T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় কবিরুল (রঞ্জিত মল্লিক)

“শিউলি”
“বাজলো তোমার……..
আলোর বেণু…….”
পুজো আসতে দেরী নেই। সবুজের মখমলে শিউলি ফোটা ভোরের বোহেমিয়ান শিহরণ, আকাশের নীল খামে বলাকার চিঠি ভেসে আসা, টলটলে দীঘির জলে শাপলা, শালুকের মিছিল, সবুজের ঘেরাটোপে কাশের সভা, ঢাকের মিষ্টি বন্দিশে শিউলির সজল অভিমান।
পুজো আসলেই ছোট্ট পালকির মনটা বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। পুজোতে সবাই বাবা মায়ের হাত ধরে ঠাকুর দেখতে যায়, বন্ধুদের সাথে দল বেঁধে আনন্দ করে। পুজোর পরে এখানে সেখানে বেড়াতে যায়।
ছোট্ট পালকির জীবনে সেই সবের পাট নেই। দু বছর আগে পুজোর আগেই পালকির মা থ্যালাসেমিয়া বীটা মেজর রোগে আক্রান্ত হয়ে কৈলাসে পাড়ি দিয়েছেন। সেই থেকে পালকি ভীষণ মনমরা। ও নিজেও থ্যালাসেমিয়া বীটা মেজর রোগের শিকার। তবে ঐ রোগ সম্বন্ধে ও কিছুই জানে না। তবে ও জানে ওর মা রক্তের অভাবে মারা গেছে।
পুজোর কটা দিন তাই ও নিজেকে আড়ালে রাখে। আর চোখের কোণ বেয়ে নেমে আসা নিষ্পাপ নোনা শিশিরে নিজেকে ডুবিয়ে দেয়।
পালকির কষ্টটা একমাত্র পিসিমণি বোঝে। মাহারা ভাইজিকে চোখে হারায়। ভীষণ ভালবাসে।
আজ স্কুল থেকে ফেরার পথে পালকি একটা ঘটনা দেখে খুব অবাক হয়েছে। পিসিমণিকে সে কথা বলতে উনিও কষ্ট পেয়েছেন।
“জান পিউমণি, বাচ্চাটা আমার মতন মাহারা হয়ে গেল। ওকে দেখার কেউ নেই।”
“কে বলেছে ওর কেউ নেই? যার কেউ নেই তার মা দুর্গা আছেন। উনি সকলের মঙ্গল করেন।”
স্কুলে যাবার পথে রোজ অসহায় বাচ্চাটাকে দেখে। আর কষ্ট পায়। দুদিন বাদেই পুজোর ছুটি পড়ে যাবে। তখন বাচ্চাটাকে আর দেখতে পাবেনা।
***********
আজ স্কুলের শেষ দিন। ছুটির পর বাচ্চাটাকে কোলে করে বাড়িতে এনে হাজির।
“দেখেছ, মেয়ের কাণ্ড! এতটুকু বাচ্চাকে কেউ ঘরে তোলে? কোথা থেকে কি রোগ ছড়াবে কে জানে?”
“পিউমণি, তুমিই তো বলেছ; যার কেউ নেই তার মা দুর্গা আছেন। মা দুর্গাই তো ওকে দেখভালের জন্যে আমাকে পাঠিয়েছেন।”
“ও রে, আমার পাকাবুড়ি!”
কুকুরের বাচ্চাটার মা কদিন আগেই লরীর চাকার তলে পড়ে স্বর্গে যায়। পালকি তাই ওর অবোধ সন্তানকে নিজের কাছে রেখে সেবা যত্ন করতে শুরু করেছে। পালকি জানে মা হারানোর যন্ত্রণা কি জিনিস! বাচ্চাটার একটা নামও দিয়েছে, “শিউলি”
দুদিনেই শিউলি পালকির বেশ আপন হয়ে উঠেছে। যাকে বলে মা মেয়ের সম্পর্ক। পালকি রোজ ওকে স্নান করায়। তোয়ালেতে গা মুছিয়ে দেয়। নিজের হাতে খাওয়ায়।
********* **************
ঢাকে কাঠি পড়তেই দেখতে দেখতে পুজো চলে এল। ক্যালেণ্ডারের সাদা কালো চৌকো খোপগুলো এক এক করে একে অপরকে টপকে পঞ্চমী পেরিয়ে ষষ্ঠী, তারপর সপ্তমীর নিশা শেষ হতে না হতেই অষ্টমীর ঢ্যাং কুড়া কুড়্ বাজনা বাজা শুরু।
“….শঙ্খ শঙ্খ মঙ্গল গানে
……. জননী এসেছে দ্বারে…….”
