T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায়

প্রোটিন নাই

ভুটাই কিছুতেই স্কুলমুখো হবে না। বাবা বলে, মা বলে, ঠাকমা বলে কে শোনে ওসব কথা। সে উঠোনময় ও আদারে বাদাড়ে ছুটে বেড়ায়। মাঝে মাঝে এসে ঢুকে পড়ে রান্নাঘরে। হাতের কাছে যা পায় সেটা নিয়ে মুখে দিয়ে আবার ছুট। মা মেজাজ তিরিক্ষি করে চিৎকার করতে থাকে। ‘আমার সব রান্না গোল্লায় দিল রে। হাত ধোয়া নাই। কোথায় কিসে হাত দিছে কে জানে। হাত না ধুইয়া রান্নায় হাত। এ ছেলেরে নিয়া আমার হইছে জ্বালা।’
কথাটা কানে যায় ভুটাইয়ের ঠাকমার। বলে, ‘কি আর নেওনের আছে, ঐ তো ছাতার কলমি শাক ভাজা। তা দিতে তোমার পরাণডা বাইরইয়া যায়! পোলাডার জন্য তো একটু আলাদা কইরা রাখলেই পারো।’
‘এমন কথা কন য্যান কলমি শাক ভাজা মন খানেক রাইন্ধা রাখছি। হাতে খাবে পাতে খাবে। এডা য্যান মোচ্ছবের বাড়ি।’
ভুটাইয়ের ঠাকমা কোনো কথা বলে না। জানে কথা বললেই তা লম্বা হতে থাকবে। সকাল বেলায় বুড়ি একটা ঝুড়ি নিয়ে বেরোয় রোজ। তাতে বিশেষ লাভ হয় না। এখন কলমি শাকও মাগনায় মেলে না। সবাই যে যার নিজের টুকরো জমির যা শাকপাতা তা আগলে রাখে। আসো জন, বসো জন সঙ্গে শাকপাতা এটা ওটা ঝুড়ি ভর্তি করে তোল তারপর চা খাও বাড়ি যাও এসব চল এখন উঠে গেছে। বিলিয়ে দিলে নিজেরও যে চলে না। সবারই এখন অল্প বিস্তর একই অবস্থা।
ফলে ভুটাইয়ের ঠাকমা বাড়ি ছেড়ে, হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় অনেক দূর। তাতে কি আর যা চায় সব জোটে। সামান্য জল জমে থাকা ফাঁকা মাঠে গরু ছাগলও নেমে যায়। ওদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কিছু পাওয়া সহজ হয় না।
আগে তবু এদিক ওদিক গেলে কেউ একটা মোচা হাতে দিয়ে বলত, ‘নিয়া যাও গাছে এত মোচা হইছে যে এবার খাইয়া মনের সাধ মিটছে।’ থোড় দিত। একবার তো মল্লিকের বাড়ি থেকে দু’টো ডিম দিল। বলল, ‘ভুটাইকে দিও।’ বহুদিন হল এখন আর কেউ কিছু দেয় না। বাড়ির গাছে কিছু হলে কড়া নজরে রাখে। উপযুক্ত সময় বাজারে বিক্রি করে দেয়। নগদ পয়সা হাতে রাখে।
ভুটাইয়ের বাবার রোজ কাজ থাকে না। একটা কাজ পাওয়ার জন্য কত যে হাত কচলাতে হয় মাতব্বদের কাছে। এখন সব বাবু হয়েছে। আগে এই বাবুরা একটা বিড়ির মুখে তিনবার আগুন দিত। এখন লম্বা সিগারেট। লড়ঝড়ে সাইকেল ছেড়ে মোটর সাইকেল। হাতে মচমচে টাকা। কোথা থেকে যে কি হল সব যেন ভোজবাজির মতো। শুধু কি দু’চাকা? চার চাকাও আছে অনেকের। সেইসব কিভাবে যে হয় তা বোঝে না ভুটাইয়ের বাপ।
