।। ত্রিতাপহারিণী ২০২০।। T3 শারদ সংখ্যায় কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায়

ভয়

পুলক যখন গবাদার কাছে এসেছিল তখন অনেক লোকজন ছিল। এত সহজে গবাদার দেখা পাবে ভাবেনি।পুলকের মনের এমন অবস্থা যে, গবাদার কাছে না গেলেই নয়। তার এতদিনের স্বপ্ন ভেঙে যাবে। রাস্তায় দাঁড়াতে হবে।বাড়িতে,পরিচিত লোকজনকে সে মুখ দেখাতে পারবে না। হেরে যাওয়া মুখ দেখার ভয়ে আয়নার সামনেও দাঁড়াতে পারবে না।
তিন কাঠা জমি কিনেছিল সে। বহুদিনের ইচ্ছে বাড়ির সামনে ফুলের বাগান থাকবে,পিছনে নানান সবজির।
জমি কিনবার আগে অনেকে সাবধান করেছিল। জমি ফেলে রাখলে দখল হয়ে ক্লাব হবে।প্রতিবাদ করলে দাদারা বলবে,আপনি ফালতু জমি ফেলে রাখবেন,আর ছেলেপিলেদের খেলু করার জায়গা থাকবে না?কথা বলতে বলতে সর্বহারা মানুষের বাঁচার লড়াইয়ে বিদেশের লড়াকু নেতারা কী বলেছেন সেসব শোনাবেন।পুলককে তখন নিজেকে এক তিনকাঠা জমির শোষক জমিদার মনে হবে।এর চাইতে ভদ্র প্রোমোটারের কাছ থেকে ফ্ল্যাট কিনলে যা হ্যাপা ওরাই সামলাত।
জমিটা কিনতেই হল।অনেকগুলো টাকা বায়না করা ছিল,না কিনলে টাকাটা বরবাদ হয়ে যাবে ।
পুলকের ভাগ্য ভালো সেই সময় এমন ধুন্ধুমার চারিদিকে যে,আগের লোকেদের তক্তা উলটে গেল।জমিতে ক্লাব করে,মদ খেয়ে,বোমা বিস্ফোরণ করে আর খেলু খেলু করতে পারবে না ছেলেপুলেরা।তাদের দাদারা এখন চেয়ার থেকে একেবারে পথে।
পুলক মুক্ত বাতাসে লোনের জন্য দরখাস্ত করল।লোন পাওয়ায় নানা হ্যাপা।কাগজপত্র তৈরি করে সময় নিলেও লোন পেল।
পঞ্জিকা দেখে দিন ঠিক করল ভিতপুজোর।জমিতে অনেক আগাছা জন্মেছে।ভিত পুজোর আগে সব পরিস্কার করতে হবে।
ছুটির দিন।দু’জন লোক লাগিয়ে আগাছা সাফ করাচ্ছিল সে।একটা ছেলে এসে সামনে দাঁড়াল।বলল,‘আগুনটা দিন তো।’
পুলক সবে সিগারেট ধরিয়েছিল।সে পকেট থেকে দেশলাই বের করে দিল। সিগারেট ধরিয়ে ছেলেটি দেশলাইট নিজের পকেটে রাখল।
পুলক হাত বাড়িয়ে বলল, ‘দেখি দেশলাইটা।’
‘থাক আমার কাছে।আপনি আর একটা কিনে নেবেন।’এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘এই যে লোক লাগিয়ে সব সাফ করছেন,কার পারমিশনে?’
‘পারমিশন নেব!কার?

