সাপ্তাহিক গল্প নেই-তে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় – ২৩

গল্প নেই – ২৩

বহুদিন আগের কথা। বাবা বাজার থেকে যখন বাড়ি এল তখন বাজারের ব্যাগ খালি। তা হলে কি বাবা বাজারে যাওয়ার সময় টাকা নিতে ভুলে গিয়েছিল? না শরীর খারাপ! তাহলে কি বাজারে যাওয়ার রাস্তায় জল জমে আছে? কিছু বুঝতে পারছি না। বাবা চুপ করে বসে আছে।
ইছাপুরে আমরা যেখানে থাকতাম সেখানে যতই বৃষ্টি হোক, বন্যা বা গঙ্গায় জোয়ার এলে জল জমত না। যদিও গঙ্গার জল বরতির বিল দিয়ে ঢুকে অনেক গ্রাম ভাসিয়ে দিত। এই বরতির বিলের সংস্কার নিয়ে তখন আনন্দবাজারের সাংবাদিক সুজন চন্দ একটা নিবন্ধ লিখেছিলেন। তাঁর কাছ থেকে অনেক তথ্য সংগ্রহ করে আমি রেডিওতে একটি কথিকা পাঠ করেছিলাম। তাতে যে সেই বিল সংস্কার হয়েছিল তা হয়ত নয়। তবে বুঝেছিলাম যে সংস্কার না হলে লোকজন দিনের পর দিন একই ধরণের সমস্যায় থাকবে।
সেইসময় ওই বরতির বিলের জলে আমাদের তখনকার বাসস্থান ইস্টল্যান্ড কোয়াটারের পেছনের অংশ ও অন্যান্য দিকে আনন্দমঠ, রামনগর, কল্যাণগড়, শান্তিনগর এইসব জায়গাগুলি জলে ডুবে থাকত। সেখানে যারা বসবাস করত তারা খুব প্রয়োজন না থাকলে কয়েকটা দিনের জন্য জল ঠেলে বাইরে বেরুত না। তখন পাকা বাড়ি ওই এলাকায় কয়েকটি মাত্র ছিল। তার মধ্যে কোনোটাই দোতলা না। সেই বাড়ির লোকজন সবাই আশ্রয় নিত চিলেকোঠায়। অন্যান্য বাড়িগুলোতে যারা থাকতে পারত না তারা আশ্রয় নিত স্থানীয় স্কুল বাড়িতে বা কলেজে।
গঙ্গার পাড়ে নবাবগঞ্জে, পার্ক এলাকা থেকে শুরু করে কন্টাধার ও আরও কয়েকটি অঞ্চলে যতই বৃষ্টি হোক বা বন্যা, জলযন্ত্রণা যে কী তা ওই অঞ্চলের যারা থাকত তারা কেউ বুঝতে পারত না।
সেবার এত বৃষ্টি হল যে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে যারা বানভাসি, তাদের ত্রাণ বিলি করতে হল। তখন কোথায় কী হচ্ছে এসব জানার মাধ্যম ছিল নির্দিষ্ট সময়ের রেডিওর সংবাদ আর খবরের কাগজ। সেই কাগজও জলে ভিজে এল কয়েকদিন বাদে। প্রথম পৃষ্ঠায় ছবি। চারিদিকে জল আর জল। শুধু দু’একটা গাছের মাথা দেখা যাচ্ছে।
মনে হত ওখানে ত্রাণ যাবে কিভাবে? শুনতাম আকাশ পথে দেখা হবে বন্যার অবস্থা। দেওয়া হবে খাবারের প্যাকেট।
তখন মনে পড়েছিল ছোটোবেলায় হরিলুটের বাতাসার কথা। বাতাসা দিলেই আমাদের চাইতে যারা বড়ো তারা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে তা কুড়িয়ে নিয়ে নিত। আমরা ছোটোরা কখনো দু’একটা পেতাম। ত্রাণ কি সবাই পাবে?