আজ অষ্টমী। সন্ধিপুজোর ১০৮টা প্রদীপ জ্বলে উঠতেই পালকি শিউলিকে কোলে করে মণ্ডপে আসল। ধূপের গন্ধে মাতাল চারিদিক।সাথে মিষ্টি মধুর ঢাকের মল্লার। পালকির চোখে সোনামুগ রোদের হাসি। তার ছিঁটেফোঁটা শিউলির মুখেও। চন্দনগরের জোরালো, বাহারী আলোতে তা আরো বেশী করে ঝলমল করছে।
নবমীর সকাল থেকেই পালকির শরীর খারাপ হতে থাকে। রাতে ওকে নার্সিং হোমে ভর্তি করানো হয়। শিউলির বোবা চোখ ওকে দেখতে না পেয়ে এদিক সেদিক চেয়ে থাকে। আদরের পালকি দিদিমণিকে সারা বাড়ি খুঁজতে থাকে। পালকি নেই। তাই ও কেমন নীরব হয়ে যায়। সেই দস্যিপনাও থেমে গেছে।
দশমীর সন্ধ্যেতে বিসর্জনের ঢাক বাজতেই পালকি বীটা মেজরে বলি হয়ে, বাড়ি পাড়ার সকলকে চোখের জলে ভাসিয়ে মা উমার সাথে কৈলাসে পাড়ি দেয়।
……… ……… …….. ………
দুদিন কেটেছে। পালকিদের বাড়িটার মতন গোটা পাড়াটাও নিস্তব্ধ। গভীর বেদনার চাদরে ঢেকে আছে। একটা ছোট্ট, সবুজ, সতেজ প্রাণের এইভাবে চলে যাওয়াটা কেউই মেনে নিতে পারছে না। তাও মা উমার বিসর্জনের দিনে….।
শিউলিও ভীষণ চুপ হয়ে আছে। তিনদিন ধরে একটা দানাও মুখে দেয় নি। বাড়ির সকলের চোখ মুখ বেশ থমথমে। সেটাই স্বাভাবিক। শোকের ছায়া যেন সর্বত্র রাজত্ব করছে।
আজ ত্রয়োদশী। সকাল থেকেই শিউলির সাড়াশব্দ নেই। কোন খোঁজও পাওয়া যাচ্ছে না। খাবার পাত্রটা যেমন ছিল তেমনই পড়ে আছে। সেখানে মুখ দিয়েছে বলে মনে হয় না….। কোথায় গেল দুধের শিশুটা…..? সারাদিন কেমন এ ঘর থেকে ও ঘর, এ বারান্দা থেকে ও বারান্দা, সারা, বাড়ি উঠোন দাপিয়ে বেড়ায়। আজ পুরো বাড়ি শান্ত। ছোট্ট ছোট্ট পা ফেলার সাথে সাথে “কুঁই কুঁই” আওয়াজের মোজার্টীয় বন্দিশটাও অনেক্ষণ ধরে সকলে মিস করে চলেছে।
সন্ধ্যেতেই শিউলির নিথর দেহটা সবাই দেখতে পায়। পিছনের বাগানে কুয়োর পাশে এক কোণে পড়ে আছে। মনে হচ্ছে যেন ঘুমিয়ে আছে। মাথার উপরে বহু দিনের পুরোনো ঝাঁকড়া শিউলি গাছটা গীতার শ্লোকের মতন ঝিরঝিরে বাতাস বইছে দিচ্ছে ওর পবিত্র নিষ্পাপ শরীরের উপর। পালকির চলে যাওয়াটা ও মেনে নিতে পারেনি। তাই দুঃখ কষ্টে না খেয়ে ও বেচারাও মা উমা, পালকির পিছন পিছন কৈলাশের ট্রেন ধরে।
বাড়ির সকলের চোখে তখন কার্তিকেয় নোনা শিশিরের চন্দন। শোকে পাথর হয়ে সবাই দেখল, কোজাগরী চাঁদের অকৃপণ আলোতে ডুবে আছে ওর সাদা পশমের শরীরটা। ভীষণ অভিমানে শিউলি ফুলগুলো টুপ টুপ করে খসে খসে পড়ছে ওর মৃত শরীরের উপর।
“দুর্গে দুর্গে দুর্গতিনাশিনী…….
মহিষাসুরমর্দিনী জয় মা …… ………”