ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে আমার বেশকিছু পরিচিত মানুষ আছেন। তাদের কেউ আত্মীয়, কেউবা বন্ধু। একটা সময় ছিল যখনই সুযোগ পেতাম সেখানে যেতাম। বহু বছর যাওয়া হয় না। এখন যোগাযোগহীন যে বন্ধুরা অন্য রাজ্যে ও বিদেশে তারা এই রাজ্যে তাদের যেমন যোগ্যতা তেমন চাকরি পায়নি। যারা পেয়েছিল প্রায় চল্লিশ বছর আগে তারা চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল এখান থেকে।
এখানে তখন এক অদ্ভুত পরিবেশ। একটার পর একটা অফিস-কারখানা আন্দোলনের ফলে বন্ধ হতে শুরু করেছে। এক একটা কলকারখানায় আন্দোলনের নতুন পদ্ধতি শুরু হয়েছিল। কাজ বন্ধ করে দেওয়া। কলকারখানায় ধর্মঘট করে তালা ঝুলিয়ে পতাকা উড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে বেশ উত্তেজনা ছিল। এর সঙ্গে ছিল ঘেরাও।
আমরা চিরকালই হুজুগে। তখন সেই আন্দোলনের সংস্কৃতিতে শামিল হয়েছিল অনেকেই। বুঝতে পারেনি যে, লেজে আগুন লাগলে একসময় তা সমস্ত শরীরকে পুড়িয়ে দেবে। আমরা তো হনুমানের মতো দৈব শক্তির অধিকার অর্জন করিনি, তাই ওই আগুন নেভানোর কৌশল জানা ছিল না। থাকার কথাও নয়।
ফলটা এখন সব অর্থেই বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে। ওই সময় অনেকেই ইচ্ছে না থাকলেও চাকরি নিয়ে অন্য রাজ্যে বা বিদেশে যেতে বাধ্য হয়েছে। বাড়ি বা জমি ফেলে রেখে যাওয়ারও সমস্যা ছিল। পড়ে থাকলে তা দখল করে ক্লাব বানানো তখন রেওয়াজ হয়ে গিয়েছিল। একটার পর একটা কারখানা বন্ধ করিয়ে মালিককে রাজ্য ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। ফেলে যাওয়া জায়গায় আগাছা জন্মেছে। সেখানে গড়ে উঠেছে সমাজবিরোধীদের আড্ডা।
কেউ যেমন সমাজবিরোধী হয়ে জন্মায় না, তেমন সবাই অসাধারণ মেধা নিয়েও নয়। যখন স্কুল কলেজের পরে রোজগারের জগতে পা রাখতে যাওয়া হল দেখা গেল সামনে অন্ধকার ভবিষ্যৎ। এর জন্য কে দায়ী। কেন্দ্র।
এই ধারণা বহুবছর ধরেই আমাদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। যা ঐতিহ্যের মতো এখনও আমরা বহন করে চলেছি। ফলে ছেলেপুলেদের যোগ্য মর্যদার রোজগার না দিতে পেরে বরং তাদের উসকে বিপ্লবী তৈরি করা হয়েছে। এই বিপ্লব বোঝানোর জন্য বিদেশ থেকে মতবাদের চারা এনে সেটাকে বিশাল বৃক্ষ করে তার ছায়ায় বসানো হয়েছে জমাটি আড্ডা। তৈরি করা হয়েছে যেন এক একটি রোবট। যা বোঝানো হচ্ছে তাই বুঝতে হচ্ছে তাদের। এছাড়া উপায় তো নেই। এভাবেই অপেক্ষা। যদি জুটে যায় নিশ্চিন্ত বাসস্থান,খাওয়া, পোশাক। অতএব কল্পিত শত্রু থাক না কয়েকশো মাইল দূরে। শুরু হোক এখানে চাক্কা জ্যাম। ভেঙে দাও। গুড়িয়ে দাও। সবেতেই চলছে না চলবে না।
ফল যে একেবারে কিছু হল না তা নয়। এই ভাবে ভোট পাওয়া গেল। চেয়ার দখল করে সর্বহারার নেতা হওয়া গেল। যা কিছু ভোগ করার বাসনা সব হাতের মুঠোয় নিয়ে তখন অনেক উল্লাস। অনেক কেতা।
