সাপ্তাহিক গল্প নেই-তে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় – ৩৩

গল্প নেই – ৩৩

দমদম নাগেরবাজার মোড়ে এক বন্ধুর অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলাম।তখন মোবাইল ফোন ছিল না।যদিও বন্ধুটির আসতে তখনও পাঁচমিনিট বাকি আছে,তবু অস্থির হয়ে পড়ছিলাম। আমার মতো আগে এলে কি ক্ষতি ছিল!
দেখলাম একটি ছেলে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। চেনা চেনা মনে হচ্ছিল।তবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না ওকে কোথায় দেখেছি।
আমার সামনে এসে বলল,‘আপনি এখানে।’
‘তোমাকে তো ঠিক চিনতে পারছি না।’
‘আমরা সল্টলেকে থাকতাম।’
বললাম,’এখন থাক না?’
অভিমানের কণ্ঠস্বরে বলল,‘কি করে থাকব? আপনারাই তো থাকতে দিলেন না।’
চকিতে আমার সব মনে পড়ল।এই ছেলেটি আর ওর বাবা, মা, বোনেরা আমি তখন যেখানে থাকতাম সেই কেন্দ্রীয় সরকারি আবাসনে ভাড়া থাকত।
ভাড়াটে থাকা নিয়ে মাঝে মাঝেই ওখানে নানা সমস্যা লেগে থাকত।যে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী বেশি লাভের জন্য নিজে বসবাস না করে ওদের কোয়াটার ভাড়া দিয়েছিলেন তিনি মাঝে মাঝে এসে বলতেন উঠে যাওয়ার জন্য।ভাড়ার টাকা হাতে নিয়েই তাগাদা দিতেন।ওরা উঠতে চাইত না।
এই নিয়ে সমস্যা লেগেই থাকত।একদিন কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারী লোকটি আমাদের কমিটির কাছে এলেন। আমাদের সাহায্য চাইলেন যাতে ওই ভাড়াটেকে আমরা উঠিয়ে দিই।
বললাম,‘ওরা উঠে গেলে আপনি কি করবেন? কোয়াটারে বসবাস করবেন না আবার বেশি টাকায় ভাড়া দেবেন?’
লোকটি চুপ করে রইলেন।
বললাম,‘চলুন দেখছি।’কমিটির লোকজনকে নিয়ে লোকটির সঙ্গে গেলাম ভাড়াটের বাড়ি। আমার সঙ্গে এত লোকজনকে দেখে ভাড়াটে ভদ্রলোক ঘাবড়ে গেলেন।
বললাম,‘আমি গোটা বিষয়টি জানতে এসেছি।শুনছি মাঝে মঝেই ঝামেলা হচ্ছে।’
কোয়াটারের মালিক চড়া গলায় বললেন, ‘আপনি কবে উঠবেন ওনাদের সামনে বলুন।’
আমি লোকটিকে বললাম,‘আপনি অত চিৎকার করছেন কেন? তাহলে আমাদের ডাকলেন কেন?’ ভাড়াটিয়া ভদ্রলোকটির দিকে তাকিয়ে বললাম,‘আপনি কিছু বলবেন?’
ভদ্রলোক জানালেন তিনি তাঁদের নিজেদের বাড়িতে থাকতে পারছেন না। দুই ভাই মিলে সেটা দখল করে নিয়েছে।এখন ভাড়া বাড়িতে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই।
কমিটির একজন বললেন,‘এটা কি জানেন সরকারি কোয়াটারে বাইরের লোক ভাড়া থাকাটা বেআইনি।’
ভদ্রলোক বললেন,‘আমি জানতাম না।এখানে এসে শুনলাম।দালাল ধরে এই ঘর পেয়েছি।’
কতটাকা ভাড়া দিচ্ছেন এটা জেনে নিয়ে সরকারি কর্মচারী ভদ্রলোককে বললাম,‘আপনি একই বয়ানে তিনটি দরখাস্ত লিখে কমিটিকে দিন।লিখবেন অফিস আপনার কাছ থেকে কত টাকা কাটছে আর আপনি কত টাকা ভাড়া নিচ্ছেন।তিনটি দরখাস্তের একটি আমাদের কাছে থাকবে।আর একটি থানায় জমা দেব। অন্যটি আপনার অফিসে পাঠাব।’
কথাটা শুনে সরকারি কর্মচারী লোকটি খুব রেগে গিয়ে বললেন,‘এটা আপনাদের কি বিচার হল?’
বললাম,‘বিচারের এখনও বাকি আছে।’ আমার সঙ্গে থাকা কমিটির একজনকে হিসেব করতে বললাম।গত তিনবছরে তিনগুণ বেশি ভাড়া নিয়ে কত লাভ হয়েছে জানলাম।
ভাড়াটে ভদ্রলোককে বললাম,‘আপনি কতদিনের মধ্যে এই কোয়াটার ছাড়তে পারবেন?’
অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে ভদ্রলোক বললেন,‘আমাকে একটা বছর অন্তত সময় দিন।আমি পারলে তার আগেই চলে যাব।’
‘এই ভাড়ায় চলবে না।ভাড়া বেশি দিতে হবে।’সরকারি কর্মচারী লোকটি আর্তনাদের মতো বললেন।
ওনাকে দেখিয়ে ভাড়াটে ভদ্রলোককে বললাম,‘যেদিন যাবেন আমাদের খবর দেবেন। সেদিন আপনি ঘরটা ওনাকে বুঝিয়ে দেবেন।’
‘আমি তো ভাড়া নিতে আসবই ।’সরকারি কর্মচারী বললেন।
আমার সঙ্গে আসা কমিটির যে ভদ্রলোক হিসেব করছিলেন তিনি বললেন, ‘না আসবেন না। আপনি যত টাকা বেশি নিয়েছেন তাতে উনি আরো দু’বছর এমনি থাকতে পারেন। আপনাকে যেন এক বছরের আগে এই চত্বরে না দেখি।’
সরকারি কর্মচারী বেজায় চটে গেলেন বললেন,‘আপনারা সবাই ভাড়াটের পক্ষে।’
আমাদের মধ্যে একজন বলল, ‘যা বললেন এক্ষুনি আপনার ব্যবস্থা করতাম।’ আমাকে দেখিয়ে বলল উনি মারপিট পছন্দ করেন না তাই ওনার সামনে কিছু করলাম না।এক বছরের আগে দেখলে কিন্তু কপালে দুঃখ আছে।’
এটা বাধ্য হয়ে করতে হয়েছিল।এই খবর তাদের কাছে পৌঁছে যাবে যারা নিজেরা না থেকে কোয়াটার ভাড়া দিয়েছে।একটু সাবধান হবে। যে সমস্ত ভাড়াটে এখনও আছে তারাও এই বিচার শুনে আনন্দে ভাড়ার টাকা দেওয়া হয়ত বন্ধ করবে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীর কাছে বিনা দরকারে কোয়াটার নেওয়া তখন লাভজনক হবে না।
ফলে কোয়াটার যাদের সত্যিই পাওয়া দরকার এইজন্য দরখাস্ত করে অপেক্ষায় যারা দিন গুনছে তারা চট করে পেয়ে যাবে।
সেদিন ভাড়াটেতে ভদ্রলোকের ছেলেটি ওর বাবার পাশে অসহায়ের মতো দাঁড়িয়েছিল।
নিজেদের বাড়ি না থাকার যে কত যন্ত্রণা তা আমি বারবার অনুভব করেছি।ছেলেটিকে কাছে ডেকে বললাম, ‘খেয়াল রেখ তোমার বাবা যেন একবছরের মধ্যেই কোয়াটার ছেড়ে দেন।’
ছেলেটি একা।চোখ মুখ দেখে মনে হল কোনো প্রতিশোধ নেবার বাসনা ওর মধ্যে নেই।বলল, ‘আপনি নাগেরবাজারে কেন?’
বললাম, ‘আমার এক বন্ধু আসবে। তুমি এখানে কেন?’
‘আমরা এখানে ফ্ল্যাট কিনে চলে এসেছি।আসবার সময় আপনার সঙ্গে দেখা করার ইচ্ছে ছিল। শুনলাম আপনি তখন বাইরে গেছেন। আমাদের বাড়ি চলুন।এই সামনেই।আপনাকে দেখলে সবাও খুশি হবে।’
বললাম, ‘আমার বন্ধু আসবে।আমাকে না দেখতে পেলে ওর অসুবিধা হবে।’
ছেলেটি বলল,‘বাবা, মা মাঝে মাঝেই আপনার কথা বলে। আপনি না থাকলে হয়ত আমরা কোনোদিনই নিজেদের জন্য ফ্ল্যাট কিনতে পারতাম না। বাবা ভাবত আপনাকে যদি আবার আমাদের সমস্যার জন্য আসতে হয়,সেটা খুব লজ্জার হবে।’
বললাম,‘সবাই ভালো আছে তো তোমরা? কোয়াটার ছেড়ে দিতে বলার জন্য আমার উপর মনে হচ্ছে রাগ নেই।’
ছেলেটি হাসল। বলল, ‘আপনার উপর রাগ থাকবে কেন? বাবা, মা তো আপনাকে অন্য চোখে দেখে।’
‘আর তুমি?’
ছেলেটি হাসল। বলল,‘সেদিন আমাদের বাড়িতে গিয়ে যে কি বিচারটা করলেন,সেটা ভাবলে আমার মাথাটা কেমন গুলিয়ে যায়।’
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।