পাক্ষিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ২২
বিষয় – নারী স্বাধীনতা
স্বাধীনতার স্বাদ
শিলার আর খুশি ধরে না। কলেজে প্রথম দিন আজ তার। কলেজে পড়ার স্বপ্নটা বহুদিন ধরেই খুঁটি গেড়ে বসে ছিল মনে। কলেজ সম্পর্কে বহু কথা শুনেছে তার মাসতুতো বোন রণিতার কাছে। রনিতা গতবছর কলেজের পাঠ চুকিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসে, এখন সে রীতিমত গৃহবধূ। কিন্তু তার বড় শখ ছিল চাকরি করে তবেই বিয়ে করবে। শেষ অবধি তার শখ মেটে নি। বাবা-মা’র চাপে বিয়েটা করতে বাধ্য হয়েছে। তাই অপূর্ণ সেই স্বপ্নটা মাঝে মাঝেই তার বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে। রণিতার সঙ্গে শিলার খুব ভাব।বোনের থেকেও বন্ধু এখন বেশি তারা। কলেজের সম্পর্কে শিলা রণিতার কাছেই অনেক কিছু শুনেছি তবুও কৌতূহল মিটে না। আগে তো প্রায়ই যেত শিলা রনিতাদের বাড়ি। বিয়ে হওয়ার পর আজই প্রথম দেখা রণিতার সঙ্গে শিলার নবান্ন উৎসবে। রণিতাদের বাড়ি নবান্ন খুব ধূমধাম করে হয়। পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন মিলেমিশে একাকার হয়ে খুব আনন্দ হয় এই নবান্নে। শিলা তো ভীষণ খুশি রণিতাকে পেয়ে। হেসে জিজ্ঞেস করে, তুই এসেছিস? জামাইবাবু আসে নি ?
— হ্যাঁ, এসেছে তো। ভালো আছিস?
— হ্যাঁ, খুব ভালো আছি। দারুণ মজা হবে বল্?
— তা তোকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কি ব্যাপার! প্রেমে পড়লি না কি রে?
–আরে না, না। জানিস আমি এবার কলেজে ভর্তি হয়েছি।
–ও,তাই? খুব ভালো করেছিস। তবে শোন,চাকরি বাকরি করে তবেই বিয়ে করবি কেমন। মেয়েদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকলে কিন্তু মুক্তি নেই।
— কেন রে এমন কথা বলছিস?
— শোন, যতই ভালো চাকরিওয়ালা বর হোক, তবু তো তোকে যে কোনো কারণে ওর কাছে হাত পাততে হবে, তাই না? শুধু কি তাই? কত বিধিনিষেধের বেড়া, কত খোঁটাখুঁটি। তুই যদি নিজে চাকরি করিস এই সব নিয়মকানুন থেকে রক্ষা পাবি, নিজের মতো বাঁচতে পারবি। তখন দেখবি সবাই তোর কথার দাম দেবে, না হলে তোর ইচ্ছা গুলো সব অকালে অশান্তির মরুভূমিতে শুকিয়ে মরে যাবে। তাই বলছি আমার মত কোনো চাপেই বিয়ে করবি না, যতক্ষণ না নিজের পায়ে দাঁড়াস।
–হ্যাঁ রে আমারও তো তা-ই ইচ্ছে। দেখি কতদূর কি করতে পারি।
–অবশ্য কলেজে গেলেই বুঝতে পারবি। মেয়েদেরও অনেক কিছু করার আছে, দেখিস কত মেয়ে পড়াশোনা করে আবার পার্টিও করে। তবে নিজেকে ঠিক রেখে—–
— যা বলেছিস! আমার না ভীষণ ইচ্ছে নিজেকে তুলে ধরার সবার সামনে।
— অবশ্যই। মেয়েরাও সব পারে, এটা বুঝিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। আমি তো পারলাম না, তুই দেখ পারিস কি না—–
— ঠি-ক আছে। আজ তবে চলি।
