আবার সে আসছে। সে কে? করোনা। আসছে নিজের শক্তি বাড়িয়ে মহা উল্লাসে।
ইতিমধ্যেই অল্পকয়েক দিনে যেভাবে করোনা ঢাকঢোল বাজিয়েছে,তাতে গত একবছরে আমাদের কাছে করোনার অবাঞ্ছিত অতিথি হয়ে থাকার সেই আতঙ্কের দিনগুলির কথা মনে পড়ে।
টিভি খুললেই দেখেছি অ্যাম্বুলেন্সে থেকেই রুগি মারা গেছে। হাসপাতালে বসে এক করোনা রুগির মৃতদেহ চোখের সামনে দেখে আতঙ্কে নিজের চোখ টান টান করে বসে আছে আর একজন রুগি।
মৃতদেহ পাচ্ছে না মৃতের নিজের লোকেরা।সেই মৃতদেহ চালান হয়ে যাচ্ছে কোথায় কোন নিরুদ্দেশে কে জানে।
দেখা যাচ্ছে গাড়ি থেকে পড়ে যাওয়া মৃতদেহগুলি হুক দিয়ে টেনে গাড়িতে তোলা হচ্ছে। আহা ওরা কার আত্মীয়? কার বাবা,মা,ছেলে,মেয়ে,প্রেমিক,প্রেমিকা কে জানে!
এইসব দৃশ্য এখনও ভেসে ওঠে চোখের সামনে।যে রোগের যেমন ওষুধ পথ্য তা তো আমরা সহজে মানছি না মানব না বলে উড়িয়ে দিচ্ছি। কিছুই মানতে না চাওয়াটাই যেন আমাদের দস্তুর। আমাদের বিপ্লবীয়ানা।
প্রধানমন্ত্রী তো সেদিন বললেন। আমি বহু বছর আগেই কারও সঙ্গে হাত মেলানো বন্ধ করে দিয়েছিলাম। আমার এই আচরণ দেখে অনেক পরিচিতজনেরা মজা করেছে। কোনো খাবার পরিবেশন করতে গিয়ে বলেছে,‘ কল্যাণ আমি কিন্তু হাত ধুয়ে নিয়েছি।’
কথাটা শুনে উপস্থিত অনেকে মজা পেয়েছে। এটা যে কোনো সুস্থ বোধ থেকে আমার বন্ধুটি বলেছে তা নয়। সে চেয়েছিল সবার সামনে আমাকে খানিকটা অপদস্থ করতে। আমার আচরণকে সে হাস্যকর পর্যায়ে নিয়ে যেতে সফল হয়েছে। কেননা বেশিরভাগ মানুষই তো চলতি হাওয়ার পন্থী। রাস্তায় কোথায় সে ঘুরে এসেছে।পায়ে রাস্তার ধুলো। আড্ডায় বসে সে নিজের পায়ে হাত দিয়ে নিজেকেই জম্পেশ খাতির করছে।সেই হাতেই মুঠো করে চানাচুর তুলে নিচ্ছে।চানাচুরের নোনতা স্বাদ আঙুলে লেগে।সেই অমৃত চেটেপুটে নিয়ে আবার চানাচুরে হাত। অন্যরাও চানাচুর তুলে নিচ্ছে। আমি হাত গুটিয়ে রেখেছি।কিছুতেই ওই চানাচুর নিয়ে মুখে দিতে পারব না।
অনেকে বলেছে অত মানলে চলে না।তাদের হোস্টেল জীবনের গল্প বলে আমাকে প্রভাবিত করতে চেয়েছে। বলেছে আমরা এক কাপের চা চারজন মিলে খেয়েছি।আমি শুনেছি কিন্তু ওদের মতো বাহাদুর হওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।
ফলে অনেক সময় এমন হয়েছে যে আমার আচরণ দোষে আমি একা,হয়েছি আলাদা।
করোনা এসে অনেক বিধিনিষেধের তালিকা ছড়িয়ে দিল। মুখে মাস্ক, হাতে স্যানিটাইজার,দূরত্ববিধি। আমার এক বাহাদুর বন্ধু নিজেকে ভয়ে ঘরে আটকে রেখে ফোন করে বলল,‘তুই যা বলতি এখন সে সবের অনেককিছুই মেনে নিয়েছি।এই কথার আর কি উত্তর দেব। ভাবলাম বন্ধুত্ব যা পারেনি করোনা তো খানিকটা হলেও তা পেরেছে।
করোনার এইসব শেখানোর কঠিন পদ্ধতি আমার মোটেই পছন্দের না। কত ক্ষতি হয়ে গেল একটা সভ্যতার।মানুষের।
তাতেও কি সত্যিই পারল আমাদের যাবতীয় নিয়মের মধ্যে আটকে রাখতে।পারেনি। আমাদের অনেক কুঅভ্যাস এখনও বজায় রেখেছি। এ যেন জন্ম-জন্মান্তরের অভ্যাস।নিজেদের ঐতিহ্য কি কখনও বিসর্জন দেওয়া যায়? নিজেকে বদলানো যায়?
