মার্গে অনন্য সম্মান খুশি সরকার (সর্বোত্তম)

অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার

সাপ্তাহিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ৫৮
বিষয় – বাইশে শ্রাবণ / প্রকৃত স্বাধীনতা / শ্রাবণ ধারা

সবুজের স্বাধীনতার স্বাদ

ঈশানির মনে আজ দারুণ আনন্দ। রোদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পদ্ম ফুলের মত পাঁপড়ি মেলছে তার মন। আজ অতি ভোরেই ঘুম ভেঙে গেছে তার। ঘরের মেঝেতে পায়চারি করতে করতে তাকাচ্ছে বারবার দরজার দিকে। মনে মনে ভাবছে, কিরে এত বেলা হয়ে গেল, এখনো মালতি আসছে না কেন?– মুখে বিরক্তির ছাপ। অস্ফুটে বলে,”ইস্ কতদিন পর ছেলেটার একটা গতি হবে। আজকাল তো ওর মুখের দিকে তাকানোই যায় না। মন-মরা মুখটা নিয়ে বাইরে বেরোনো প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল। এবার বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে” একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ঈশানি। হঠাৎ ডোরবেল বেজে ওঠে। “এতক্ষণে আসার সময় হলো মালতির? দাঁড়া তোকে দিচ্ছি” ভাবতে ভাবতে গিয়ে দরজা খোলে। ভেতরে ঢুকতেই মালতি শশব্যস্ত হয়ে বলে, বৌদি একটু দেরী হয়ে গেল গো।রাগ করো না। আমি ঠিক সময়মতো সব করে দিবো। “সময়মতো করে দিবো”কথাটা ব্যঙ্গ করে বলে ঈশানি। কাল তোকে পই পই করে বলেছিলাম,”আমার ছেলের কাল চাকরির ফল বেরুবে। ওকে তাড়াতাড়ি ভাত দেবো। ওর বাবা হয়তো কাল ছেলের চাকরির আনন্দে অফিস নাও যেতে পারে কিন্তু আমার সবুজ! কতদিন পরে ছেলেটার মুখে হাসি দেখবো? “কেন,কী আছে গো বৌদি? কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে জিজ্ঞেস করে মালতি। “কেন, তুই বুঝি জানিস না? এত বছর ধরে কাজ করছিস, ছেলেটাকে দেখে কিছুই বুঝতে পারিস না ? ঈশানি রাগান্বিত স্বরে এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে মালতিকে। “না না জানি তো। বড় কষ্ট ওর। সে-ই কবে থেকে চাকরির চেষ্টা করে যাচ্ছে? এত ভালো ছেলে তোমার! এত ভালো রেজাল্ট! সত্যি গো ভীষণ খারাপ লাগে। অত চিন্তা করো না গো বৌদি, এবার ঠিক হয়ে যাবে দেখো। বলেই দু’পা এগোতেই আবার পিছিয়ে এসে বলে মালতি, ও-ও, একটা কথা তোমাকে তো বলাই হলো না গো, কেন আমার দেরি হলো জানো, আজ এই খুব সকালে শুয়ে আছি হঠাৎ কান্নার চিৎকার শুনে বুকটা ধড়াস করে উঠল। বিছানা ছেড়ে দৌড়ে বাইরে এসে দেখি পাশের বাড়ির মেয়েটা কালকে পড়তে গিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত বাড়ি ফেরেনি। ওর দাদা বাবা সবাই খুব খোঁজাখুঁজি করেছিল অনেক রাত পর্যন্ত,তারপর তো আর জানি না। সকালে কে যেন এসে খবর দিয়েছে যে, পাশের জঙ্গলভরা পুকুরপাড়ে নাকি মেয়েটা পড়ে আছে! জামাকাপড় সব ছেঁড়া। ওর মা কেঁদে গড়াগড়ি যাচ্ছে গো। ওই দৃশ্য দেখা যায় না গো বৌদি। এইজন্য তো দেরি হয়ে গেল বৌদি।