‘সেই থেকে কাগজে কিসব হিজিবিজি লিখছ আর ফেলে দিচ্ছ। কেন বল তো?’ প্রতিমা ঝনঝন করে উঠল।
এমনিতেই মেজাজ গরম হয়ে আছে নিরাপদর। তার উপরে প্রতিমার খনখনে গলার আওয়াজ শুনে বলল, ‘ইচ্ছে করছে কলম ভেঙে কাগজ ছিঁড়ে সব গঙ্গার জলে ফেলে দিয়ে আসি।’
‘তোমার এত মেজাজ কেন বলত? অন্য লোকের তো সব রকম চিঠি লিখে দাও। তারা যখন আসে তোমার কাছে, তখন আমাকে চা করে দিতে হয়। ইচ্ছে না থাকলেও ইনিয়ে বিনিয়ে দু’টো কথা বলতে হয়। কই আমি তো কখনো মেজাজ দেখাই না। আর তুমি নিজের ছেলের বিয়ের জন্য একটা চিঠি লিখবে তাতে তোমার এত গায়ে জ্বালা কিসের?
‘কি লিখব বলত?
‘তা আমি বলে দেব?’
‘তোমার নামও তো চিঠিতে থাকবে। তুমি কিছু তো বল।’
প্রতিমা বলল, ‘ওই তো লেখ না । আমাদের ছেলের বিয়ে হচ্ছে বৌভাতের দিন আপনারা আসবেন। খাবেন তাহলেই তো হয়ে গেল।’
‘তুমি তোমার এই কথা লিখে সেটা ছাপতে দিয়ে দাও।’
‘তুমি ওরকম করে কথা বলছ কেন? এই দুটো কথায় কি বিয়ের চিঠি হয়?’
‘আমি কি করে যে লিখব। একটা মেয়েকে জলে ভাসিয়ে দেওয়া হচ্ছে এটা জেনেও তার বিয়ের চিঠি আমাকে লিখতে হবে? আমার ছেলে এখনো কোনো কাজ করে না। তার মামা মন্ত্রী। তার সঙ্গে টো টো করে ঘোরে। কেননা একদিন সেও বড়ো কিছু হবে এই ভরসায়। এটা কি বলার মতো হল?’
‘একটা বিয়ের কার্ড লিখবে তার জন্য এত কথা আসছে কেন?’
‘অন্যের ভালো মন্দের কথাও একটু ভাবতে হয়। মেয়ের বাবা যখন জানতে চাইল যে, ছেলে কোথায় চাকরি করে, তুমি লাফিয়ে পড়ে বললে ওর মামা মন্ত্রী।’
‘তাতে কি হয়েছে? মেয়ের বাবা তো সেই কথা শুনে একেবারে আহ্লাদে গদগদ হয়ে আমাদের গবার সঙ্গে তার একমাত্র কন্যার বিয়ে দিতে রাজিই হলেন।’
‘লোকটা একটা উজবুক।’
‘তোমার পরিচয় দিলে উনি এখানে মেয়ের বিয়ে দিত?
‘একবার বলেই দেখতে পারতে।’
‘কি বলতাম? একটা সরকারি চাকরি কর। খুব ভালো লোক। অন্যায় ভাবে পয়সা রোজগার কর না। একবার ট্যাক্সিতে পাঁচলাখ টাকা পেয়েও বাড়িতে না এনে থানায় জমা দিয়েছিলে। যার টাকা ছিল তার সঙ্গে তোমার খুব বন্ধুত্ব হয়েছে। এসব বলতাম?’
‘বলতে। এইসব শুনলে মেয়ের বাবা ভাবত মেয়েকে একটা ভদ্র বাড়িতে বিয়ে দিচ্ছি।’
প্রতিমা খন খন করে উঠল। বলল, ‘মোটেও ভালো বলত না। যাবার সময় বোকা বলে চলে যেত। ভাবত এই বাড়িতে মেয়ের বিয়ে দিলে তাকে আজীবন না খেয়ে থেকে সততা ধুয়ে জল খেতে হবে।’
‘আহা কি সুন্দর ভাবনা। সত্যি তোমার তুলনা হয় না। একটু ভেবে দেখ এটা কিন্তু ভালো হল না।’
‘ভেবে দেখার কি আছে? মন্ত্রী মানে হচ্ছে একটা বিশাল ব্যাপার। তুমি যত ভাববে দেখবে ভাবনার এরিয়া বেড়ে যাচ্ছে। তুমি তারপরও তল পাবে না।’
‘তোমার দাদা তো অন্য দলে চলে গিয়েছিল। সেই দল তো জিততে পারল না।’
‘গিয়েছিল তো কি হয়েছে? আবার আগের দলে ফিরে আসবে।’
‘সেখানে গিয়েছিল তো লোভে। একটা জবর হাওয়া উঠেছিল। ভেবেছিল সেখানে গেলে আরও কামাতে পারবে। তা হল না। আবার পুরনো দলে ফিরে আসতে লজ্জা করবে না?’
‘লজ্জা করবে কেন। দেখছ না ফিরবার জন্য কেমন ছোটাছুটি করতে শুরু করেছে। বলছে যেখানে গিয়েছিল সেখানে নাকি দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আমার দাদা পুরনো দলে না ফিরলে তো দাদার নামে তদন্ত কমিশন বসান হত।’
‘তখন যদি ধরা পড়ে যায়? নিরাপদ বলল।
‘কেন দোষ না করলেও ধরা পড়বে কেন? দলে না ফিরলেই দোষ। তখন বলবে গদ্দার। বেইমান। ফিরলে বলবে দলের সম্পদ। তুমি এটা জানো না? তোমার এসব না জানার জন্যই আমার এই দুর্দশা। বাবা কেন যে একটা মন্ত্রীর সঙ্গে আমার বিয়েটা দিল না।’
‘সত্যি দুঃখ হয় তোমার জন্য। কেন যে একটা সৎ পাত্রের খোঁজ করলেন উনি।’
‘দেখ তুমি আর এখন নুনের ছিটে দিও না। এখন ছেলের বিয়ের কার্ডটা লিখে দিয়ে আমাকে উদ্ধার কর।’
‘কি লিখব বলত? একটা মেয়েকে জলে ফেলবার জন্য আমার কিছু লিখতে ইচ্ছে করছে না।’
‘অন্যের মেয়ের জন্য তোমাকে ভাবতে হবে না। সে আমার ঘরে এলে তার সুখের কোনো অভাব হবে না। তুমি জান আমার দাদার ছত্রছায়ায় আছে বলে সবাই আমার ছেলেকে দেখলেই চমকে যায়, ভয় পায়। এখন আর আগের মতো তোলার টাকার জন্য বলতে হয় না। নিজেদের কাজের সুবিধার জন্যই মনের আনন্দে টাকা দিয়ে যায়।’
নিরাপদ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল প্রতিমার দিকে। বলল, ‘এরপরেও বিয়ের কার্ডে আমাকে সুপাত্র লিখতেই হবে।’