গ্রামের স্কুলে যখন পড়ত তখন মাস্টারমশাই বলত ভালোমানুষ হতে। সেই ভালোমানুষ হতে যাওয়ায় এখন মনে হয় সে ডাহা ঠকে গেছে। মাঝে মাঝে ভাবে কেন যে সে মাস্টারমশাইয়ের কথা শুনে ভালোমানুষ হবার চেষ্টা করতে গেল। যদিও তার এমন চেষ্টা দেখে বাবা খুব খুশি ছিল। সেই বাবাও বেশিদিন রইল না। অতি পরিশ্রমে এমন রোগে পড়ল যে হাসপাতালের মেঝেতে কিছুদিন থেকে তারপর হাতে পায়ে ধরে কোনরকমে একটা বেডে ওঠার সুযোগ পেয়ে গেলেও বাড়ি ফিরল না।
সব দায় তখন ভুটাইয়ের বাবার। যেটুকু সঞ্চয় ছিল বাবার রোগ সারাতে গিয়ে ফতুর। একদিন যাদের বন্ধুর মতো তুই তোকারি করে কথা বলত এখন তাদের আপনি আজ্ঞে করতে হয়। তারা সারাক্ষণই গাড়িতে নয়ত সভা সমিতিতে। সেখানে কথা বলতে গেলে না চেনার ভান করে। মিছিল থাকলে ভুটাইয়ের বাপকে ডাকে। মাঝে মাঝে যেতে হয়, না হলে যেটুকু কাজ জোটে সেটাও জুটবে না। মিছিলে ওরা যখন অন্য দলের লোকজনদের হাত পা ভেঙে দেবার কথা বলে তখন ভাল্লাগে না। ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার কথা বলে। কোথাও মানুষকে ঘরে আটকে রেখে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে এমন কথা সে শুনেছে। যা সব শুরু হয়েছে ভয় হয় এই বুঝি কোথাও নতুন করে আগুন জ্বলে উঠল।
মজুরি দেওয়ার সময় যখন টাকা কাটাকুটির খেলা হয় তখন তার মনে মোটেও খুশি আসে না। ৩৬৫ দিনে বছর, মাত্র কতদিনের কাজ পায় সবাই। বাকি দিনগুলি তাহলে সবার চলবে কি করে? যা পায় তাই যদি যথেষ্ট হয় তাহলে তোমাদের ভাই এত রমরমা হচ্ছে কি করে? প্রাসাদের মতো বাড়ি, গাড়ি এতসব তোমরা পাও কোন পথে? বমির মতো প্রশ্নগুলি গলার কাছে ঠেলে এলেও উগরে দিতে পারে না।
যারা টাকা দেয় তারা মুখ দেখে মনে হয় বুঝতে পারে মনের কথা। বলে, ‘এই শোন থোপনাটাকে যদি তালের বড়া করে রাখিস তবে কাজ চাইতে আসিস না। অন্য কোথাও যা।’
ভুটাইয়ের বাপ ভাবে একসময় ওদের সঙ্গে গুলি খেলত, রাবারের বলে লাথি মারত, ভোকাট্টা ঘুড়ি ধরবার জন্য ছুটত সবাই একসঙ্গে। এখন সব তালেবড় হয়ে গেছে। এত কামানেওয়ালা সব কামাতে কামাতে দেশটাকে তো ন্যাড়া করে দেবে!
উপায় থাকলে সে এদের কাছে আসতই না। না এসেও পারে না। তাকে রেশন নিতে হয়। জল সংগ্রহ করতে হয়। সবার মতো ঘরে একটু আলোর প্রয়োজন। সবকিছুই তো এরা নিজেদের বাপের সম্পত্তি করে রেখেছে। বেঁচে থাকাটাই ঝকমারি। মা, বউ,বাচ্চার জন্য তাকে অনেকটাই মাথা নুইয়ে চলতে হয়। বাবার কেনা এক টুকরো জমি ছেড়ে দিয়ে কোথায় যাবে সে! সেখানে গেলেও যে সব মিলবে, মানুষের মতো বাঁচতে পারবে তার তো ঠিক ঠিকানা নেই।
