সাপ্তাহিক টুকরো হাসিতে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় – বারো

টুকরো হাসি – বারো

তাড়িয়ে দেবে বলে না

এলাকায় তুমুল চিৎকার।সেটা কখনো মনে হচ্ছে বাড়ির কাছাকাছি,আবার যেন দূরে সরে যাচ্ছে।আমপান ঝড়ের ঠিক আগে এইরকম শুনেছিলাম।
দু’তিন দিন কে কোন দলে গেল শুনে বিরক্ত হয়ে টিভি বন্ধ রেখেছি।তাহলে কি আবার ঝড়ের খবর হল? এই শুনে চাল, ত্রিপল, বাড়ি তৈরির টাকায় মোচ্ছব করবার উল্লাসে কিছু লোক বোধহয় মেতে উঠেছে?
আমপানের অন্ধকার দিনগুলি মনে পড়ল।আলো নেই।মশার ভয়ে মশারির ভিতরে।অন্ধকারে চোখ প্যাট প্যাট করে তাকিয়ে আছি।ঘুম নেই।মোবাইল মৃত।জীবন থমকে গেছে।এনাফ্‌ ইজ এনাফ্‌ বলেও দপ্তর থেকে আলো আনা যাচ্ছে না।জমা জল থেকে বিন্দু বিন্দু করে খরচ করছি।হায়!আবার যদি তেমন হয়?
বিতানকে ফোন করলাম।ও বলল,‘আমিও চেল্লানি শুনছি।ঝড় হলে টিভিতে এতক্ষণে কোনো চ্যানেল আমরাই প্রথম খবর করেছি এই বলে হল্লা কীর্তন করত।আমি খোঁজ করছি।’
দশ মিনিটের মধ্যেই বিতান ফোন করে বলল,‘একটি ছেলেকে গরু পাচারকারী বলে কিছু লোক ধরেছে।শুনলাম ছেলেটি একজন পরিযায়ী শ্রমিক।অনেকটা পায়ে হেঁটে বাকিটা জমা টাকা খরচা করে সুন্দরবনে ফিরে নিজের বাড়ি আর লোকজনদের খুঁজে পায়নি।আমপানের ঝড়ে সবই হাওয়া।হায় হায় করতে করতে আমাদের এলাকায় ওর মাসির বাড়িতে আসছিল।ওই লোকেরা চেষ্টা করছিল ছেলেটিকে গরু পাচারকারী বলে দেগে দিতে।এই ছেলেটাকেই গরু পাচারকারী বোঝাতে পারলে আসল অপরাধীকে সাধু বানানো যেত।’
বললাম, ‘এখন কি ঝামেলা মিটল?’
‘মিটেছে। ছেলেটির মেসো স্পটে এসে চিল্লামিল্লি করতে বেগতিক দেখে সব সটকেছে।বিষ্টু ঘোষ নিজের দোকানে ছেলেটিকে কাজে লাগিয়েছে।নিজে করোনার ভয়ে দোকান খুলছিল না।এখন ছেলেটিকে দিয়ে দোকান খোলাবে।দেখলাম বিষ্টু ঘোষ ছেলেটিকে বোঝাচ্ছে যে, ওর মেসোর কাজ বন্ধ।খাওয়াবে কি করে!রাস্তায় ঘুরে বেড়ালে পুলিশ ধরবে।জেলে পাঠাবে।সেখান থেকে সহজে ছাড়া পাবে না।এইসব।দোকানের কাজে রেখে বলল,দু’বেলা খেতে পাবে।থাকবে দোকানে।আর একটা কথা বলেছে কথা না শুনলে তাড়িয়ে দেবে।’
বললাম, ‘বিষ্টু ঘোষের ওই এক স্বভাব।কথায় কথায় বলে তাড়িয়ে দেব।খদ্দেরদেরও ওই রকম বলে।’
বিতান বলল,‘একদিন একজন খদ্দের বলছিল,আপনি কী তাড়াবেন মশাই আমি আমার বন্ধুদের এই দোকানে আসতে বলব না।এই করে লোকটার খদ্দের কমেছে।
ছেলেটির নাম গুটকে।ভালোই চালাচ্ছিল দোকান। ওর ভালো ব্যবহারে দোকানে খদ্দেরও আসছিল।
একদিন দেখি দোকানের সামনে জটলা করে আছে লোকজন।বিতানও হাজির।
বিষ্টু ঘোষ বলছে,‘তুই চলে যাবি তো বলছিস,তা যাবি কোথায়?বাড়ি আর বাড়ির লোকজনের এখনও তো কোনো চিহ্ন নেই।সব ফক্কা।শেষে পথে ঘুরে পুলিশের হাতে ধরা পড়বি।একবার গরু পাচারকারী বলেছে কোনোরকমে বেঁচে গেছিস।এরপরে যদি কয়লা,বালি,মাটি, সোনা পাচারকারী,বা কাটমানি শিল্পী বলে তবে তোকে তো জেলে যেতে হবে।’
গুটকে বলল,‘আমি জেলেই যাব।তবু আপনার কাছে থাকব না।’
আমাদের দিকে তাকিয়ে বিষ্টু ঘোষ বলল,‘দেখেছেন এই পাগলের কাণ্ড! বেশ তো আছিস বাবা এখানে।শুধু চলে যাব আর চলে যাব।কেন রে বাবা?’
বিষ্টু ঘোষের কাতর কন্ঠস্বর শুনে বিতান গুটকের কাঁধে হাত রাখল।বলল, ‘চলে যেতে চাইছ কেন?’
বিতানের স্নেহের ছোঁয়া পেতেই কেঁদে ফেলল গুটকে।কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘দেখুন কাকু আমি কত কাজ করি।তবু দিনে দশবার দোতলা থেকে আমাকে গালাগালি দিয়ে চিৎকার করে ডাকবে আর বলবে,ভালো করে কাজ করবি,টাকার ঠিক হিসাব দিবি।খাবি কম খাটবি বেশি।তা না হলে তাড়িয়ে দেব।’গুটকে শব্দ করে কেঁদে উঠল। বলল,‘আমি এখানে থাকব না।চলে যাব।’
‘আবার এক কথা।যাবি কোথায়? পথে ঘুরে ধরা পড়লে তো জেলে যাবি।’বিষ্টু ঘোষকে থামান গেল না।
গুটকে বলল,‘জেলে গেলে যাব।সেখানে থাকা অনেক ভালো।ওখানে কেউ তাড়িয়ে দেবে বলে না।’
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।