আসল নামটা বলা যাবে না। এত বছর বাদে তিনি কোথায়, কেমন আছেন জানিনা। যোগাযোগ থাকলে হয়ত জোর করে অনুমতি চাইতাম। অবশ্যই অনুমতি দিতেন না। তবু যা বলতে চাইছি তা একটা নাম নিয়ে তো বলতে হয়। ধরা যাক তার নাম পুলকদা।
অফিসে খুব বেশি লোকের সঙ্গে আমার তখনও আলাপ হয়নি। যতটুকু কাজ তা থেকে ছাড়া পেয়ে অফিস পাড়া থেকে চলে যেতাম কলেজস্ট্রিট। সেখানে কফিহাউস ছাড়া আরও দু একটি জায়গায় আড্ডা। বিকেল হলেই মনে হত কে যেন হাতছানি দিচ্ছে। ডাকছে।
কয়েকটা বছর কাটাবার পরে অফিসের অনেকের সঙ্গে আলাপ হল। পুলকদার সঙ্গেও।
কয়েকজনের কাছে শুনলাম পুলকদা নকশাল ছিলেন। খুব রাগী মানুষ। কোন কথায় যে রেগে যাবেন তা আন্দাজ করা মুশকিল। অনেকে সমীহ করত। আমার তা নিয়ে কোনো ভাবান্তর ছিল না। আমি থাকতাম ইছাপুরে। আমার চারপাশে ছিল নকশাল। দু’পাশে বোমা পড়েছে। পুলিশ ঘিরে রেখেছে এলাকা। একের পর ছেলেদের ধরেছে। কখনো ছেড়ে দিচ্ছে। কখনো ঢুকিয়ে দিচ্ছে জেলে।
তখন এমন এক সময় যখন নকশাল ভাবনার ছোটো একটি চারা সযত্নে লালিত হত অনেকের বুকের ভিতরে। তখন এমন অনেক বন্ধু ছিল আমার।
পুলকদার রোগা পাকানো চেহারা। মুখে সবসময় রাগী ভাব। উনি কখনো হাসলে অনেকে ভাবতেন আজ তাহলে অফিসে দিনটা ভালো যাবে।
আমাদের অফিসে দু’টি ইউনিয়ন। কাউকে তিনি পাত্তা দিতেন না। চাঁদাও দিতেন না। পুলক দা অফিসে একটু কিছু এদিক ওদিক হলেই খুব চিৎকার করতেন। বলতেন, দু’টি ইউনিয়নের লোকজন সবাই অপদার্থ। কোনো কাজের না। হয়ত উনি ভাবতেন নকশাল ইউনিয়ন থাকলে দিল্লি অফিস থেকে সব দাবি আদায় করা যেত।
আমরা তখন যারা কেন্দ্রিয় সরকারি কর্মী আমাদের চাহিদা ছিল খুবই সামান্য। পানীয় জল নেই। সরাসরি কল থেকে জল নিয়ে খেতে হত আমাদের অফিসে। দেখা গেল তাতে অনেকেই পেটের সমস্যায় ভুগছেন। যখন তখন লোডশেডিং হয়ে যেত। আলো নেই। মাথার উপরে পাখা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
ফলে আমাদের দাবি অফিসের প্রতিটি বিভাগে মাটির কুঁজো দিতে হবে। সবার হাতে থাকবে হাতপাখা। গরমের দিনে বাইরের বাতাসে যখন আগুনের হলকা, তখন দাবি ছিল খসখস টাঙাতে হবে।
তাই জানানো হয়েছিল ডিপ টিউবয়েল থেকে লোক দিয়ে জল আনাতে হবে। প্রত্যেকের জন্য ভালো হাতপাখা কিনতে হবে। খসখসে জল দেবার জন্য লোক নিয়োগ করতে হবে।
এছাড়া আরও অনেক দাবি ছিল। তাই নিয়ে দিল্লিতে চিঠি চাপাটি লেখা হত। দুটি ইউনিয়নের কারা কতটা এই বিষয়ে এগিয়ে তাই নিয়ে গরম গরম কথা বলা হত।
মাইনে বাড়াতে হবে। ডি এ দিতে হবে। কেন্দ্রের সরকারকে সরাতে হবে এই ধরণের সব বড়ো ভাবনা। একটা ইউনিয়নকে দেখতাম কেন্দ্রের সরকারকে হটাবার জন্য কর্মীদের ডাক দেওয়া হচ্ছে কলকাতার রাস্তায় মিছিল করতে।
তবে জল,হাত পাখা ও খসখসের মতো দাবি আদায় করতেই তখন আমাদের কালঘাম ছুটে যেত। তখন এমনই পরিস্থিতি যে একটি পেপারওয়েট চেয়ে সহএ পাওয়া যেত না। আমরা অনেকেই যারা ট্রেনে যাতায়াত করতাম তারা রেললাইন থেকে পাথর কুড়িয়ে আনতাম। এমনই অবস্থা।