খবরের কাগজের সেই ছবিটি এখনও চোখের সামনে ভাসে। এখন যেমন হাঁটু জলে সাংবাদিক দাঁড়িয়ে থেকে লোক ডেকে ডুবজলে লোকজনকে সাঁতার কাটার অভিনয় করিয়ে বোঝাতে চায় বন্যার ভয়াবহতা, তখন এইসব চালাকি ছিল না। তখনকার ওই খবরের কাগজের ছবিতে তো একেবারেই নয়।
ওই খবরের কাগজটা সরিয়ে রেখেছিলাম। সেই ছবি আর দ্বিতীয়বার দেখিনি।
আমরা ভাইবোনেরা বাবাকে কি হয়েছে এটা জিজ্ঞাসা করতে সাহস পাচ্ছি না। শেষে মায়ের জিজ্ঞাসায় নীরবতা ভাঙল।
সেদিন বাজারে গিয়ে বাবা দেখেছিল সেখানে চাল, ডাল, ছাতু মিল্ক পাউডার আরও অনেক কিছু বিক্রি হচ্ছে। সেসব কিনবার জন্য লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনেকে। এইসব কিছু এসেছিল অসহায় দুর্গত মানুষের ত্রাণের জন্য। যাদের কাছে এগুলি যাওয়ার প্রয়োজন তা না হয়ে ঘুরপথে বিক্রির জন্য বাজারে এসেছে।
একজন আনন্দের সঙ্গে বাবাকে বলেছিল, ‘যাও গিয়ে লাইনে দাঁড়াও। এরকম সোনামুগ ডাল অন্যসময় বাজারে পাবে না। আমরা তো কিনি মটডাল।’
এই কথা শোনার পর বাবার চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল সেই সব মানুষের ছবি, পরিবার নিয়ে যারা দাঁড়িয়ে আছে অসহায়। যদি কিছু খাবার জুটে যায়। এই ভরসায়।
এই দুর্গত মানুষদের মুখের গ্রাস বাজারে বিক্রি হচ্ছে মুনাফা করছে বেশ কিছু লোকজন নানা প্রক্রিয়ায় ত্রাণ সামগ্রী বাজারে এসে হাজির। তাই হামলে পড়ে কিনছে সবাই।
সেদিন আর বাজার করতে ইচ্ছে করেনি বাবার। তাই মনে একরাশ ব্যথা নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছিল।
দুপুরে ভাত,ডাল আর আলুসিদ্ধর গরাস মুখে নিতে গিয়ে কেমন একটা চাপা কষ্ট অনুভব করেছিলাম।
অতিবৃষ্টি বা বন্যা হলে, কখনো বাঁধ ভেঙে গেলে দুর্গত মানুষের যে অবস্থা তার ছবি এখন একেবারে ঘরে ঢুকে পড়ে।
জনগণকে বোকা ভাববার প্রয়াস এখন কোনো কোনো সংবাদমাধ্যমের থাকলেও সবাই যে সেই দলে নাম লিখিয়েছে তা নয়। সত্যি আর মিথ্যার ফারাকটা বুঝতে খুব অসুবিধা হয় না।
একটু খাবার ও জলের জন্য আর্তনাদ এত বছর বাদেও শুনতে হয়। সেই কাগজটার ছবিটি যেন বিদ্রুপ করে বার বার ভেসে ওঠে চোখের সামনে। সেই কাগজটি আর দ্বিতীয় বার দেখিনি বটে তবে ঘরে বসে এখন টিভি খুলে সংবাদ দেখে তার সত্য মিথ্যা তো যাচাই করতেই হয়।
যা সত্যি তা সব মিথ্যে দেখানো হচ্ছে বলে চিৎকার করলেই তা মেনে নিতে হবে এমন কোনো দাসখত তো কারও কাছে লিখে দিইনি।
তাই এই সময়েও দেখি কেউ মজুদ করছে চালের বস্তা, এমন করোনার মতো মহামারীর মধ্যেও জীবনদায়ী ওষুধ গায়েব করে দিচ্ছে হাসপাতাল থেকে, এমন আরও অনেককিছু তখন ভাবি কিছুই বদলায়নি।
আমাদের মতো অনেক অপদার্থ লোককে বছরের পর বছর শুনতে হয়েছে কড়া ধমক। ‘যা হয়েছে বেশ হয়েছে। তোর বাবা কিছু করতে পারবে না।’
সত্যিই আমার মতো অনেকের বাবা কিছু করতে পারেনি। আমি বা আমরাও কিছু করতে পারছি না। পারবও না। এই দুঃশাসনদের হাত দিয়ে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান কেড়ে নেবার সময় তা রুখে দেবার কোন ক্ষমতা বা জাদু আমার বা আমাদের হাতে নেই।
শুধু দেখি,শুনি, বুঝি আর চুপ করে থাকি।
মনে মনে ভাবি সব একই রকম আছে। আর অপেক্ষা করি, দেখি শালা কি করে!
যত মহামানব আছে সেই মহামানবের পতাকা হাতেই।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।