যথারীতি শিলাদের ক্লাস শুরু হয়। রণিতার কাছে শোনা গল্প গুলো যেন বাস্তবে দেখতে পায় কলেজে শিলা। কলেজের বিশাল ক্যাম্পাসের মধ্যে কত ধরনের ছেলে-মেয়ে! সবাই নিজেদের মত বন্ধু বান্ধব মিলে ক্লাসে যাচ্ছে, পার্টি করছে,কেউ কেউ আবার দলবেঁধে বসে গল্প করছে। এসব দেখে আনন্দে মনটা ভরে যায় শিলার। মনে মনে ভাবে সত্যি, কলেজে না এলে বুঝতেই পারতো না জীবনটা শুধু বাড়ির নানা নিয়ম-কানুনের মধ্যে আটকে থাকার জন্য নয়, কতকিছু আছে জানার বোঝার শেখার। বিশেষ করে মেয়েদের সমান অধিকার থাকা সত্ত্বেও কিভাবে আজও তারা নির্যাতিত অবহেলিত উপেক্ষিত জীবন যাপন করে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, ও কিছুতেই বিয়ে নামক অদ্ভুত জিনিসটার ছায়া মারাবে না বাবা-মা’র কথামত। যখন পাখি খাঁচা থেকে বের হয়ে ডানা মেলার সুযোগ একবার পেয়েছে তখন মুক্ত আকাশের স্বাদ সে নেবেই।
প্রতিদিন কলেজে যায় শিলা। একদিন পার্টিতেও নাম লেখায়। কলেজের জি.এস এর সঙ্গে সখ্যতাও হয়েছে আজকাল। দেখতেও বেশ সুন্দরী। নিজের সম্পর্কে সচেতন বেশ ভালো। তাই বন্ধুবান্ধবও পাত্তা দেয় একটু বেশি করেই। ক্রমশ জড়িয়ে পড়ে রাজনীতির সঙ্গে। কলেজে ভোট এগিয়ে আসছে। দিনের-পর-দিন শিলা বাড়ি ফেরে দেরী করে। মা রমা প্রত্যেকদিন দেরি করে ফেরা ভালো চোখে দেখছে না। একদিন জিজ্ঞেস করে, কিরে আজকাল দেখি তোর কলেজ থেকে ফিরতে দেরি হয়?
— কিছু কাজ থাকে মা। ও তুমি ভেবো না। আমি ঠিক চলে আসবো।
— আসবি, তা তো বুঝলাম কিন্তু দেরি হয় কেন, সেটা বলবি তো?
— সব কথা কি বলা যায়,মা? ও তুমি বুঝবে না মা?
— কেন? না বোঝার কি আছে? বুঝিয়ে বললেই বুঝবো।
— আরে বাবা, সব তোমাকে বলতে হবে?
–কেন, বললে ক্ষতি কি?
— না, অত কিছু বলতে পারব না।
— বলতে হবে। তোকে কলেজে ভর্তি করা-ই বোধহয় ঠিক হয় নি।
— ছাড়ো, ছাড়ো ওসব। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
কলেজ চলে যায় শিলা। কিন্তু রমা বুঝতে পারে শিলা যেন কেমন বদলে যাচ্ছে, কেমন যেন বেপরোয়া। জিজ্ঞেস করলেও বাঁকা বাঁকা উত্তর দেয়। তবুও মা ভাবে মেয়ে এখন কলেজে পড়ে, বড় হয়েছে, একটু তো হবেই। কিন্তু ক্রমশই শিলার কলেজ থেকে ফেরা দেরী হতে থাকে দিনের পর দিন। এখন সে কলেজের ছাত্র সংসদের সক্রিয় কর্মী। যতই ইলেকশনে এগিয়ে আসতে থাকে ততই তার বাড়ি ফেরাও দেরি হতে থাকে। প্রত্যেক ছাত্রছাত্রীর বাড়ি গিয়ে বোঝানো, সভা,জি.এস এর সঙ্গে মিটিং। এছাড়াও জি.এস স্বরূপের সঙ্গে তার প্রেম এখন তুঙ্গে। তাই ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কখনো কফি হাউসে কিংবা কখনো নির্জন অন্ধকারে কিছুটা সময় কাটানো আসলে শিলা জানে, তাকে একটা চাকরি জোগাড় করতে হলে একজন ব্যক্তির শক্ত হাত তার প্রয়োজন। আর এই শক্ত হাতটা স্বরূপ। ফলে বাড়ি ফিরতে রাত হয় বেশ। ওদিকে বাড়িতে মা-বাবা চিন্তায় উদ্বিগ্ন। বাবা হিরন বাবু তো রমার উপর ভীষণ অসন্তুষ্ট। হিরণবাবু চায় নি মেয়ে কলেজে পড়ে কিন্তু কি করবে?রমা কিছুতেই বুঝলো না। মেয়েকে কলেজে পড়াবেই। তাই আজকাল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া লেগেই আছে। আজ রমা ভীষণ বিরক্ত হয়ে রাগ করে ভাবে, আজ ঘুম থেকে উঠুক মেয়েটা, এর একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়বো। ওকে কলেজে ভর্তি করে বোধহয় মস্ত ভুল করে ফেলেছি। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবে আরো অন্যান্য মেয়েরা পড়ে ওই একই কলেজে, তারা তো এত দেরি করে বাড়ি ফেরে না!