এসব নিয়ে ভাবতে ভাবতে মাথাটা চক্কর খায়। যেদিন টাকা পয়সা একটু বেশি জোটে সেদিন যেন উৎসবের মাঠ হয়ে যায় মগজটা। স্বপ্নের ঘোরে বলে, মা তোমাকে আর সকালে উঠে ঝুড়ি হাতে হেথা হোথা ঘুরতে হবে না। ভুটাইয়ের মা, এবার থেকে তোমার খুশি মতো ভালো ভালো পদ রান্না করে দেবে সবার পাতে। কথা তো চালাচালি হচ্ছে যদি বাড়ি বানাবার টাকাটা এসে যায়। জোচ্চোরের হাতের ফলার যেমন ভাবে পাওয়া যায় নিতে তো হবে। বর্ষা বাদল শীতে বড়ো কষ্ট। কিছু টাকা হাঙরদের দিতে হবে। কি আর করা যাবে। দেবে।
ভুটাইয়ের মাকে বলে, ‘একটু হাসি হাসি মুখ করে থাকো দেখি। দেখবে একদিন এমন দুঃখ থাকবে না।’
ভুটাইকে সামনে পেয়ে কোলে বসিয়ে জাপটে ধরে। বলে, ‘আমার ভুটাই স্কুলে যাবে। লেখাপড়া শিখবে। বড়ো হবে চাকরি করবে। তখন আর আমাদের কোনো কষ্ট থাকবে না।’
ভুটাইয়ের বাবার কথা শুনে ঠাকমা কপাল চাপড়ায়। ‘হায় ভগবান বাপের কত আশা। পোলাডা যদি একটু বুঝতো। সারাদিন টই টই। পড়ার বই নিয়া তো বসেই না।’
ভুটাইয়ের মা আড়ালে মুখ ভেঙায়। বলে, ‘ও ছেলে স্কুলে যাবে না ঘোড়ার ডিম। সারাদিন নিজে তো টো টো কইরা ঘুইরা বেড়াও একবারও কি ভাবো যে পোলাডারে স্কুলে পাঠাইতে হইবে। হে তো বইয়ের কাছেই যায় না। মনে হয় বই য্যান শত্তুর।’
এইসব কথার মাঝে ভুটাই তার বাবার কোল থেকে ছিটকে চলে যায়। দূরে গিয়ে বলে, ‘আমি স্কুলে যামু না। স্কুলে যাইতে ভাল্লাগে না।’
মা বলে, ‘যাবি না তো করবিডা কি সারাদিন? টো টো কইরা ঘুইরা বেড়াবি? মুখ্যু মাইনষের কোথাও জায়গা হইবে না। আর বাবার মতো মুখচোরা হইলে তো কথাই নাই। জীবনে কিছু করতে পারবি না। হের তো তবু একটু কালির আঁচড় আছে। তাতেও কোনো কাম হইতাছে? লোকের কাছে গিয়া মিন মিন কইরা কিছু কইলে হ্যারা দুর্বল ভাবে। তর যে কি হইবে ভগায় জানে!’
ভুটাইয়ের বাবা ভাবে বউ কথাডা তো মিথ্যা বলে না। আসলে সে কোনো কম্মের না। দেশে কয়লা, বালি মাটি সবই তো আছে তা দিয়ে ইধার কা মাল উধার করে কত লোকজন কতকিছু করল। এসব সে শুনতে পায়। ভাবে এই দেশের মাটি তো কারও বাপের কেনা নয়। তাই দিয়ে যদি অন্যেরা কোটি কোটি টাকা করতে পারে তবে তার দেশের মাটি, বালি দিয়ে সে কেন কয়েকটা মাত্র টাকা করতে পারবে না! তার তো বেশি টাকার দরকার নেই। সামান্য পেলেই হবে যা দিয়ে মা একটু ভালো থাকবে। বউয়ের মুখে হাসি ফুটবে। ছেলেটা লেখাপড়া শিখবে।
তার এই ভাবনার মধ্যেই ভুটাই একটা লাট্টুতে লেত্তি জড়িয়ে ঘরের মধ্যে ছেড়ে দেয়। সেটা বন বন করে ঘুরতে থাকে। মনে মনে রাগ হলেও সে উঠে ভুটাইকে খপ করে ধরে ফেলে। কোলে বসিয়ে বলে , ‘স্কুলে যাইতে তোর ভাল্লাগে না ক্যান?’
‘ওইহানে শুধু পড়তে কয়। পড়া না পাড়লে নাকি মারে।’
মা বলে, ‘তর মাথা । স্কুলে গেলে যে খাইতে দ্যায়। হেইয়া তো জানো না।’
ভুটাইয়ের চোখে যেন আলো জ্বলে ওঠে। বলে, ‘খাইতে দ্যায়?’