‘আমার।এখানে যা কিছু হয় আমার পারমিশনে।আমি মন্টা।আপনি খোঁজখবর না নিয়েই কাজ শুরু করে দিলেন।এটা কি মগের মুলুক নাকি?’
এইসব কথার জম্পেস জবাব নাটক নভেলে হয়,কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভব না।সে কথা বলল না।
মন্টা বলল, ‘আমি যা বললাম, শুনলেন?’
‘শুনলাম।’
‘এবার জলদি একটা পাতি ছাড়ুন।’
‘মানে?’
‘মানে বুঝতে পারছেন না! ন্যাকা সাজছেন?’
পুলকের হাত উঠে যাচ্ছিল।কোনরকমে নিজেকে শান্ত রাখল।সে টারজানের গল্প পড়েছে,কিন্তু তার নাম টারজান না।বলল,‘আমার কাছে টাকা যা আছে ওদের দিতে হবে।’
‘ওদের পরে দেবেন।’
‘ওরা গরীব লোক।সারাদিন কাজের পরে টাকা পাবে না?’
‘এই যে মোশাই আপনি কি মাকু নাকি?ওসব মাকুগিরির জমানা খতম।এই অঞ্চলে গবাদার রাজ চলছে।কোনো খবর না নিয়ে হে হে করতে করতে আগাছা কাটতে চলে এলেন।শুনুন এখন সময় নেই,যাচ্ছি।এরপরে যেদিন আসবেন আমার খোঁজ করে পকেটে পাত্তি গুছিয়ে আসবেন।যা কথা হবে আমার সঙ্গে।এই মন্টার সঙ্গে।’
মন্টা চলে যাওয়ার পর আর একটা ছেলে এল।বলল,‘আমি ফন্টা।ওই হারামি মন্টাকে দেখলাম।ওর কথা শুনবেন না।আমার কথা না শুনলে আমি কিন্তু গবাদার কাছে রিপোর্ট করব।’
‘মন্টাও তো গবাদার নাম করল।এই গবাদাটা কে?’
‘আপনি গবাদাকে চেনেন না!গবাদা সাংঘাতিক লোক।সবাই গবাদাকে ভয় পায়।’
‘তবে আপনি আর মন্টা দুজনেই গবাদার লোক?’
‘হলেও,ওর গোষ্ঠী আলাদা।আমাদের অ্যালাকা দখল নিয়ে বহুত ঝামেলি আছে।ও ফালতু বাওয়াল করছে।বাড়ি তৈরি করার মাল মেটিরিয়াল সাপ্লাই নিয়ে যা কথা হবে আমার সঙ্গে।ভাগা দেবার সময় আমি ওর মতো গবাদাকে ঠকাই না।পুরো পঁচাত্তর ভাগ দিই।পরের দিন অ্যাডভান্স পকেটে রাখবেন।’ফন্টা চলে গেল।
পুলকের মনে হল ভয় পেয়ে আজে বাজে মালপত্র দিয়ে বাড়ি করলে দু’দিন বাদে পলেস্তারা খসে যাবে।তখন? সে গবাদার কাছেই যাবে ঠিক করল।যা থাকে কপালে।
অনেক লোকের মধ্যে বসে গবাদাকে দেখছিল পুলক।গবাদা হাসলে দু’টো গাল উপরে উঠে যায়।কপাল নিচে নেমে আসে।ফলে চোখ দু’টো ছোটো হয়ে যায়।বিশাল পেটটা নাচতে নাচতে চিবুকের দিকে রওনা দেয়।ছোটোরা এই অবস্থায় গবাদাকে দেখলে ভয় পাবে।পুলক ছোটো নয় তবু তার ভয়ে গা গুলিয়ে উঠল।

যে লোকেরা গবাদার কাছে এসেছিল তাদের মধ্যে একজন বলল,‘আমাদের এলাকায় বৃষ্টির পরে একমাস হল জল জমে আছে।লোকজন যাতায়াত করতে পারছে না।’
‘বৃষ্টি হলে জল জমবে না তো ক্ষীর জমবে?কোন এলাকা?’
‘বোষ্টোম পাড়া।’
‘ওখানকার লোককে খোল করতাল বাজাতে বল।ওদের আমি কেন দেখব?ওরা আমাদের দেখে?আমাদের এগেইনস্ট পাট্টিকে বল ওদের জল নামিয়ে রাস্তা করে দিতে।’
‘এটা কোনো কথা হল?’
‘আমার মুখের উপরে কথা!তোকে দলে থাকতে হবে না।এই কে আছিস ওকে বের করে দে।’
‘কাউকে ডাকতে হবে না।আমি নিজেই যাচ্ছি।এই চল।’ বলতেই লোকটির সঙ্গে অনেকে চলে গেল।
ঘর ফাঁকা হয়ে গেল।পুলক কী করবে বুঝে উঠতে পারছিল না।বাড়ি তৈরি করতে গেলে নন্টা ফন্টার পাল্লায় পড়লে চলবে না।সে দেওয়ালে টাঙনো তারামায়ের ছবির দিকে তাকিয়ে রইল।
গবাদা রাগে গুম হয়ে আছে।পুলককে দেখে বলল,‘এই তুই কে?তোর এখানে কী দরকার?
ঘাবড়ে গিয়ে পুলক বলল,‘আপনি তারামায়ের ভক্ত?’
‘তো।তাতে কী হল।’
‘আমিও তারামায়ের ভক্ত।’
গবাদা হাসল।বলল,‘জয় মা।জয় জয় মা।মা ছাড়া আর কে আছে বল?’
পুলক বলল,‘ঠিকই তো,ঠিকই তো।তারামায়ের ভক্তরা খুব ভালো মানুষ হয়।আপনার মতো।কিন্তু…’কথা শেষ না করে পুলক থেমে গেল।
‘কিন্তু মানে?’গবাদা খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল।বলল,‘কিন্তু মানে কি? কি বলতে চাইছিস?’
পুলক বলল,‘বলতে ভয় করছে।’
‘ভয়!আমি তো আছি।তাহলে কিসের ভয়?বল।’
‘ওদের কথা শুনে আপনাকে ভয় পাচ্ছিলাম।এখন দেখলাম,আপনি খুব ভালো মানুষ।’
‘ওরা কারা?নিশ্চয়ই আমার বিরোধী দলের লোক।ওদের কাজই আমাকে নিয়ে আলতু ফালতু বকে বদনাম করা।একটাকেও চিনিস তুই?’
‘চিনতাম না।আজই চিনলাম।আপনার নাম করে আমাকে ভয় দেখিয়েছে।ওরা আপনারই লোক।’
‘আমার লোক?ওদের নাম জানিস?’
‘হ্যাঁ। মন্টা আর ফন্টা।’
‘তোকে ভয় দেখাল কেন?’