এমন সময় ঘর থেকে ঘুম জড়ানো কন্ঠে স্বর ভেসে আসে, মা, এক কাপ চা দেবে গো?ইস্ কত বেলা হয়ে গেল!
— দিচ্ছি। বিরক্ত হয়ে রমা নিজেই বলতে থাকে, এত দেরি করে ঘুমালে তো উঠতে দেরি হবেই।
শিলা চা খেয়ে তাড়াতাড়ি স্নানে যায়,স্নান সেরে সোজা রান্নাঘরে। বলে,মা, ভাত দাও, ভাত দাও ।কলেজে অনেক কাজ আছে আজ,ভেবেছিলাম একটু তাড়াতাড়ি যাবো কিন্তু দেখো না, দেরি হয়ে গেল, কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে নিজেই বলতে থাকে। ভাত দিতে দিতে রমা মেয়েকে জিজ্ঞেস করে,তোর কলেজ থেকে ফিরতে এত দেরি হচ্ছে কেন? কই মিত্র বাড়ির শিখার তো এত দেরি হয় না?
— পার্টির অনেক কাজ থাকে মা। কলেজ শেষে ওগুলো করে তবেই বাড়ি ফিরতে হয়। আর শিখার কথা বলছো,ও একটা মেয়ে হল নাকি? একদম পিকুলিয়ার মেয়ে। ওর কাছে পড়াশোনাটাই শেষ কথা। ও বোঝে পড়াশোনা করলেই চাকরি অনায়াসে পাওয়া যায় কিন্তু আজকাল চাকরি পাওয়া অতো সোজা না মা, যোগ্যতার সঙ্গে একটা শক্ত হাত দরকার। আর ওই হাতটা কেউ এমনি এমনি বাড়িয়ে দেবে না, তার জন্য রাজনীতিতে কিছু কন্ট্রিবিউশন থাকা দরকার। আর আমি সেটাই করছি।
— কিন্তু তাই বলে এত রাত!
— ও তুমি ভেবো না। সামনে ভোট তো, এখন একটু দেরি হবেই। তুমি বাবাকে একটু ম্যানেজ করে নিও। ভোটের পরে আর এত দেরি হবে না।
–কত আর ম্যানেজ করবো বলতে পারিস? তোর প্রায় আটটা নটা বেজে যাচ্ছে, কতক্ষণ আর বুঝিয়ে রাখা যায়? আমার তো মনে হয় আমি ভুলই করেছি।
বিয়ে দিয়ে দিলেই বোধ হয় ভালো করতাম।
তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠে হাত ধুয়েই শিলা মা মা বলে গলা জড়িয়ে ধরে। আদর করে বলে, লক্ষ্মী মা আমার, আর কটাদিন বোঝাও বাবাকে, ব্যাস। তারপর আর বোঝাতে হবে না, আমি সময় মতোই ফিরে আসবো, বলেই ব্যাগ ঝুলিয়ে বেরিয়ে চলে যায় কলেজে শিলা।
সন্ধ্যা গড়িয়ে যায়, মায়ের অশান্তি বাড়তে থাকে। অপেক্ষায় প্রহর গুনে। শিলা কলেজ থেকে ফেরে না। বারবার হিরণবাবু খোঁজ নেই। অবশেষে ন’টা নাগাদ একটি মোটর বাইক বাড়ির সামনে দাঁড়ায়। রমা উদ্বিগ্ন চিত্তে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে দেখে, একটি ছেলে শিলাকে ধরে ওর মাথাটা নিজের কাঁধে রেখে বাইরের গেটের সামনে। অমনি রমা দরজা খুলে দেয়। ছেলেটিকে রমা অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে ওর? ধরে আনতে হচ্ছে কেন?