‘শুধু কি খাইতে দ্যায়! জামা দ্যায়, প্যান্ট দ্যায়, জুতা দ্যায়।’ মা এসে বসে ভুটাইয়ের কাছে। ঠাকমাও গুটি গুটি চলে আসে। বলে, ‘খাওন কি আর যেমন তেমন? ভাত দেয় ডাইল দ্যায়। ডিম দ্যায়।’
মা বলল, ‘মাছ, মাংসও নাকি দ্যায় শুনছি।’
‘তোমরা তো আমারে এতদিন এইসব কিছু কও নাই।’ অভিমান হয় ভুটাইয়ের।
‘তরে এতসব কইয়া হইবে কি? স্কুলে যাওনের কথা শুনলে তো তর গায়ে জ্বর আসে।’
ভুটাই কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ চিৎকার করে লাফিয়ে ওঠে, ‘আমি স্কুলে যামু।’
ভুটাইয়ের এই কথায় যেন সাড়া পড়ে যায় ওর মা আর ঠাকমার মধ্যে। কি করবে তারা বুঝে উঠতে পারে না। মা ভুটাইয়ের বাবার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তোমার মধ্যে তো কোনো হেলদোল নাই দ্যাখতাছি। ভুটাই কি কইল শোনলা?’
মিটি মিটি হাসে ভুটাইয়ের বাবা। বলে, ‘সাধে কি আর আমি পোলাডারে জাপটাইয়া ধইরা রাখছি? আইজ হেডমাস্টরের লগে সব কথা কইয়া আইছি। কাইলই আমি অরে নিয়া স্কুলে যামু।’
ভুটাই বলল, ‘কাইল আমারে খাইতে দিবে।’
ঠাকমা বলে, ‘দিবে দিবে।’ কথাটা বলে হাসে। মা হাসে। বাবাও হেসে ফেলে।

ভুটাই স্কুলে যায়। তার জামা, প্যান্ট, জুতো, মোজা সব হয়েছে। রঙিন বই পেয়েছে। কত ছড়া। ছবিতে অঙ্ক। বই নিয়ে দু’বেলা বসে মায়ের কাছে। রোজ স্কুলে যায়। বাড়ি এসে খাওয়ার গল্প করে। পড়ার গল্প করে। ঠাকমা শোনে, মা শোনে। খুব আনন্দ হয় তাদের।
সবাই মিলে আলোচনা করে এইভাবে দেখতে দেখতে দিন চলে যাবে। ভুটাই বড় হবে চাকরি করবে আর তাদের কোনো কষ্ট থাকবে না।
একদিন ভুটাই এসে বলল সে আর কাল থেকে স্কুলে যাবে না। শুনে মায়ের মাথায় যেন বাজ পড়ল। ঠাকমা বলল, ‘মাথার ক্যারা পোকাডা কি আবার নাচানাচি শুরু করল পোলাডার? কয় কি যত অনাছিষ্টি কথা।’
সবাই মিলে স্কুলে যাওয়ার জন্য যতই বোঝায় ভুটাইয়ের ওই এক কথা সে স্কুলে যাবে না।
মা বলল, ‘তা যাবি ক্যান ওহানে গ্যালে যে ভালো খাবার খাইতে পাস তা সহ্য হইতাছে না। ঘরে আইয়া ডাইলের জল আর কলমি শাক ভাজা খাইলে মন ভরবো।’
ভুটাই বলল, ‘ভালো খাবার না ছাই। একদিন স্কুলের ডাইলে মরা ইন্দুর ভাইসা ওঠছে। আমি দেখছি। অনেকে দেখছে। ভাগ্যিস দেখছিলাম, না হইলে তো হেইয়াই খাইতাম। জানতেও পারতাম না।’
‘একদিন কি হইছে , না হইছে অমনে তুই স্কুলে যাবি না?’
