সাপ্তাহিক গল্প নেই-তে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় – ২৯

গল্প নেই – ২৯

অফিস থেকে বাড়ি ফিরতেই মা বলল, ‘তোকে একটি মেয়ে খুঁজতে এসেছিল। বলল, তোর সঙ্গে নাকি খুব দরকার।’
বললাম, ‘কি দরকার কিছু বলেছে?’
‘জানতে চেয়েছিলাম। বলল, আপনাকে বলা যাবে না।’
‘মানে! তুমি কিছু বললে না?’
‘বললাম তুমি একজন মেয়ে হয়ে যে কথা আমাকে বলতে পারছ না, তা কি করে আমার ছেলেকে বলবে?
‘তারপর?’
‘আমাকে কিছুতেই বলল না। বললাম কোয়াটার নম্বরটা দিয়ে যাও। সেটা দিল।’
সপ্তাহের বেশিরভাগ দিনই এইরকম হত। কোন না কোন নালিশ আসত। তার সমাধান করতে যেতে হত। দায়িত্বটা ‘আ বয়েল মুঝে মার’ বলে নিয়েছিলাম। না গিয়ে উপায় নেই।
আমার বন্ধুদের কথাটা বললাম। কোয়াটার নম্বর বলতেই একজন বলল, ‘দাদা ওখানে না যাওয়াই ভালো। ওসব বহুদিনের ঝামেলা।’
বললাম, ‘তোমরা তো সঙ্গে থাকবে। চল গিয়ে দেখি।’
একজন বলল, ‘ওই কোয়াটারে ওরা ভাড়া থাকে। অনেক চেষ্টা করেছি ওরা কিছুতেই উঠছে না।’
বললাম, ‘আগে গিয়ে তো দেখি।’
যখন গেলাম একটি মেয়ে দরজা খুলে দিল। আমার সঙ্গে চারজনকে দেখে বলল, ‘আমি শুধু আপনার সঙ্গে কথা বলব। আর কেউ থাকবে না।’
বললাম, ‘তাহলে আমি কোনো কথা শুনব না। আমার সঙ্গে যারা এসেছেন সবাই থাকবে। এরা কমিটির মেম্বার।’ বাধ্য হয়ে রাজি হল মেয়েটি। বলল, ‘আমার ভাই রোজ আমাকে আর আমার মাকে মারধর করে। আপনি এর একটা বিচার করুন।’
বললাম, ‘এই কথাটা আমার মাকে বলতে কি খুব অসুবিধা ছিল?’
মেয়েটির চুপ করে রইল। বললাম, ‘ভাই বাড়িতে আছে?’
‘হ্যাঁ।’
আমার সঙ্গে থাকা একজন বলল, ‘আজ ওকে আচ্ছা পড়ে পেটাব।’ সেটা শুনে মেয়েটির মুখে হাসি ফুটল।
ছেলেটি ঘরের দরজা বন্ধ করে রেখেছে। খুলতে বলায় খুলল। বলল, ‘আপনাকে আমার কয়েকটি কথা বলার আছে। শোনার পরে আপনি আমাকে যা খুশি শাস্তি দিতে পারেন।’
সবাই সেই ঘরে ঢুকতে গেলে ছেলেটি বলল, ‘কাকু আমি শুধু আপনার সঙ্গে কথা বলব।’
আমি আমার চারজন বন্ধুকে অন্য ঘরে থাকতে বললাম।
ইতিমধ্যে বাইরে অনেকে মজা দেখতে জুটেছে। আমাদের যেকোনো কাজেই যারা বিরোধিতা করত তারাও গুটিগুটি পায়ে হাজির হয়েছে।
বন্ধুদের বললাম, ‘তেমন কিছু হলে বাইরের পরিস্থিতি তোমাদের সামলাতে হবে।’
ছেলেটি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। সে জানাল, তার বাবা একটা প্রাইভেট অফিসে কাজ করত। সরকারি আবাসনে এই কোয়াটার ভাড়া নিয়েছিল। অসুখে ভুগে মারা যায়। বাবা মারা যাওয়ার পরে তারা ঠাকুরদার বাড়িতে থাকবার জন্য গিয়েছিল। সেখানে তাদের থাকতে দেয়নি। তাই বাধ্য হয়ে এখানে আছে।
আমি আসল কথায় এলাম। বললাম, ‘তুমি লেখাপড়া করছ, এটা জান না যে, মাকে দিদিকে মারতে নেই।’
বলল, ‘জানি।’
‘তবে কেন মার ওদের?’
‘ছেলেটি বলল, ‘আমার পরীক্ষার জন্য অনেক পড়ার দরকার। আমার মা, দিদি আমাকে বাড়িতে থাকতে দেয় না। আমাকে পড়তে দেয় না। মা রান্না করে না। আমার খিদে পায়। খেতেও দেয় না।’
বললাম, ‘এটা কি করে হয়? মায়েরা তো নিজেরা না খেয়ে তার সন্তানদের খেতে দেয়।’
‘দেয় তো । দিদিকে খেতে দেয়। আমাকে তখন বাড়ি থেকে বের করে দেয়। আমার বই খাতা লুকিয়ে রাখে। যাতে আমি না পড়তে পারি।’
সব কেমন অবাস্তব মনে হল ছেলেটির কথা শুনে।
বললাম, ‘তাই বলে তুমি ওদের মারবে?’
