সাপ্তাহিক গল্প নেই-তে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় – ৩৯

গল্প নেই – ৩৯
মাঝে মাঝে খবরে শোনা যায় যে চুরি করতে গিয়ে কেউ ধরা পড়েছে।বেশির ভাগ সময়ই এমন হয়,যে চুরি করেছে টিভিতে তার চেহারা দেখলে খুব খারাপ লাগে।অপুষ্টিতে ভোগা রোগগ্রস্থ চেহারা। এমনই যা দেখলে মনে হয়,না খেতে পাওয়া একটা হতভাগ্য গ্রহের বাসিন্দা।যার পোশাক চেহারা দেখে এই মানুষটি বেশি দিন বাঁচবে না এমন আশঙ্কাই হয়।
অনেক সময় শোনা যায় যে চুরি করতে যাওয়া লোকটি স্থানীয় লোকজনের হাতে ধরা পড়ে গণপিটুনিতে মারা গেছে।গ্রাম হলে দেখা যায় আশপাশের যেসব লোকজন আছে তাদের চেহারাও চুরি করতে যাওয়া ধরা পড়া লোকটির মতোই।
গণপিটুনিতে একটি লোককে মেরে ফেলার জন্য যারা দায়ী তারা খুব একটা ধরা পড়ে না। দু’একজনকে ধরা হলেও তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না যাতে তারা যে দোষী তা বোঝা যায়। এইক্ষেত্রে যেটা একমাত্র সত্যি তা হল লোকটির মারা যাওয়া।
আমাদের ছোটোবেলায় যখন বিদ্যুতের আলো ছিল না,তখন খুব চুরি হত। বছরের অন্য সময়ের চেয়ে তে শীতকালে এই উপদ্রব ছিল বেশি।তখন অনেক সমস্যা হত। এই সময়ে চোরেদের রমরমা। গৃহস্থকে শীতে লেপের তলায় থেকেও মাঝে মাঝেই জেগে উঠতে হত। যা কিছু আছে সেটুকু রক্ষা করার জন্য।গভীর ঘুমের মধ্যে যদি চোর সেই সম্বলটুকুও নিয়ে যায় তবে তো ঘোর বিপদ।তাতেও যে সবসময় সব রক্ষা হত তা নয়।চুরি হতই।আজকাল আর শহর বা শহরতলীতে তেমন চুরির কথা খুব একটা শোনা যায় না।বিদ্যুতের আলো চলে আসায় চুরি করায় খুব সমস্যা হয়েছে।নতুন আরও একটা উপদ্রব সিসিটিভি ক্যামেরা।
তবে আগের মতো ছোটোখাটো চুরি গ্রামের দিকে এখনও হয়,যেখানে বিদ্যুতের আলো পৌঁছয়নি।সেইসব অঞ্চলের গৃহস্থদের ও চোরেদের পরিস্থিতি,রোজগার,চেহারা,দুর্দশা প্রায় একইরকম । যা সমাজের পক্ষে স্বাস্থ্যকর নয়।তবু তারা এমনই আছে।এভাবেই বেঁচে আছে।এমনি করে কতদিন থাকবে তা কেউ বলতে পারবে না।
এইসব মানুষেরা একটা দেশলাই কিনতে গিয়ে যে কর দেয় সেই করের পয়সার শুনেছি দেশের উন্নতি হয়।তবে সেই উন্নতির আলো এইসব এলাকার মানুষের চোখে ধরা পড়ে না।এদিকটা যেন চাপা অন্ধকার।
চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গণপিটুনিতে যে মারা গেল তাকে নিয়ে আমাদের খবর শোনা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।দু’একজন হয়তো সামান্য হায় হায় করে।তারপর আমরা ভুলে যাই। কখনো কেউ নীতিবাক্য আওড়াতে থাকেন।অনেকে বলেন,চুরি করলে তার তো শাস্তি পেতেই হবে।
কোনটা চুরি আর কোনটা চুরি নয় এই নিয়ে মাথা টালমাটাল। আমাদের চোখ ও মনের সামনে সারাদিন তো কত কিছুই চুরি হচ্ছে।পুকুর,জলাশয়,বালি,কয়লা,পাথর,গরু এইরকম আরও অনেককিছু।খাদ্যে ভেজাল দিয়ে যেভাবে মুনাফার টাকা ঘরে তোলা হচ্ছে এটাও তো একরকম চুরি।টাকা নিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া লোকেরা কি গ্রামের ওই চুরি করে ধরা পড়া চোরের চেয়ে বেশি সম্মান পাওয়ার যোগ্য? সামান্য চুরি করতে যাওয়া চোর ধরা পড়লে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলার আগে বিচারের কোন প্রয়োজন হয় না। বিচারের কোনো সুযোগও পাওয়া যায় না। তার কোনো রক্ষাকবচ নেই।
অথচ চোরেদের এই মহান সাম্রাজ্যে মহা মনীষীদের মতো চোরেদের জন্য আছে অতুলনীয় বিচার ব্যবস্থা।যারা চোরেদের রাঘব বোয়াল তাদের ডাকা হয়।কথা হয়।কত কথা।কথার যেন শেষ নেই। কথার সহস্রধারা।বছরের পর বছর পেরিয়ে যায় প্রকৃত বিচার নেই।কবে দোষী শাস্তি পাবে তার ঠিক ঠিকানা নেই।
টিভিতে খবরের কাগজে তাদের নিয়ে কত খবর!কেউ কোর্ট থেকে আদায় করতে পারলে তা বড়ো করে লেখা হয়।আমরা সেই খবর নিয়ে চিবুই। গিলে আমাদের মন ভরাই।এ যেন এক রঙ্গ নাটক।
যাদের চোর বলে চিহ্ণিত করা হয় তাদের মুখে লজ্জার কোনো চাপ নেই।ছাপ নেই অভাবের। পোশাক সর্বদা চুরির মানসিকতার মতো নয়। তা সযত্নে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন।যতক্ষণ না প্রমাণ হচ্ছে ততক্ষণ আইনের ভাষায় দোষী বলা যাবে না।
তবে তাদের নাম দোষীর তালিকায় উঠল কেন? সবার ক্ষেত্রে তো এই অপবাদ দেওয়া হয় না!
গ্রামের ছোট চোরেরা এত বড়ো চুরি করবার কথা ভাবতেও পারে না।তবু কত মানুষের হাত একত্র হলে ওই চোরেরা গণপ্রহারে মারা যায়!
অথচ ভয়ংকর দোষীদের দিকে মানুষের হাত জোড় হয়ে থাকে। সামান্য ভিক্ষের জন্য।
এইসব মানুষেরা দুর্বল ছোটো চোরেদের কাছে বাঘ।আর বিত্তশালী,প্রভাবশালী বড়ো চোরেদের সামনে যেন নিজেরাই চোর হয়ে থাকে।