ওই কান্না দেখে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। আমারও তো মেয়ে আছে। আমরা গরীব মানুষ। ক্যামনে বাঁচাবো মেয়েকে? কথাগুলো বলতে বলতে মালতির গলা ধরে আসে। “সত্যিই অসহায় অবস্থা! এই সমাজে প্রকৃত মানুষের বড় অভাব রে মালতি, চারদিকেই শুধু ভয়। মেয়েদের স্বাধীন মতো চলাফেরা করার দিনটাই যেন ফুরিয়ে গেল, বিষন্ন স্বরে বলে ঈশানি। পরক্ষণেই উচ্ছসিত হয়ে বলে, এই দেখ না, আমার ছেলের দিকে, আমাদের একমাত্র ছেলে আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ওকে এম,এ,বি,এড করিয়েছি। অ-ও আমাদের অবস্থা বুঝে মন দিয়ে পড়াশোনা করে কত ভালো রেজাল্ট করেছে, বল্? শুধু কি ভালো রেজাল্ট, কত নম্র-ভদ্র, দেখছিস তো কবে থেকে। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এত চেষ্টা সত্ত্বেও চাকরি হচ্ছে না অথচ ওর বন্ধু দীপক পড়াশুনায় তেমন ভালোও না ,শুনেছি নাকি চাকরির পরীক্ষাটাও ভালো দেয়নি অথচ চাকরি পেয়ে গেল শুধু টাকার জোরে আর আমার ছেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে মুখ কালো করে, কেমন লাগে বল্ তো কিন্তু এবার ওর চাকরিটা হবেই, কেউ আটকাতে পারবে না দেখিস। খুব ভালো পরীক্ষা দিয়েছে জানিস। খুব আশা করে আছে ছেলেটা। আমরাও দুটি প্রাণী তো ওর মুখের দিকে চেয়েই আছি,বল্? “হ্যাঁ গো বৌদি” রান্না করতে করতেই মালতি ঈশানির কথাকে সমর্থন করে। তারপরেই আবার জিজ্ঞেস করে, বৌদি, দাদাবাবুকে দেখছি না? “আরে ও তো উদ্বিগ্ন হয়ে কোথায় যেন বাইরে বেরিয়ে গেছে” ঈশানী মালতির কথার উত্তর দেয়। “হবে, হবে” দাদাবাবুকে অত চিন্তা করতে নিষেধ করো। বয়স হয়েছে তো। আজকাল যা ব্যামো হয়েছে গো, ভেজা হাত মুছতে মুছতে মালতি বলে, বৌদি আমার রান্না হয়ে গেছে, আমি তাহলে আসি? আবার ঐ মেয়েটাকে আনলে একটু দেখতে যাবো গো। তা কিছু শুনতে পেয়েছিস, মালতি?– জিজ্ঞেস করে ঈশানি।
ঐতো ভিড়ের মধ্যে লোকজন বলাবলি করছিল ওই যে পাশের গ্রামে কি নাম যেন, এক নেতা আছে না, তার ছেলেই নাকি দলবল নিয়ে কতদিন ধরে মেয়েটা কে জ্বালাতন করতো। মেয়েটার বাবা গ্রাম প্রধানকে বলেও ছিলো কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি। আর আজ মেয়েটাকে ওরা শেষ‌ই করে দিল। আজকাল যার টাকা আছে আইন তার‌ই হাতে। আমাদের গরিবের কোনো বিচার নেই গো বৌদি, কোনো বিচার নেই। তাছাড়া মানুষ এখন নিজেকে বাঁচাতেই ব্যস্ত। ওই তো সেদিন শুনলাম, রাস্তার মোড় এর উপরে কসমেটিকসের দোকানের লোকটাকে রাত নটার সময় কয়েকজন দুষ্কৃতী এসে গুলি করে চলে গেল তখনো আশেপাশের বাড়িগুলোতে লোকজন সবাই জেগেই ছিল। রাস্তাতেও লোক চলাচল করছিল অথচ কেউ আসেনি। বরং গুলির আওয়াজ পেয়ে সবাই দরজা বন্ধ করে ঘরে ছিল, প্রাণের ভয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। কয়েকজন ওই লোকগুলোকে দেখেছিল পালাতে কিন্তু পুলিশের কাছে কেউ মুখ খুলেনি। আর বলবেই বা কেমন করে বলো যা অবস্থা! জানতে পারলে তো ওকেই শেষ করে দিবে।
এই আতঙ্ক নিয়েই আমাদের বাঁচতে হবে। যা আছে কপালে, হবে। একটু থমকে মালতি আবার বলে বৌদি, কাল কিন্তু একটু দেরিতে আসবো।ওই স্বাধীনতা দিবস না কি যেন আছে, দাদার তো অফিস নেই। ঠিক আছে?