— না, তেমন কিছু নয়। ভালই আছে। তবে— আসলে— একটু ইতস্তত করে বলে, একটু মানে—–
—অত মানে মানে করছো কি! পরিষ্কার করে বলো।
— একটু বেশি খেয়ে ফেলেছে আজ! তা-ই আর কি—— তা তুমি কে?
— আমি ওর বন্ধু। একসঙ্গে পড়ি।
–নাম?
— আমার নাম স্বরপ। মানে স্বরূপ দাস। পড়াশোনা ছাড়াও আমি ছাত্র সংসদের জেনারেল সেক্রেটারি। —ও-ও, তাহলে তুমিই স্বরূপ।ওর মুখে আমি তোমার নাম অনেক শুনেছি।
— এরকম কি ও প্রতিদিন——
— না, না আসলে আজ আমাদের একটা পথসভা ছিল, ওখানে অনেক ঝামেলা হয়েছে প্রতিপক্ষের সঙ্গে। তাই খারাপ মনটাকে ভালো করতেই——
— বুঝেছি। ওকে ছেড়ে দাও, আমি ঘরে নিয়ে যাচ্ছি।
— ঠিক আছে, বলেই স্বরূপ রমার কাছে শিলাকে দিয়ে চলে যায়। এবার রমার ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে যায়। মনে মনে বলে, নাঃ, আর নয়। ওকে স্বাধীনতা দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, অন্য মেয়েদের মত যেন পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এটাতো স্বাধীনতার অপব্যবহার। ওর বাবাকে এরপরে আর থামিয়ে রাখা যাবে না। এখন দেখছি ও স্বাধীনতার নামে বেলেল্লাপনা করছে।
ঘর থেকে বেরিয়ে এসে হিরণবাবু উৎকণ্ঠায় জিজ্ঞাসা করে, কি এসেছে?
— হ্যাঁ, হ্যাঁ এসেছে। একটু হাসিমুখে বলে রমা।
— কোথায়?
—শরীরটা একটু খারাপ। তাই ওর একজন বন্ধু ওকে দিয়ে গেল। একটু ঘুমোক, পরে বলো।
কিন্তু রমার তো বুঝতে বাকি নেই যে, মেয়ে তার গোল্লায় গেছে।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠলে শিলা মা পাশে ডেকে নিয়ে বলে, শোন, কয়েকটা কথা বলি, তোকে কলেজে ভর্তি করালাম একটু মানুষের মত মানুষ হবি বলে, কিন্তু তুই তা না হয়ে অমানুষ হয়ে গেলি, এটা কি স্বাধীনতা দেওয়ার অপরাধ!
অমনি ফোঁস করে উঠে শিলা বলে, কেন কি অপরাধ করলাম আমি? কলেজে একটা পার্টি করি এই তো?
— শুধু কি পার্টি! আর ছাইপাশ কি গিয়েছিলি কাল? ওটা কি কলেজে পড়ার নমুনা?