‘একদিন টিকটিকি ছিল খিচুরিতে। পবন দেইখা চিল্লামিল্লি শুরু করল। যারা রান্ধে ওরে সবাই মিলা বকল। অর কি দোষ? যেহানে রান্না করে ওহানে আরশুলা, কেঁচো আরো কত কি ঘুইরা বেড়ায়। কহন কি পড়ে আমরা দেহি? যা দেয় খাইয়া নেই। দেইখ্যা আমার কেমন ঘেন্না লাগতাছে। আমি স্কুলে যামু না কইছি, যামুই না।’
ভুটাইয়ের বাবার কানে আসে অনেক কথা। চায়ের দোকানে ফিস ফিস করে হলেও লোকজন আলোচনা করে। স্কুলগুলির অবস্থা খুবই খারাপ। মাস্টার দিদিমনি নেই। খাবার দেয় বটে তবে যা দেওয়ার কথা তা দেওয়া হয় না। ভিতরে অনেক কারচুপি। বাচ্চাদের মুখের খাবারও চুরি হয়ে যায়।
ভুটাই বড়ো হবে আরও উঁচু ক্লাসে পড়বে এসব ভেবে আগে আনন্দ হত। চারিদিক থেকে যা শুনতে হচ্ছে তাতে ভুটাইয়ের বাবার মনে হয়, ছেলে বড়ো হয়ে কি লাভ হবে? কার কাছ থেকে আর কি শিখবে ছেলে। যাদের শেখাবার কথা তারা সবাই তো জেলের ভাত খাচ্ছে। স্কুলগুলিতে মাস্টার নেই। সেখানে সন্ধ্যা হলেই মদ মোচ্ছব শুরু হয়। এসব একটু একটু করে বাড়বে। ভুটাই যখন বড়ো হবে এভাবে চললে সবটাই তখন নরক। এই নরক থেকেই টাকাখেকোরা টাকা মেরে তাদের সিন্দুকে জমা করবে। ভুটাই চাকরি চাইতে গেলে হয়ত পুলিশ ওকে চ্যাংদোলা করে ভ্যানে তুলবে।
বাড়িতে ঢুকতেই ভুটাইয়ের মা কান্না ভেজা গলায় বলল, ‘জানো ভুটাই কইতাছে ও আর স্কুলে যাইবো না। ওহানে নাকি খাবারে ইন্দুর, টিকটিকি, আরশুলা দ্যাখছে। অর ঘেন্না করে।’
‘ভুটাই কই?’ ভুটাইয়ের বাবা দেখল ছেলেটা থম মেরে বসে আছে। আজ পড়ায় যেমন আগ্রহ নেই তেমন খেলাতেও না। বলল, ‘কি হইছে তর?’
ভুটাই কোনো কথা বলল না।
ভুটাইয়ের বাবা বলল, ‘শোনলাম তুই নাকি স্কুলে যাবি না কইছো। খাবারে যা পাইছো ওগুলা কি জানো?’
‘কি?’ ভুটাই জানতে চায়।
ভুটাইকে যেভাবেই হোক স্কুলে পাঠাতেই হবে। সব রসাতলে গেলেও কালির আঁচড়ের দাম আছে। তা চিরকাল থাকবে। বলল, ‘ওগুলা হইতাছে প্রোটিন। প্রোটিন খাইলে শরীর ভালো থাকে। বুদ্ধি হয়।’
‘আমার যে ঘেন্না লাগে।’
ভুটাইয়ের বাবা ভাবে এইসময় বেঁচে থাকাটাই তো ঘেন্নার। তারও কি ঘেন্না পায় না? তার তো উচিত ছিল ঘেন্নায় রেল লাইনে গলা দেওয়ার। কত যে পিছুটান তার। এই পিছুটানের জন্য সে ঘাড় কাত করে দাঁত কেলিয়ে বেঁচে আছে। বলল, ‘ঘেন্না করলে চলবে? অসুখ করলে ওষুধ খাইস না? ওষুধ তো তিতা। তবু তো খাইস। অসুখ তহন সাইরা যায়। এডাও ওই রকম।’
‘যদি ওগুলা প্রোটিন হয় তাইলে আমি স্কুলে যামু।’ ভুটাই বই খাতা নিয়ে আসে। মায়ের কাছে যায়। ভুটাইকে পড়াতে গিয়ে ওর মায়ের চোখে জল এসে যায়।
ক’দিন ধরে ভুটাইয়ের বাবা শুনতে পাচ্ছিল স্কুলগুলি ঠিক মতো চলছে কি না এসব দেখতে উচ্চ পদের লোকজন আসবে। তারা হিসেব দেখবে। বরাদ্দ টাকা ঠিক মতো খরচ হচ্ছে না ভোগে গেছে। ছেলেমেয়েদের খাবার ঠিক দেওয়া হচ্ছে? না সেখনেও ফাঁকি। ভুটাইয়ের বাবা মনে মনে ভাবে তাইলে বাপের ও বাপ আছে!