আপনি বোঝাতে গেলে দেখবেন তা অসম্ভব।কুকুরের লেজ সোজা করার বাসনায় যদি নিজেকে নিয়োজিত করেন তবে তা হবে বৃথা চেষ্টা। হাত দিয়ে তা সোজা করে যখনই ছেড়ে দেবেন আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।
দ্বিতীয়বার করোনা ফিরে আসায় এখন মনে কেমন ভয় হয়। কি হবে? খেলা,মেলা,ভোট অবাধে চলেছে। ওদিকে করোনা নিজের নিয়মে তার খেলা খেলছে বিশ্বজুড়ে।
অনেক বলছে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ যখন করোনা ঠেকাতে পারছে না, তখন আমরাও পারব না।ভ্যাকসিন তো কোনো কাজেই আসছে না। ডাক্তারবাবুরা যেভাবে সতর্ক করছেন তাতে তাঁদের কন্ঠস্বর কান্নার মতো শোনাচ্ছে। হাসপাতালে রুগির অক্সিজেনের নল খুলে গেছে। কেউ দেখবার নেই। যার দেখবার কথা সে তো কিছুই জানে না। হয়ত ঝগড়ুটে মেয়ে বা বখাটে ছেলে হওয়ার যোগ্যতায় চাকরি নয় কাজ পেয়েছে। তা এহেন রাজার পার্ট পাওয়া কুশীলবদের সংলাপে কিছু ভুল থাকতেই পারে!ও নিয়ে কিছু মনে করতে নেই।
বিদেশে তো অনেক কিছুই উন্নত তারাই যখন করোনা আটকাতে পারছে না তখন আমরা তো শিশু। বিদেশের লোকেরা কি কিছু কম বোঝেন? তবে তারা আক্রান্ত হচ্ছেন কেন?
অতএব যা যেমন চলছে চলুক।মাস্ক ঝুলছে গলার কাছে। রাস্তায় গুটখার গয়েরে আলপনা আঁকছি। বাতাসে উড়িয়ে দিচ্ছি সিগারেটের ধোঁয়া। বিভিন্ন সভাসমিতিতে ক্যামেরা অন করলেই মাস্ক খুলে ফেলছি নিজের হিরোর মতো মুখটি ছবি করে রাখবার জন্য। বাজারে একজন অপরের ঘাড়ে হামলে পড়ছি। বিভিন্ন জায়গায় ক্রস চিহ্ন দিয়ে দূরত্ব বজায় রাখার নিশানা দিয়ে চেষ্টা করা হলেও সেখানে বসছি। যে বসতে নিষধ করছে তাকে দু’কথা ক্যাট ক্যাট করে শুনিয়ে দিয়েছি।বলেছি অত শর্ত মানলে চলে না।
তাই তো অত নিয়ম শুনতে যাব কেন? একবার শিক্ষা পেয়েও তো কিছু হল না।হাসপাতালগুলি আছে সেই হাসপাতালেই।রুগির জন্য কোন জায়গা খালি নেই।
টিভিতে দেখলাম একটি প্রদেশে গণচিতা জ্বালানো হয়েছে। যেন মহামারীর দীপাবলি।
এমন যখন চারিদিকের অবস্থা তখন অত ভেবে হবেটা কি? আসুন কোনো চেষ্টা ছাড়া প্রতিবাদহীন আমরা পতঙ্গের মতো পুড়তে থাকি।