কবিতায় স্বর্ণযুগে কেতকীপ্রসাদ রায় (গুচ্ছ কবিতা)

স্বেচ্ছায় পরবাসী
নিজেকে স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি করে মৃদাঙ্গের তালে তালে অপ্সরাদের স্বর্গসুখ নিই জল চিকচিক জ্যোত্স্নায় নদীর বুকে ভেসে । দেওয়াল টিপলেই আলো-জল-বাতাস আসে ; টেবিলে বসলেই রকমফের মহাভোজ । চাইলেই স্নান ঘরে ঈষদ-উষ্ণ জলে গোলাপের পাপড়ি…এমন স্বেচ্ছায় বনবাসী হতে কার না ইচ্ছে করে ! অপূর্ণতার ভিতর থেকে উঠে আসা ইচ্ছে গুলো শীত ঘুমের মতো বরফে ঢাকা ছিলো এতদিন । শীত ঘুম ভেঙে সবুজ পাতাগুলো মেলে ধরেছে রঙিন গালিচা। অথচ দ্যাখো, এখনও দু’পায়ে জড়িয়ে রয়েছে এঁটেল মাটি । হাটুরের পায়ে লেগে রয়েছে প্রাত্যহিকী নিয়মাবলী । আরও দ্যাখো, ভূমিপুত্র বলে যেখানে দাবি করে এসেছি সাড়ম্বরে, সে সব ছেড়ে এখন পরবাসে কতো সাবলীল । ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বের মতো বিচ্ছিন্ন যোগাযোগের মধ্যেও কষ্ট এখন সামলে নিয়েছি বিস্তর । স্বেচ্ছায় নির্বাসনে গৃহবন্দি থাকলে রামচন্দ্রের বনবাসও কখনও কখনও সুজাতার পায়েসের মতো মধুর লাগে । আর এখন ঐ সব সুখের মধ্যে থেকেও এই পরবাস আমার কপালে চাঁদের টিপ দিয়ে যায় ।
মানচিত্র
প্রচীন ভারতের মানচিত্র আঁকতে আঁকতে
থমকে গেছি সাগর সঙ্গমে ;
সুন্দরবন এখানে দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে ।
কুমির-ডাঙার মাঠে বাঘেদের আদমশুমারি বন্ধ রেখে-
এক দল বাংলা ভাষার মুক্তির স্বাদ আদায় করে নিয়েছে ;
হ্যাঁ…আমরি সে বাংলা ভাষা।
আর একটু গভীরে গিয়ে খুজে পাই-
অনাহারে পড়ে আছে সারি সারি মৃতদেহ ;
ইতিহাস ভুলে গেছে সে সব সৈনিকের নাম।
আমাদের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা ভাঙা মানচিত্রে-
লাল ঘাসে সবুজ ঘোড়া তরতরিয়ে ছুটছে ;
আর সমগ্র মানচিত্র আলোকিত করেছে আমার মায়ের ভাষা।
মাৎস্যন্যায়
সারাদিন জমানো আনন্দ খেয়ে চিৎসাঁতারে ভেসে থাকি নদীর বুকে । মৎস্যকন্যাদের সুবাসিত তৈল ঘ্রাণ মেখে তারিয়ে তারিয়ে সূর্যের আলোয় নিজস্ব উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে নিই । দেখি, লাল নীল সবুজ মাছেদের নকশা কাটা জলজ পত্রের উপর মৈথুন অঙ্গ-বিক্ষেপ । মাছেদের সঙ্গে সন্ধি করি, নাড়া বেঁধে প্রজন্মের ইতিহাস পড়ি। নাহ… মাছেদের আলো আঁধারি বর্ণছটায় মোড়া বাসর-শয্যা পাতা ঘর নেই ; আছে শুধু মাৎস্যন্যায়ে উৎস্বর্গিত প্রাণ । অথচ দ্যাখো, আমার ধার্মিক হওয়ার পরিবর্তে ধর্মের আফিন খেয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিই জারজ সন্তানের মুখে। আর টানটান করে বাসার-শয্যা পাতা ঘরে পূর্ণিমার চাঁদ প্রবেশ করলে মাৎস্যন্যায়ের কথা ভুলে খাদক হয়ে যাই ॥
ঈশ্বর হয়ে উঠছি
নিবিড় সম্পর্কের বুনিয়াদ ভেঙে গেলে একা হয়ে যাই;
আর তখন ধুলায় লুটিয়ে পড়ে ঐতিহ্যের সাজানো সৌধ।
কে দোষী…এ সব অন্বেষণের দায়িত্ব ঐতিহাসিকদের।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাপা পড়ে যায় মিথ্যা সৌধ ।
নিজেকে প্রশ্ন করি…
এই যে আত্মীয় পরিজন, সকল রক্তের সম্পর্ক-
এ সব তাহলে নকল রাজবেশ !
নিজেকে আরও প্রশ্নবানে ক্ষতবিক্ষত করি…
আপনজন বলে কী কেউ কখনো ছিলো !
নাকি বিমূর্তের ছদ্মবেশে সব সরলতার মধ্যে দ্রবীভূত ছিলো অন্তর্ঘাত !
এখন সম্পদের প্রাচুর্য ছেড়ে বিচ্ছিন্ন বদ্বীপে বাস নিয়েছি ;
আর বুদ্ধের অমোঘ বাণী প্রচারে দীক্ষা নিয়ে ধীরে ধীরে ঈশ্বর হয়ে উঠছি।
আসলে ঈশ্বরতো চিরকাল একা আর অদ্বিতীয়।