যিনি অফিসে সবার উপরের চেয়ারে বসে আছেন ,তাঁকে আমরা আমাদের দাবি জানাব তারপর তিনি দিল্লির অফিসকে জানাবেন, তারা যদি অনুমতি দেয় তবে তা জুটবে। যদিও তাঁর হাতে ক্ষমতা ছিল কিছু টাকা খরচ করার। তিনি তা নিজের সম্পত্তি ভেবে যে করতে চাইতেন না তা নয়। আসলে দিল্লিকে দেখাতে চাইতেন যে, তিনি কত কম টাকা খরচ করে কাজ করিয়ে নিতে পারছেন। তাছাড়া এই পদে যিনি বসতেন তাঁর তখন অবসর নেওয়ার সময় হয়ে আসত। দিল্লির কাছে নিজেকে ভালো প্রমাণ করতে না পারলে যদি পেনসনে কিছু অসুবিধা হয় তাই ভালো থাকবার চেষ্টা করতেন। ফলে দিল্লিতে আমাদের চাহিদার কথা লিখতে ভয় পেতেন তিনি।
দিল্লিতে আমাদের চাহিদার কথা জানাবেন বলে তিনি হচ্ছে হবে করে সময় কাটিয়ে দিতেন। হয়ত ভাবতেন কবে শীতকাল আসবে। তবে আমাদের হাত পাখার জন্য আন্দোলন বন্ধ হবে আর তিনিও শান্তিতে থাকতে পারবেন।
একসময় ভিক্ষার চালের মতো কিছু আসত। দাবি যে একেবারে আদায় হয়নি তা বলব না।
পুলকদা নিজেকে নকশাল বলে নাম ফাটিয়ে কোনো ইউনিয়নের মেম্বার হয়নি বলে প্রতিমাসে চাঁদার টাকাটা বেঁচে যেত। সেটা অন্য কারও ক্ষেত্রে হত না।
এক গরমের দিনে যখন রেডিওতে সকালের খবরে শুনেছি, গতকাল ছিল এ বছরের উষ্ণতম দিন স্বাভাবিকভাবেই সেদিনও খুব গরম ছিল। ঘেমে নেয়ে অফিসে গিয়ে দেখলাম মাথার উপরে পাখা ঘুরছে। শান্তি। তবুও নিজের নাম লেখা হাতপাখাটা কাছে রাখলাম। হঠাৎ যদি লোডশেডিং হানা দেয়!
পুলকদা তখনও আসেননি। ঘন্টাখানেক বাদে যেই না তিনি অফিসে ঢুকলেন সঙ্গে সঙ্গে আলো নিভল, পাখা বন্ধ হল। দাঁতে দাঁত চেপে বসে ছিলাম আমি। যাতে হাসি না পায়। সবাই সেটা পারল না। আচমকা হেসে ফেলল।
যারা হাসল তাদের তো একচোট নিলেনই। তারপর ওই গরমে অফিসের একটি ফাঁকা জায়গায় দাঁড়িয়ে একাই দু’টি ইউনিয়নের কারও নাম না করে প্রায় আছড়ে মারলেন সবাইকে। এই সঙ্গে সদর্পে ঘোষণা করলেন যে, আজ অফিসার কে বিনা নুনে খাবেন। ওই অফিসার নিজেকে বাঁচাতে পারবেন না।
অফিসারের ঘরে ঢুকলেন পুলকদা। রুদ্ধশ্বাসে সবাই বাইরে অপেক্ষা করছে কি জানি কি হয়?
আমি চুপ করেছিলাম। অফিসারের ঘর থেকে পুলকদা এমন ভাবে বেরিয়ে এলেন যেন যুদ্ধ জয় করে প্রচুর শত্রু খতম করে এসেছেন। তিনি বাইরে আসতেই আমি অফিসারের ঘরে ঢুকলাম।
উনি বললেন, ‘বোসো।’
বললাম, ‘ পুলকদা এসেছিলেন, কি বললেন?’
‘বললেন মেয়ের পরীক্ষা কেমন হয়েছে। বাড়ির সবাই কেমন আছে। ছেলে কেমন আছে। এইসব। তুমি কি জন্য এসেছ?’
বললাম, ‘একটা ফাইল আপনার কাছে আছে। ওটা সই করে দিলে ভালো হয়।’
উনি বললেন, ‘করে রেখেছি।’ ফাইলটা এগিয়ে দিলেন আমার দিকে।
ফাইল নিয়ে বেরিয়ে দেখি পুলক দা আমার দিকে তাকিয়ে কিছু বুঝতে চাইছেন। আমি গম্ভীর হয়ে ফাইল দেখতে দেখতে নিজের কাজে বসলাম। পুলকদার দিকে তাকিয়ে দেখলাম না। কিছু বললামও না।
বেশ কয়েক বছর বাদে আমি পুলকদার বিদ্রোহের নমুনা কেমন তা কয়েকজনের কাছে বলেছিলাম।
আজ বহুবছর বাদে যাতে গল্প নেই, তা বলতে গিয়ে আবার সেই ঘটনাগুলি মনে পড়ল।