সাপ্তাহিক গল্প নেই-তে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় – ১০

গল্প নেই – ১০

চোখ তুলে একবার আমার দিকে তাকিয়ে আবার চোখ নামিয়ে নিজের মনে হেঁটে যাচ্ছিলেন ভদ্রলোক।
আমার লোকটিকে খুব চেনা মনে হল। পিছন ফিরে দেখি ভদ্রলোকও থমকে দাঁড়িয়ে গেছেন। আমাকে দাঁড়াতে দেখে এগিয়ে এলেন।
সামনে আসতে বললাম, ‘অধীর তুই!’
‘চিনতে পেরেছিস তাহলে? কেমন আছিস আমাদের বিনোদ মেহেরা?’ অনেক কষ্টে যেন হাসল অধীর।
‘এখনও বিনোদ মেহেরা বলেই ডাকবি? অনেক বদলে গেছি। তেমন আর নেই।’ কোনরকম বললাম।
অধীর বলল, ‘এখনও তোর চেহারা তেমন বদলায়নি। আমি তো আমাদের বিনোদ মেহেরাকে দেখেই চিনতে পেরেছি।’
‘তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু তোর এই রকম অবস্থা হল কেন?’ আমার মনে পড়ল অধীরের সুন্দর স্বাস্থ্যবান চেহারাটা। এখন সেই চেহারা নেই। ঝুঁকে দাঁড়ান রোগা চেহারা দেখলে কে বলবে ও সেই অধীর। যে হাসলে মনে হত যেন চারদিক ঝলমল করে উঠছে।
বললাম, ‘কি ব্যাপার? তুই এই রকম চমৎকার চেহারা করলি কি করে ? আমি তো ভাবতেই পারছি না যে তুই আমাদের অধীর!’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘কেন তুই জানিস না?’
কলেজ ছাড়ার পর থেকে কলেজের কয়েকজন ছাড়া আর কারও সঙ্গে বহুদিন তেমন যোগাযোগ নেই। অধীরের সঙ্গেও না। ওর কোনো খবর জানিনা ভেবে একটু লজ্জিত হলাম।
বললাম, ‘তেমন কারও সঙ্গে তো দেখাও হয়নি যে তোর খবর দিতে পারে।’
অধীর বলল, ‘আমি একদম ভালো নেই রে। বড়ো ছেলেটা মারা যাওয়ার পর থেকে আমার জীবনের সবই কেমন অর্থহীন হয়ে গেছে। চলি।’ এই বলে আর আর দাঁড়াল না।
অনেকদিন পরে অনন্তর সঙ্গে হঠাৎ গণেশ এভিনিউতে দেখা। ওর কাছে শুনেছিলাম দুটি রাজনৈতিক দলের সংঘর্ষে মারা গেছে অধীরের বড়ো ছেলে। ও একটা দলের কর্মী ছিল।
আমরা যখন কলেজে পড়তাম তখন অধীর আর আমি দুটি পরস্পরবিরোধী ইউনিয়নে ছিলাম। অধীর ছিল ওর দলের নেতা। একদিন বিকেলে দুটি ইউনিয়নের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়ে গেল। আমরা পরস্পরকে দেখে নেব এইরকম হুংকার দিয়ে সেদিনের মতো যে যার বাড়ি চলে গেলাম।
পরদিন কলেজে হাতে একটি খাতা ঝুলিয়ে ট্রা-লা-লা করে র‍্যালা নিয়ে ঢুকতে গিয়ে দেখি, ঢোকার মুখে অধীর আর ওর ইউনিয়নের ছেলেরা ওদের দলবল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
পাশ কাটিয়ে চলে যাবার আগেই ধরে ফেলল। অধীর সবাইকে বলল, ‘প্রথম ওকে দিয়ে মার শুরু করা যাক।’
‘আমাকে তোরা মারবি?’ আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম।
‘মারব না? কাল তো কথার ফুলঝুড়ি ছুটছিল। আজ মারের কথা শুনে অমন চুপসে গেলি কেন?’