মাথা নেড়ে ঈশানি বলে, ঠিক আছে। কিছুক্ষণ পরেই “মা আসছি” সবুজ মাকে ডেকে বলে। হতচকিত হয়ে ঈশানি বলে, কোথায় যাচ্ছিস? একটু খেয়ে যা বাবা। “না, না, আজ আর খেতে ইচ্ছে করছে না মা, এসে খাবো বলেই বেরিয়ে যায় সবুজ। ঈশানির মন কেমন যেন ভয়ে দুরু দুরু করতে থাকে। সবুজ বেরিয়ে যেতেই দীনেশবাবু বাড়িতে ঢুকেই বলে, সবুজ কি রেজাল্টের খোঁজখবর নিতে গেল? “হ্যাঁ আমার তো তাই মনে হলো, কিছু বলেনি তবে জানো, কিছু মুখে দিল না ছেলেটা। বড্ড চিন্তায় আছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে দীনেশবাবু বলে, কি আর হবে,এখন তো নিম্নবিত্ত শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদের চাকরি নেই। “টাকা যার মুলুক তার” দেখো কি হয়!
ঘন্টা দুয়েক পরে সবুজ বিবর্ণ পাতার মতো উঠোনে পা রাখে। ঈশানি হাঁটা দেখে হতভম্ব হয়ে যায় কি বলবে বুঝে উঠতে পারেনা তবুও সামনে গিয়ে বলে কিরে আসলি? লিস্টে নাম আছে তো? ধপ করে বসে পড়ে বারান্দায় সবুজ। পেন্ডুলামের মত মাথা নাড়ে দুই হাতের তালু দিয়ে মুখ ঢেকে বসে থাকে। ছেলের মনের অবস্থা বুঝতে পেরে ঈশানির বড় কষ্ট হয় কিন্তু ব্যথা উপশমের কোনো মলমের নাম তার জানা নেই। ছেলের এহেন অবস্থায় মায়ের হাহাকার ছাড়া আর কিই বা করার আছে! স্নেহ স্বরে ছেলেকে বলে ঈশানি, বাবা চিন্তা করিস না, তোর মত অনেকেরই তো একই অবস্থা। আবার চেষ্টা করবি। একদিন ঠিক চাকরিটা তোর হবেই। এবার একটু খেয়ে নে তো বাবা। হাত ধরে টানতেই সবুজের মুখটা দেখে আঁতকে উঠে ঈশানি। এ কী অবস্থা! এতো মুখ নয়, যেন রক্তগোলাপ। দলা দলা রক্ত যেন চেরি ফলের মত শক্ত হয়ে ফুলে উঠেছে। মুহূর্তে ভয় পেয়ে যায় ঈশানি। এক লাফে দাড়িয়ে পরে সবুজ,না,আর নয়, এবার পরীক্ষা— বিড়বিড় করতে করতে সবুজ মায়ের হাত সরিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে ঈশানি। ঈশানির আওয়াজ পেয়ে দীনেশবাবু ঘর থেকেই চিৎকার করে বলে, সবুজ এলো? কি খবর? কোনো উত্তর নেই ঈশানির মুখে। সবুজ সোজা চলে যায় তাদের ‘জাগরণী’ ক্লাবে। সেখানে গুটিকয়েক ছেলে আগামীকাল স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ওরা সবুজকে দেখেই জিজ্ঞেস করে, কি রে খবর কী? লিস্টেড হয়েছিস? “না রে” সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েই সবুজ কাকে যেন ফোন করে। কিছুক্ষণ পর বেশ কয়েকজন ছেলে ক্লাবে আসে। তাদের দিকে তাকিয়ে বলে, একটা বিশেষ উদ্দেশ্যে তোদের ডাকলাম। আয় সবাই বসি। সবাইকে সামনে বসিয়ে সবুজ বলে দেখ, এইভাবে কি দিনের পর দিন আমরা খেলার পুতুল হয়ে জীবন যাপন করবো? নাকি আমাদের নিজেদের অধিকার আমরা ছিনিয়ে নেবো, বল? কাল স্বাধীনতা দিবস। এইদিন একটা শুভ দিন। এই দিনে আমরা সবাই শপথ নেবো।কাল সকালে সবাই এখানে চলে আসবি কিন্তু। যথারীতি পরদিন সাড়ে সাতটায় পতাকা উত্তোলন হয়। পাড়ার কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। সবুজ ক্লাবের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখে।বক্তব্যে দৃঢ়তার সঙ্গে বলে,—-