অনেকক্ষণ চুপ করে রইল ছেলেটি। নীরবতা ভেঙ্গে বলল, ‘একটা কথা বলব? আপনি ছাড়া আর কেউ জানবে না।’
‘আমাকে কথা দিতে হবে?’ বললাম।
আপনি গুরুজন আপনাকে তো জোর করে সেই কথা বলতে পারি না। তবে আপনি কাউকে না বললেই ভালো হয়।’
বললাম, ‘বল কি কথা।’
‘আমার বাবা যখন বেঁচে ছিল, তখন আমি জানতাম না যে, আমার এত কাকু আর মামা আছে। বাবা মারা যাওয়ার পর দেখি তাদের সংখ্যা বেড়েই যাচ্ছে। ঘরে সারাক্ষণ হইচই। হাসি গল্প। মদের গন্ধ। আমি পড়তে পারছি না। আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে।’
বললাম, ‘আমি সব শুনলাম। দেখছি কি করতে পারি। তুমি কখনো ঘরের দরজা বন্ধ করে রেখ না। আর এমন কোনো কাজ করবে না যা শুনে আমরা কষ্ট পাব। মানুষ অনায়াসে মরতে পারে। ওটা সহজ। যে কষ্টের মধ্যেও বেঁচে থাকতে শিখেছে জানবে সেই বাহাদুর। আমি চাই তুমি বাহাদুর হয়ে ওঠ।’
ঘরের বাইরে এলাম। ছেলেটির মা ও দিদি আমার সামনে এল। আমি বন্ধুদের সামনেই ছেলেটির মা ও দিদি কে বসতে বললাম।
মেয়েটি বলল, ‘আমার ভাইকে পুলিশে দেওয়া উচিত। ওর জেল হওয়া উচিত।’
আমার এক বন্ধু ধমক দিল। বলল, ‘চুপ। পুলিশে দেওয়া উচিত এটা যদি মনে করেছ তবে দাদাকে ডাকলে কেন?’
আমি ছেলেটির মাকে বললাম, ‘যা বলছি মন দিয়ে শুনুন। আপনার ছেলের যত বইখাতা লুকিয়ে রাখা হয়েছে সব আজ রাতেই বের করে দেবেন। ছেলে যেন ঘরেই দু’বেলা খেতে পায়। ওর নিজের দরকারে বাইরে না গেলে ওকে ঘর থেকে বের করে দেবেন না। ও যখন লেখাপড়া করবে তখন বাড়িতে যেন কোনো হৈ হল্লা যেন না হয়।’
মেয়েটি বলল, ‘আমাদের যে মারল তার বিচার করবেন না?’
‘নিশ্চয়ই। আমার বন্ধুদের সামনে বলছি। তোমার ভাই যদি আবার তোমাকে বা তোমার মাকে মারে এই খবর আমরা পেলেই থানায় জানিয়ে তোমাদের এই কোয়াটার থেকে একঘন্টার মধ্যে বের করে দেব। একমিনিট সময় বাড়তি নেব না।’
এই কথা বলে বন্ধুদের নিয়ে সেখান থেকে চলে এলাম।
প্রতিদিনের অনেক ঘটনার ঘনঘটায় সেদিনের ঘটনা আবছা হয়ে এসেছিল।
একদিন ডোরবেলের শব্দ শুনে দরজা খুলে দেখি ওই ছেলেটি। হাতে একটি মিষ্টির প্যাকেট।
বললাম, ‘তুমি! কেমন আছ?’
ঘরে ঢুকে মিষ্টির প্যাকেট আমার হাতে দিয়ে প্রণাম করতে গেল।
আটকে দিয়ে বললাম, ‘কি ব্যাপার?’
‘আমি বি এ পাশ করেছি। মা বলল ওনাকে আর ওনার মাকে প্রণাম করে আয়।’
অবাক হলাম। সেই ঘটনার পরে এতদিন পেরিয়ে গেল? সময় কত দ্রুত চলে যায়। এর মধ্যে কোনো নালিশ আসেনি। তাই ওদের কথা মনেও রাখিনি।
মাকে খুঁজল ছেলেটি। জানালাম মা আমার ছোটো ভাইয়ের বাড়িতে জামশেদপুরে।
শুনলাম ছেলেটি একটি কাজ করছে। সঙ্গে লেখাপড়াও চালিয়ে গেছে। ওর দিদিরও একটা চাকরি হয়েছে।
ছেলেটি জানাল ওর মা ওকে খুব ভালোবাসে। দিদিও। ওর বাড়িতে নাকি মাঝে মাঝেই আমার কথা আলোচনা হয়।
বলল ওরা পরের মাসে এই কোয়াটার ছেড়ে অন্য কোথাও যাবে।
আমার ঘরের ফ্রিজে রাখা ঠান্ডা মিষ্টির বদলে ওর প্যাকেট থেকে সদ্য আনা একটা টাটকা মিষ্টি তুলে দিলাম ছেলেটির মুখে।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।