এসব নিয়ে এলাকার স্কুলগুলিতে নানা আয়োজন শুরু হয়েছে। এমন সুন্দর করে সব সাজাতে হবে যেন বাইরের লোকজন এসে কোনো ভুল ধরতে না পারে। যেন এটা বোঝে যে এভাবেই সারা বছর স্কুলগুলি চলে।
আয়োজন ভুটাইয়ের বাড়িতেও। জামা,প্যান্ট পরিস্কার করে রাখা আছে। ভুটাইয়ের বাবা ওর ছোট্টো জুতো জোড়াকে সাফ করে। ঠাকমা মাথা আঁচড়ে দেয়। মা বই গুছিয়ে ব্যাগে ভরে দেয়। ভুটাই ছটফট করে স্কুলে যাবার জন্য।

কী সুন্দর করে সাজানো হয়েছে স্কুলটাকে। মাস্টারমশাই, দিদিমনি সবাইকে সুন্দর দেখাচ্ছে। ভুটাইয়ের জুতোয় একটু ধুলো লেগেছিল। সেটা মুছে হাত ভালো করে ধুয়ে নিল ভুটাই। যারা রান্না করে তাদের চিনতেই পারা যাচ্ছে না। মুখ আটকে মাথায় টুপি পরে কেমন সুন্দর সেজেছে তারা।
সবার সঙ্গে লাইনে দাঁড়াল ভুটাই। গান শুরু হয়েছে। অন্যদিনের মতো সবার সঙ্গে গলা মেলাল সে। … এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, ও সে সকল দেশের রানি সে যে –আমার জন্মভূমি…।
আজ যেন স্কুলটা কেমন অচেনা। অন্যদিনের মতো নয়। কেউ পড়ার জন্য তাড়া দিচ্ছে না। ভুটাই হাঁটতে হাঁটতে যেখানে রান্না হচ্ছে সেখানে গেল। সবকিছু পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। খাবার যা তৈরি করা হয়েছে সব সুন্দর করে ঢাকা দেওয়া। উপরে তেরপল টাঙানো। হেডমাস্টার এসে খাবারগুলি দেখতে চাইল। রান্না করে যারা তার ঢাকা তুলে দেখাল। ভুটাই দেখল কী সুন্দর রঙ। টমেটোর চাটনিও হয়েছে।
চারিদিকে একটা সাজো সাজো অবস্থা। কিছুই শুরু হচ্ছে না। সবাই যেন অপেক্ষায় আছে। কেউ আসবে। তারপরই সবকিছু শুরু হবে। বরণডালা সাজানো হয়েছে। যারা আসবে তাদের বরণ করা হবে। ভুটাইয়ের মনে হল রোজ তো এমন হয় না!
কয়েকজন ছোটো বাচ্চা তাদের খিদে পেয়েছে বলায় খেতে বসানো হল। ভুটাই দেখল কত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে খেতে দেওয়া হচ্ছে। আজ মাছ, মাংস, ডিম, সন্দেশ সবই আছে। সেদিকে তাকিয়ে দেখে মন খারাপ হয়ে গেল ভুটাইয়ের। একজন দিদিমনি ভুটাইকে খেতে বসতে বলল।
ভুটাই কোনো কথা না বলে বাড়ির পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল।
বাড়ি যেতেই মা বলল, ‘স্কুল ছুটি হইয়া গেল? আইজ কি কি হইলরে স্কুলে?’
‘আগে আমারে খাইতে দাও।’
ভুটাইয়ের বাবা হাসতে হাসতে বলল, ‘আইজ তো তোগো স্কুলে এলাহি কারবার। বাইরে থিকা লোক আইয়া স্কুল দ্যাখবে কইয়া এমন রান্না হইতাছিল যে বাড়ি আইবার পথে গন্ধেই তো আমার অর্ধেক খাওয়া হইয়া গেল।’
ঠাকমা বলল, ‘তগো যত আজাইরা কথা। পোলাডা যে আইয়া খাইতে চাইল হেইয়া শুনছোনি?’
‘তাই তো! খাইতে চাইলি ক্যান? তুই স্কুলে খাস নাই?’ মা বলল।
‘না। খাই নাই।’
‘খাইস নাই মানে? বাবা বলল, ‘আইজ তো তোগো স্কুলে ভালো ভালো খাবার হইবে শুনলাম। তুই খাইস নাই ক্যান?’
‘খাইয়া লাভ কি? তুমি যে প্রোটিনের কথা কইছিলা, আইজকের কোনো খাবারেই তো সেই প্রোটিন নাই।’

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।