শুরু থেকে তুই তোকারি করে কথা বলছে গবাদা।লোকটা নিজেকে কী মনে করে!পুলকের শুনতে ভালো লাগছে না।কিছু করার নেই।সে উত্তেজিত হলে আসল কাজটাই মাটি হয়ে যাবে।
ভিতপুজোও হবে না,বাড়ি তো হবেই না।বলল,‘আমি বাড়ি করব বুঝতে পেরে বলেছে গবাদাকে ভাগা দিতে হয়।মালপত্র ওদের কাছ থেকে কিনতে হবে।’
‘ওরা এই কথা বলেছে?’
‘হ্যাঁ।আমার মনে হয় আপনার বদনাম করতে বিরোধী দলের লোকেদের দরকার হয় না।আপনার নিজের লোকেরাই এই কাজটা ভালো পারে।অথচ আপনার মতো ভালো মানুষ।’
‘এই।’ধমকে উঠল গবাদা।‘সেই থেকে ভালো মানুষ ভালো মানুষ করে যাচ্ছিস।ইয়ারকি হচ্ছে? কে বলেছে তোকে যে আমি ভালো মানুষ?’
‘কেউ বলেনি।’ঘাবড়ে গিয়ে বলল পুলক।‘আমি জানি তারামায়ের ভক্ত কখনও খারাপ হয় না।আপনার সঙ্গে তো আমার আজই আলাপ।একটু আগে চিনতেনও না,অথচ কেমন তুই তুই করে কথা বলে আপন করে নিয়েছেন।একজন সরল সাধাসিধা সাধক ভালো মানুষ না হলে কেউ এভাবে কথা বলতে পারে?’
পুলক দেওয়ালে একটা ছবির দিকে তাকিয়ে জোড় হাত করে প্রণাম করল।সেদিকে তাকিয়ে গবাদা বলল, ‘ওটা কি হল?কাকে প্রণাম করলি জানিস?’
‘উনি নিশ্চয়ই আপনার মা।’আন্দাজেই বলল পুলক।
গবাদা দু’গাল ভরে হাসল।‘তুই ঠিকই বলেছিস।’পুলককে চুপ করে বসে থাকতে দেখে বলল, ‘বল, কিছু বলবি?’
পুলক বলল,‘একটা কথা…’
‘বল।অত কিন্তু কিন্তু করছিস কেন?’
‘ভাবছি আপনি যখন ছোটো ছিলেন তখন আপনার মা আপনাকে কোলে নিত।আদর করত।’
চোখ মুখের চেহারা বদলে গেল গবাদার।হাসি সমস্ত শরীরে ছড়িয়ে পড়ে ঝক ঝক করছে চেহারা। পুলক বলল,‘তখন আপনার মা ভেবেছে আপনি মানুষের মতো মানুষ হবেন।এটা নিশ্চয়ই ভাবেনি যে আপনি বড়ো হলে সবাই আপনার নাম করে বালি,কয়লা,মদ পাচার করবে।কাটমানি খাবে।বোমাবাজি করে ভয় দেখিয়ে টাকা তুলবে।যারা এলাকায় বাড়ি বানাবে তাদের জোর করে বাজে মালপত্র সাপ্লাই করবে।এতে তো আপনার বদনাম হচ্ছে।সামনে সবাই আপনাকে ভয় পাচ্ছে।অথচ আড়ালে গালাগালি দিচ্ছে।’
কিছুতেই থামতে পারছে না পুলক।বলল,‘আপনার মা থাকলে এসব দেখে শুনে কত কষ্ট পেত।’
পুলকের কথা শুনে গবাদা বলল,‘আমাকে কেউ এক গ্লাস জল দে রে।’

জল এল।জল খেয়ে গবাদা উঠল।দু’পাশ থেকে দু’জন ধরে আছে।
পুলক বলল,‘আমি যে কথা বলতে চাইছিলাম তা তো আপনার ভয়ে বলা হল না।’
পুলকের মনে হল গবাদার দু’চোখে যেন ভয় ঘুমের মতো জড়িয়ে আসছে।
বলল,‘আপনি যান।বাড়ির কাজে নিশ্চিন্তে হাত দিন।ভয় নেই।আপনাকে কেউ কিছু বলবে না।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।