পুলকের বাবার অভ্যাস ছিল পুজোর সময় ছোটো থেকে বড়ো বাড়ির সবার নতুন জুতো কেনা হলে তাতে পেরেক ঠোকা।
একদিন জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কাকা তুমি নতুন জুতোয় পেরেক ঠোক কেন?’
কাকা বলল, ‘পেরেক ঠুকে দিলে জুতোটা মজবুত হয়। সহজে নষ্ট হয় না।’
আমাদের ছোটোবেলায় জামা জুতো এইসব কেনা হত পুজোতে। ওই সময় কিছু বাড়তি টাকা আসত বড়োদের হাতে। তা হাতে পেতে ষষ্ঠী পুজো চলে আসত।
তখন সপ্তমীর দিন থেকেই মনে হত এবার সত্যি পুজো এসেছে। তবু আনন্দ ছিল আমাদের মতো করে। আমরা যেখানে ছিলাম সেখানে তখন বেশির ভাগ পরিবারই ছিল আমাদের মতো। কাজেই ওই অঞ্চলে আমরা যারা ছোটো ছিলাম দেরিতে হলেও যা পেতাম তাই ছিল আমাদের কাছে ছিল পরম প্রাপ্তি।
নতুন জুতো পেয়ে আমাদের মাটিতে পা পড়ত না। যদি ধুলো মাটি লেগে যায় এই ভয়ে বাড়ির ছোটোরা জুতো পরে বিছানার হাঁটতাম। যাতে পুজোর দিনগুলোতে ওই জুতো পরে ঠাকুর দেখতে যাবার সময় অসুবিধা না হয়।
অসুবিধা হত। দু’চারটি ঠাকুর দেখার পরই পায়ের বিভিন্ন জায়গায় চামড়ায় ঘসা লেগে শুধু যন্ত্রণা। প্রতি বছরের অভিজ্ঞতায় পকেটে তুলো রাখতাম। যেখানে দরকার তুলো আটকে দিতাম। সেটা বেশিক্ষণ থাকত না। সরে যেত। ফলে মহাসংকট। অষ্টমীর দিন থেকে বাকি দিনগুলিতে গত বছরের পুরনো জুতো যা নতুনটা পেয়ে অনাদরে ফেলে রেখেছিলাম তার খোঁজ পড়ত।
প্রতিবছরই পুজোর একমাস দু’মাস আগে জুতো কেনার অবস্থা ছিল না। বাড়ির বড়োদের বললে বলত, ‘একমাস আগে কিনলে সেই জুতোকে কেউ আর নতুন বলবে? তখন তো পুরনো হয়ে যাবে।’ আমরা তখন তাই বুঝতাম।
আমাদের ছোটোবেলায় পুজোর জামা প্যান্ট একটাই হত। এখন ছোটবেলায় অনেকের একের বেশি কখনো বা একডজন হয়ে যায়।
পুজোর পরে পায়ের ক্ষত সারানোর জন্য নানা ওষুধ লাগিয়ে কিছুদিন বিশ্রাম নিতে হত। তারপর আসত কালীপুজো।ভাইফোঁটা। তখন জুতোজোড়া আমাদের বশ মানত।
পুলকদের বাড়ির ছোটো থেকে বড়ো সবারই কিন্তু সমস্যাটা থেকে যেত তখনও। জুতোকে পোক্ত করার জন্য যে পেরেকগুলি ঠুকে দেওয়া হয়েছিল সবার জুতোয় সেগুলি মাঝে মাঝেই ফুঁড়ে উঠে জানান দিত। এই নিয়ে ওদের বাড়িতে ঝামেলা লেগেই থাকত। পুলকের বাবা চাইতেন সবার জুতো যাতে নষ্ট না হয়। তাতে ফল হত উলটো। এসব কতদিন আগেকার কথা। মাঝে মাঝে মনে পড়ে যায়।
আজ ১৪আগস্ট ২০২১।রাত শেষ হলেই কাল স্বাধীনতা দিবস। আজ ঘুমিয়ে থেকে যদি কাল জেগে উঠি তবেই সেই দিনটি।