–ও একটু আধটু হবে।
— না ওসব চলবে না। তোর আর কলেজে পড়ে কাজ নেই। এমন সময় মর্নিংওয়াক থেকে ফিরে এলেন হিরন বাবু। এসেই মেয়েকে সোজাভাবে বলে দেন, আজ থেকে তোমার কলেজ বন্ধ। অনেক পড়েছো, আর পড়ে কাজ নেই। এবার অন্য ব্যবস্থা করবো।
সেই কথা শুনে রাগান্বিত স্বরে শিলাও জবাব দেয়, না, আমি কলেজ ছাড়বো না। আর অন্য ব্যবস্থার কথা বলছো। সেটা কি? তুমি না বললেও আমি জানি তুমি কি বলতে চাইছো। আমি এখন কিছুতেই কিছু করতে পারবো না।
— কেন? বাবা-মা যা বলবে তাই তোমাকে শুনতে হবে।
— ও সব দিন চলে গেছে বাবা। জীবন আমার। আমাকেই ভাবতে দাও।
— বাঃ ভারী চমৎকার! লেখাপড়া শিখে ভালোই তো উন্নতি হয়েছে তোমার। তোমাকে মুক্ত আকাশে উড়তে দিয়েছিলাম কিন্তু তুমি উড়তে উড়তে গভীর জঙ্গলে চলে যাচ্ছো। সেটা তো হতে দেওয়া যায় না। অন্তত আমরা বেঁচে থাকতে তা হবে না। তাই যা করবো, আমরাই করবো।
— তুমি শত চেষ্টা করলেও পারবে না বাবা। আমি একজনকে ভালোবাসি।
— এত বড় কথা! আমার সামনে!
— হ্যাঁ অবশ্যই। আমার ভাবনা আর তোমাদের ভাবতে হবে না। যা করবো, আমি নিজেই করবো।
— খুব ভুল হয়ে গেছে তোমাকে কলেজে ভর্তি করে। এবার ভুলটা শুধরে নেয়ার সময় এসেছে।
–ঠিক আছে। করে দেখো—
বলতে বলতেই শিলা বেরিয়ে যায় কলেজের উদ্দেশ্য।
রমা প্রচণ্ড অস্থির হয়ে পড়ে, সত্যিই বড় ভুল হয়ে গেছে ওদের। অথচ মিত্র বাড়ির মেয়েটা শিখা, সেও তো ওই একই কলেজে পড়ে। কই সে তো এমন বেয়াদবী করে না! কি ভদ্র, বিনয়ী মেয়েটা! ওর কথাবার্তা চালচলনে শিক্ষার আলো যেন ছড়িয়ে পড়ছে। হিরণবাবু প্রচন্ড রেগে রমাকেই তুলোধোনা করে। আপন মনে বলতে থাকে, বারবার বলেছিলাম মেয়েকে কলেজে পড়িয়ে লাভ নেই, ওকে দেখে শুনে একটা বিয়ে দিয়ে দিই কিন্তু তুমি শুনলে না, এবার বোঝো।
রমা কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে, তুমি আর মাথা গরম করো না গো। আজ কলেজ থেকে ফিরুক, ওকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজি করাবোই। কিন্তু সারা দিন গিয়ে রাত হয়ে গেল শিলা আর ফিরে না। রমার চিন্তা ক্রমশ বাড়তে থাকে। গোটা রাত পেরিয়ে যায়। শিলা আসে না। পরের দিন দশটা বাজতেই হিরণবাবু কলেজে শিলার খবর নিতে যায়। এখানে স্বরূপের এক বন্ধুর কাছে জানতে পারে শিলা আর স্বরূপ কেউই গতকাল কলেজে ছিল না। ওরা নাকি বিশেষ কাজে বাইরে গেছে। বড্ড চিন্তায় পড়ে হিরনবাবু।
ফিরে আসবে এমন সময় মোবাইল বেজে ওঠে।
সঙ্গে সঙ্গেই ফোন ধরে বলে, হ্যালো—-
— হ্যাঁ, হ্যালো বাবা, আমি বাইরে আছি। আমাকে নিয়ে আর চিন্তা করো না তোমরা। আমি স্বরূপকে বিয়ে করেছি, ভালো আছি। বলেই ফোন কেটে দেয় শিলা। হিরণবাবু টলতে টলতে বাড়ি আসে। রমা দেখেই হিরণবাবুকে ধরে কোনোমতে সোফায় বসায়। জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে তোমার? শিলার খোঁজ পেলে? কিন্তু কোনো কথার উত্তর দেয় না হিরনবাবু, মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে। আকাশে তখন ঘন মেঘ। চারিদিক একটা থমথমে ভাব। মুহূর্তেই মুষলধারায় বৃষ্টি নামে। মনে হচ্ছে গোটা আকাশটাই বুঝি ভেঙে পড়বে আজ! বৃষ্টিবিন্দুর ছাঁটে ঢেকে যায় সব আবছা অন্ধকারে।