগে। বাবাকে বললে দেবে নাকি বাঁধিয়ে? মেহগনি কাঠ কেন প্লাই উড দিয়েও দেবে না! যাগ্গে!
পটি দেখে আবার সাজঘরে ভিতর দিয়ে এসে শোয়ার ঘরটাকে প্রণাম করে চলে এলাম। কিন্তু ঘোর যেন কাটতেই চায়না। হোটেলে এসে, ট্রেনে উঠে একটাই ছবি চোখে ভাসছে। রবি ঠাকুরের পটি। এত কিছুর মধ্যে একটা জিনিস অজান্তেই আমার মন জুড়ে বসেছে, পটির সিটটা কাঠ দিয়ে বাঁধানো। রথীন্দ্রনাথ ছেলে হয়ে বাবার মত যত্ন করতেন রবিঠাকুরের। অনেক বাবাও ছেলের জন্য এত করে ভাবে না!
ট্রেনে বসে হঠাৎ ঘোর কাটল মিন্টুর কথা শুনে-“পটলাদা, রবি ঠাকুরের কি হাইপেসার ছিল? খুব গরম লাগত? ওত আলো বাতাস খুঁজত কেনো?” মিন্টু সবার থেকে ছোট টু এ পড়ে, ওর কথা শুনে সবাই হেসে ফেলল। তারপর তিন জনে মিলে সারা রাস্তা শুধু পটির কথাই আলোচনা করে গেলাম। সোনাই বলল, “যাই বলো, তোমার প্রদীপ মামা না থাকলে কোনও দিন রবি ঠাকুরের পটিটা দেখা হত না আমাদের।
…হাওড়ার ট্রেন এসে থামল, বাবা আমাদের নিতে এসেছেন। বাবাকে দেখে উত্তেজিত হয়ে বলে ফেললাম, “বাবা, আমরা রবি ঠাকুরের পটি দেখেছি”। শুনে ট্রেনের সবাই তো হো হো করে হেসে উঠলো। যাগ্গে!
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।