এমনই একটি দিন ছিল ১৯৪৭ সালে। নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পরেরদিন মানুষ পেয়েছিল স্বাধীনতা। যুদ্ধ নয়, রক্তপাত নয় বেশিরভাগ মানুষের কাছে স্বাধীনতা এল হাতে তৈরি মোয়া পাওয়ার মতো। সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় স্বাধীনতাকে চেটেপুটে খেয়ে ভোগ করতে চাইছে কিছু লোক। যারা খুব চতুর। জীবনের নানাক্ষেত্রে বহু কৌশল এরা জানে।
যাঁদের আত্মবলিদানে এই স্বাধীনতা তাঁদের আদর্শ নিষ্ঠা এসব নিয়ে কারও মাথা ব্যথা নেই।
এত বছরেও স্বাধীনতাকে একটি উজ্জ্বল মাত্রায় প্রকাশ করা যাচ্ছে না। বাইরের শত্রুরা যখন তখন দখলের মনোভাব নিয়ে গ্রাস করতে চাইছে তখন দেশের ভিতরে অন্য এক বিরুদ্ধ যন্ত্রণা। আমাদের ভারতবর্ষকে যখন যুদ্ধসাজে রক্ষা করতে সেনারা প্রস্তুত হচ্ছে, তখন যুদ্ধ পোশাকে ঢুকে পড়ছে দেশেরই কিছু পোকার মতো মানসিকতার লোকজন। যারা শত্রুসৈন্যকে রুখে দেবার আগেই ঢুকে যাচ্ছে সেনাদের পোশাকের ভিতর। এইসব পোকাদের কামড়ের জ্বলুনি ঠিক করতেই জেরবার হতে হচ্ছে।
বিশ্বের অনেক শক্তিশালী দেশ যখন ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে ও পরাক্রম কে স্বাগত জানাচ্ছে তখন এখানেই চলছে অনন্ত বিরোধিতা।
আগেই তো নিজস্ব ভূমিকে তিনটি ভাগে ভাগ করে একট করে মসনদ তৈরি করে দখল করবার জন্য যাঁরা লোভী হয়ে উঠেছিলেন তাঁরা আজ পরপারে।
তাঁদের লোভে মানুষকে রেখে গেলেন নানা সমস্যার মধ্যে। তার মধ্যে একটি সাম্প্রদায়িক বিভেদ। সেই বিভেদের তাসকে হাতে নিয়ে মুনাফাবাজদের দাবাখেলা হয়েই যাচ্ছ নিজেদের মুনাফার জন্য। দেশের বাইরে ভিতরে নানা কিসিমের চাল চালছে।
একদিকে বাইরে থেকে দখলের আগ্রাসী মনোভাব, অন্যদিকে ভেতরে সকলের বক্তব্য এই যে তিনি ক্ষমতায় থাকলে এই দেশকে নানা সমস্যা থেকে মুক্ত করে গড়ে তুলতে পারতেন। যাঁরা আছেন তাঁরা অপদার্থ।
পুলকের বাবাকে বোঝানো যেত না সদ্য কেনা জুতোকে কিছুদিন ব্যবহার করে তবে অবস্থা বুঝে পেরেক ঠুকতে হবে। নতুন অবস্থায় পেরেক ঠুকলে তা পরবার সময় স্বস্তিদায়ক হবে না।
সে কথা পুলকের বাবা শুনত না। ভাবত যা করা হচ্ছে তা ঠিকই হচ্ছে।
পুলকের বাবার এই মনোভাব দেশ গড়ার ক্ষেত্রে এখন সকলের মধ্যেই। এতে দেশের কতটা ভালো হবে কতটা নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকবে দেশ তা কে জানে।