যে স্বাধীনতার জন্য হাজার হাজার নিরীহ বাঙালি অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। ব্রিটিশ শক্তির কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়েছেন। সেই স্বাধীনতা আজ কোথায় ?তার বিবর্ণ পাণ্ডুর মুখ দেখে মন বিষাদে ভরে যায়। আজ আমরা প্রতীজ্ঞা করছি তাঁর চোখের জল মুছিয়ে তাকে আবার নতুন করে ফিরিয়ে আনবো, আনবোই। আজ যে স্বাধীনতা ভোগ করছি এটা কি প্রকৃত স্বাধীনতা? যেখানে নিজের মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই, যেখানে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকুরী পাবার সুযোগ নেই, যেখানে মা-বোনদের নিরাপত্তা নেই, দিনের-পর-দিন মুখোশধারী দালালরা আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে, নিজেদের স্বার্থে নিজেদের সুযোগ-সুবিধা মুনাফা লাভের জন্য সমাজের সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে তুলেছে আমরা তাদের মুখোশ টেনে খুলে ফেলবো। আমরাই পারি আবার সেই প্রকৃত স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে যে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন আমাদের নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, যে শ্রেণীভেদহীন সাম্য ভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ, যে মানবিকতার মূল সুর বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সমস্ত রচনায়, আমরা সেই মানবিক সমাজ ফিরিয়ে আনবো যেখানে স্বাধীনভাবে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, যেখানে যোগ্যতার ভিত্তিতে হবে চাকরি, বেকারত্ব ঘুচবে, অশিক্ষা, অন্যায় অবিচার অসত্য থেকে মুক্তি পেয়ে মানুষ একতার বন্ধনে আবদ্ধ হবে, সাম্য, মৈত্রী এবং সৌভ্রাতৃত্বের মানব বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পরম আন্তরিকতায় মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়াবে— সেই সমাজ‌ই আমাদের কাঙ্খিত। আজ পঁচাত্তরতম স্বাধীনতা দিবসে আমরা পুনর্মূল্যায়নের শপথ গ্রহণ করছি। সবুজের বক্তব্যকে সবাই উৎসাহ উদ্দীপনায় প্রচণ্ড জোরে হাততালি দিয়ে সমর্থন করে।বাহবা দেয়।
এদিকে ঈশানি ও দীনেশবাবু তো সবুজের চিন্তায় দিশাহারা। একসময় ঈশানির মনে হয় ছেলেটা হতাশায় পাগল-টাগল হয়ে যাবে না তো! ভাবতে ভাবতেই বিকেলে অত্যন্ত কালো মুখ নিয়ে সবুজকে বাড়িতে ঢুকতে দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হয়।
পরের দিন আবার তাদের সঙ্গে সারাদিন নিয়ে আলোচনায় বসে সবুজ। বারবার করে ওদের জিজ্ঞেস করে, তোরা আমার সাথে আছিস তো? তবে ভেবে দেখ, যে রাস্তায় আমরা যেতে শপথ নিয়েছি, সেই রাস্তা কিন্তু ঝোপেঝাড়ে কাঁটায় ভরা। তাতে ঝুঁকি আছে। সে ঝুঁকি নিতে তোদের ভয় নেই তো?