বললাম, ‘কি শুরু করছিস তোরা। কলেজে মারপিট বিষয়টা আসছে কেন? হাত ছাড় ক্লাসে যাব।’
‘হবে। সব হবে। মারও হবে ক্লাসও হবে। দেখি আজ তোকে কে বাঁচায়।’
‘একদম গায়ে হাত দিয়ে কথা বলবি না। আগে আমার হাত ছাড়।’
‘সবাই মিলে আগে তোকে মারব, তারপর ছাড়ব।’ অধীর বলল।
তখনও নকশাল বিষয়টি সবার মনের ভিতরে ঘুরপাক খাচ্ছে।
বললাম, ‘এই কথা? ঠিক আছে, তাই হোক। দেখি কে কাকে মারে। তবে মারবার আগে আমাকে জামাটা খুলতে দে।’
‘কেন? জামা খুলে কি করবি?’ অধীর বলল। অন্য যারা ছিল আমার কথা শুনে সবাই খুব অবাক হল।
আমার চেহারা দারাসিং,রণধাওয়ার বা এখনকার দিনের সলমন,হৃত্বিক,সানি দেওয়ল বা সঞ্জয়ের মতো নয়,যে আমার প্যাকওয়ালা বডি দেখিয়ে কামাল করে দেব। ওরা বুঝে উঠতে পারছে না কেন আমি জামা খোলার কথা বলছি।
অধীর বলল, ‘তুই জামা খুলে খুব একটা সুবিধা করতে পারবি না। সবাই মিলে এমন পটকান দেব যে, এখানে উলটে থাকবি।’
বললাম, ‘দেখ আমি তোদের সঙ্গে মারপিট করে কোনো সুবিধা করতে চাই না।’
‘তবে?’
‘আমি মার খাবার জন্যই জামা খুলতে চাইছি।’
অধীর আর ওর সঙ্গে যারা এসেছে আমাদের ইউনিয়নের কাউকে পেলে মারবার জন্য তারা কেমন ভ্যাবা গঙ্গারামের মতো হয়ে গেল।
অধীর মেজাজ দেখিয়ে বলল, ‘এই তুই কি বলতে চাইছিস?’
‘দেখ ভাই আমি গরীবের ছেলে। দু’টোর বেশি জামা নেই। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় বেশ ভালো ভালো জামা পরতে। আজ এই জামাটা আমার পাড়ার এক বন্ধুর কাছ থেকে চেয়ে এনেছি। তোরা আমাকে মারবার সময় যদি এই জামাটা ছিঁড়ে যায় বা রক্ত লাগে, সেটা ফেরত দিতে গেলে আমার পাড়ার বন্ধুটিও আমাকে মারবে। দু’বার মার খেলে খুব খারাপ লাগবে। গায়ের ব্যথা তো আছেই, সেটা না হয় সহ্য করে নেব, কিন্তু মনের ব্যাথা? বন্ধুদের কাছে মার খেয়ে এর পরে আয়নার সামনে দাঁড়াতে পারব? লজ্জা করবে না?’
আমার কথা শুনে অধীর হো হো করে হেসে ফেলল। সেই সঙ্গে অন্য বন্ধুরাও।
অধীর বলল, ‘চল তোকে নিয়ে বরং আটকে রাখি।’
আমার বিপক্ষ দলের সবাই আমাকে কলেজ ক্যান্টিনে নিয়ে ঘিরে বসল। যাতে পালাতে না পারি।
সবাইকে খবর দেওয়া হল আমার ইউনিয়নের। কেউ আসছে না। এদিকে একটার পর একটা খাবার, চা,-সিগারেট লাগাতার চলছে। বিকেলের দিকে অধীর বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তোর সেক্রেটারিকে একটা চিঠি লেখ। একবার আসুক তারপর দেখবি কেমন পেটাপেটিটা হয়।’
আমি যেন বন্ধ কারাগারে আটকে আছি, এভাবেই আর্তনাদ ভরা চিঠি লিখলাম।
আমার সেক্রেটারি সবাইকে নিয়ে এল দলবেঁধে।
শুরু হল হইচই। একথা সেকথা। ইউ জি সি-র টাকা কাদের পাওয়া উচিত এই নিয়ে আলোচনা হল। ঠিক হল যারা পেলে তাদের উপকার হবে তাদেরই দেওয়ার জন্য প্রিন্সিপালকে সবাই মিলে গিয়ে বলা হবে। সঙ্গে খাবার, চা,সিগারেটের বন্যা বয়ে গেল।
পরস্পরের প্রতি কোনো হুঙ্কার নেই। মনে হল মাত্র একদিনের বিরহে মুখ ফিরিয়ে থাকা সবাই যেন নতুন করে একে অপরকে খুঁজে পেয়েছে। পাওয়ার পথটা চিনিয়ে দিয়েছে আমাদের সেই অদ্ভুত সময় । পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা বন্ধুত্ব।
রাস্তায় হঠাৎ করে সেদিন দেখা হওয়ার পরে আর কোনদিন অধীরের সঙ্গে দেখা হয়নি।
ফলে ওকে জিজ্ঞাসা করা হয়নি ও কি কখনো ওর ছেলেকে বলেছিল, আমাদের কলেজ জীবনের দুটি ইউনিয়নের সেই মধুর সংঘর্ষের ইতিহাস।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।