তাই বলে ব্যতিক্রম কি কিছুই নেই? ছিল। এখনও আছে। তাঁদের সংখ্যা খুবই অল্প হলেও ভালো করে বুঝতে পারলে মনে শ্রদ্ধা জাগে। তাঁরা ঢাকা পড়ে গেলেন।
এরই মধ্যে যারা লেখাপড়া করছে তারা এখানে তাদের উপযুক্ত চাকরি খুঁজে চলে গেছে অন্য রাজ্যে। যারা আরও উচ্চ শিক্ষিত তারা বিদেশে। একটার পর একটা ঘর খালি হয়ে গেছে। বাড়ির ছেলে-মেয়েরা কাছে নেই। কষ্ট আছে। মনে রয়েছে যন্ত্রণা তবু মেনে নিয়েছে বৃদ্ধ বাবা বৃদ্ধা মা।
তাঁরা মনে করেছেন আমরা আর ক’দিন। ওরা যেখানে আছে ভাল থাক।
ইদানিং ভালো থাকায় বাদ সেধেছে ‘বহিরাগত’ শব্দটি। কিছুদিন ধরে যত বেশি উচ্চারিত হয়েছে তার সঙ্গে ছড়ানো হয়েছে কথার বিষ।
সেই বিষের বাতাস হাওয়ায় ভর করে হাজির হয়েছে বিভিন্ন রাজ্যে। বিদেশেও।
পরিচিত অনেকের ভয় তারা যে যেখানে আছে সেখানকার লোক যদি তাদের কোনো একদিন বহিরাগত বলে! যদি বলে বহিরাগতদের এখানে স্থান নেই তাহলে কি উপায় হবে?
যে দেশকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত করবার জন্য একদিন প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন লক্ষ লক্ষ স্বাধীনতা সংগ্রামী সেই দেশে যে ঘরের ছেলেরা থাকতে পারবে না চলে যেতে হবে বিদেশে এটা তো তাঁরা কখোনো ভাবেননি। শোনা যায় আগে পশ্চিমবঙ্গ যা ভাবত তা পরে ভাবত অন্য রাজ্যগুলি। এখন তো সেই ঘর ছেড়ে বাস করতে হয়েছে অন্যত্র। এখন অনেকেই বড়ো ভাবনা ভাবে।
পরিস্থিতি এখন এমন হয়েছে যে আমাদের গর্বের জায়গাগুলিকে হাস্যকর জায়গায় নিয়ে হাজির করেছি।
এখনকার শিক্ষিত ছেলে-মেয়েরা অনেক বাস্তববাদী। তারা কারও কথায় ভোলে না। আবেগ দিয়ে নয়, বুদ্ধি দিয়ে বিচার করে সব।
এই বহিরাগত শব্দটি ইদানীং সামান্য হলেও তাদের বিচলিত করেছে। এই শব্দটি সন্ত্রাসের মতো কাজ করছে তাদের মানসিকতায়। এর কোনো অর্থ খুঁজে পাচ্ছে না তারা। একটা শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। তারা যেখানে থাকে তা দেশের অন্য রাজ্যেই হোক বা বিদেশে সেখানে যদি একদিন বহিরাগত বলে আঙুল তুলে কেউ চিহ্নিত করে! তাহলে? তখন যাবে কোথায়।
দেশে বা নিজের রাজ্যে ফিরলে নিজের যোগ্যতায় যে কাজ পাওয়া উচিত তা কি পাওয়া যাবে? না পেলে কি অধিকারের জন্য ভাইরাস কবলিত শহরে শীতের রাতে অনশন করে রাস্তায় শুয়ে থাকতে হবে। না ডোল পাওয়ার জন্য চাটুকার হতে হবে! আরও নানাবিধ প্রশ্ন উঠে আসে মনে।
এদিকে মুখে বহিরাগত বললেও নির্বাচনে জেতার কৌশল জানবার জন্য তো সেই বহিরাগতকেই খাতির করে এনে শ্রেষ্ঠ আসন দেওয়া হয়েছে। যাদের ছবিতে দেখা গেছে হাত পেতে টাকা নিতে তাদের মহাপুরুষ করে তুলবার জন্য তো প্রয়োজন হয়েছে বহিরাগত আইনজীবীদেরই। তবে?
করোনা ভাইরাস এই সময়ে এক মহাযন্ত্রণা। বার বার তার রূপ বদলে যাচ্ছে। তার চেয়েও যেন আরও ভয়ংকর এহেন শব্দসন্ত্রাস। মানুষের বেঁচে থাকা বা টিকে থাকা যে কীভাবে রক্ষা পাবে তার বিকল্প পথও অজানা।