“না না আমাদের কোন ভয় নেই”— মাথা নেড়ে সম্মতি জানায় ওরা। একটু পরেই সবুজ আবেগাপ্লুত হয়ে বলে, ক্ষুদিরাম বসু যদি মাত্র 19 বছর বয়সে দেশের জন্য অকাতরে ফাঁসিতে ঝুলতে পারে তাহলে আমরা কেন পারি না? আমরা তো নেতাজির উত্তরসূরী। আমরা গান্ধীজীর অমর বাণী “করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে”জানি তাই যদি বাঁচতে হয় তাহলে প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ নিয়েই বাঁচবো তবুও আর এভাবে রোজ রোজ নিজেদের অপমান করে বাঁচাবো না। নিজেদের অধিকার ছিনিয়ে নিতে যদি মরতে হয় তাও ভালো। তবে শোন আমাদের সমাজ আজ বড্ড কলুষিত। সমাজের এই দুষ্ট ক্ষতগুলোকে আগে সারতে হবে তবে এক এক করে আমরা পদক্ষেপ নেবো, কেমন? শোন তোরা সবাই নিশ্চয় জানিস, এই দুদিন আগে আমাদের পাড়ার ওই সহদেব কাকুর নিরীহ মেয়েটাকে মরতে হলো কিছু ক্ষমতায় থাকা কামান্ধ মানুষের হাতে। তাদের মুখোশটা খুলে দেওয়া দরকার। আমরা আগামীকাল এই বিষয় নিয়ে থানায় যাবো। পুলিশ যদি এ বিষয়ে ছেলেটাকে গ্রেপ্তার করে তো ভালো আর যদি না করে তাহলে আমরাই তার ব্যবস্থা করবো, বুঝেছিস বিষয়টা? সবার দিকে তাকিয়ে সবুজ খুব দৃঢ় কন্ঠে তার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়।
কয়েকদিন পর সবুজ বুঝতে পারে নেতার ছেলে বলে কেসটাকে ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। এবার বন্ধুদের নিয়ে সে পরিকল্পনা করে নিজেরাই সেই ছেলেকে শায়েস্তা করবে। পরের দিন মালতি কাজে যেতে দেখে হঠাৎ দুই পক্ষে প্রচণ্ড মারপিট হচ্ছে। ভয়ে এক ঝলক দেখেই সে চলে যায় দীনেশ বাবুরবাড়ি কাজে।গিয়েই হাঁপাতে হাঁপাতে বলে বৌদি গো, কি মারপিট হচ্ছে? “কোথায়” জিজ্ঞেস করে ঈশানি।”আরে ওই যে রাস্তায়” কিন্তু জানো, সবুজকে দেখলাম মনে হয়, আমি তো ভয়ে পালিয়ে এসেছি। সবুজ তো ঘরেই ছিল, কখন গেল?—আতঙ্কে আঁৎকে উঠে ঈশানি। দৌড়ে রাস্তায় যেতেই দীনেশবাবু ও ঈশানি দেখে দু’জন পুলিশ সবুজ ও আরো কয়েকজন ছেলেকে গাড়িতে তুলছে। ছেলের এমন দশা দেখে ঈশানি কান্নায় ভেঙে পড়ে। দীনেশ বাবুও বসে পড়ে রাস্তায়। মালতি শেষে দুইজনকেই তুলে এনে বাড়িতে যত্ন করে সান্ত্বনা দেয় কিন্তু দু’জনের কারো চোখেই ঘুম আসেনি সে রাতে।
সবুজ জেলে রাত্রে বসে থাকে দৃঢ় উদাস চোখে। মনে মনে ভাবে আজ সে বন্দী হলেও মুক্ত হবেই একদিন। সেদিনও তার লড়াই চলবে। লড়াই করেই পাবে তার প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ। দীর্ঘ ধ্বস্তাধ্বস্তি আর পুলিশের জেরায় ক্লান্ত সবুজের চোখে এক সময় নেমে আসে তন্দ্রা।তন্দ্রালু চোখে সে স্বপ্ন দেখে, তার দেশে সত্যি প্রকৃত স্বাধীনতা ফিরে এসেছে। আত্ম বলিদান এর বিনিময়ে যে স্বাধীনতা পেয়েছিল ভারতবাসী, সেই স্বাধীনতা আজ তার চোখের সামনে। মানুষ সুবিচার পাচ্ছে, নিজের মতো জীবন যাপন করতে পারছে, পারছে মত প্রকাশ করতে, বেকারত্ব নেই, চাকরির অভাবনীয় সুযোগ। সবাই আছে পরম সুখে। অপরূপা ভারতমাতা যেন হেসে হেসে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে তার মাথায়। হঠাৎ তালা খোলার শব্দে তন্দ্রা ছুটে যায় তার। চোখ খুলে দেখে সকাল হয়ে গেছে। চারিদিকে পাখিদের গান আর মানুষের কোলাহল যেন ভরে দিচ্ছে পৃথিবী। “চলো”গেটম্যানের কথায় সচকিত হয়ে বাইরে আসতেই দেখে সবুজ, চারদিক আলোয় ঝলমল করছে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।