বেসরকারি হাসপাতালে ফোন করে দিনের পর দিন শুধু যন্ত্র সঙ্গীত শুনতে হল।
কোনো ডাক্তারকে দেখাবার জন্য সময় সুযোগ না পেয়ে পেলাম শুধু ধন্যবাদ। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে যে তাদের সঙ্গে ছিলাম এর জন্য। কোনো প্রয়োজনে আবার যোগাযোগ করতে বলা হল। এরপরে আরো দু’চারবার যোগাযোগ করতে গিয়ে অভিজ্ঞতা একইরকম। তবে ধন্যবাদ জানাতে ভোলেনি।
শুকনো ধন্যবাদে আহ্লাদে গলে জল না হয়ে, ঠিক করলাম কোনো সরকারি হাসপাতালে যাব।
এটা ভাবতেই বহুকাল ধরে দেখা হাসপাতালের চিত্রগুলি চোখের সামনে ভেসে উঠল। বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল আমাকে। যখন কারও আমাকে প্রয়োজন মনে হয়েছে,বলতেই আমি হাজির। বন্ধু,আত্মীয়স্বজন ও কাছের লোকের জন্য।
কলকাতার সরকারি হাসপাতালগুলিতে গিয়ে দেখেছি বিশাল এলাকা নিয়ে এক একটা হাসপাতাল তৈরি করা হয়েছে। সেখানে প্রতিদিনই থিক থিক করছে লোক। রুগি নিয়ে দূর থেকে আসা লোকজন যেন তাদের বাসস্থান গড়ে তুলেছে ওই হাসপাতাল চত্বরে। রুগি ভর্তি আছে। তার বাড়ির লোকজন তো রোজ বাড়ি থেকে হাসপাতালে যাতায়াত করতে পারবে না। তারা এসেছে অনেক দূর থেকে। উপায় নেই এভাবেই থাকতে হবে।
বীরভূম,বাঁকুড়া,মেদিনীপুর,বর্ধমান,বালুরঘাট নাম বলতে গেলে অনেক। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা থেকে চিকিৎসার জন্য আসতে হয়েছে কলকাতায়। যেখানে তারা বসবাস করে সেখানে চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। তারা বাধ্য হয়েছে আসতে।
গ্রামে সাপে কাটলেও ওঝা, পেট ব্যথা হলেও তাই। এতে যে কোনো কাজ হয় না এটা বুঝতে সময় লেগেছে অনেক।
যতবারই কলকাতার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল যেতে হয়েছে গিয়ে দেখেছি একটা পূতিগন্ধময় পরিবেশ। বিভিন্ন জায়গায় নোংরা ছড়ানো। সেগুলি কখনো পরিষ্কার হয় কিনা কে জানে।
আর একটি দৃশ্য যতবারই দেখেছি, দেখে বুক কেঁপে উঠেছে। একদল লোক খাটিয়া ফুল নিয়ে অপেক্ষা করছে। এই যে এত শত শত লোক এসেছে চিকিৎসা করাতে, রোজই কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে। সেখানে আছাড়ি-পিছাড়ি হয়ে কাঁদছে রুগির প্রিয়জনেরা। কখনো চোখের সামনে দেখেছি মৃতদেহ। কিছু করার নেই। এগুলি মেনে নিতেই হবে। হাসপাতালে গেলে দেখতেই হবে এমন দৃশ্য। সব বুঝেও কেমন অসাড় হয়ে এসেছে মনের অবস্থা। এই দৃশ্যে কেমন একটা ভয় জন্মাত মনে।
কাউকে কিছু বলতে পারতাম না। সঙ্গে যারা থাকত তাদের মনের অবস্থাও বোধহয় তেমনই। কেউ কাউকে কিছু বলছি না। আমি যে রুগির জন্য হাসপাতালে এসেছি তাকে সুস্থ করে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারব তো? বার বার মনের ভিতরে এই প্রশ্ন জমাট ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে গেছে।
যখনই কোনো হাসপাতালে পরিচিত কাউকে দেখতে গিয়েছি দেখেছি সেখানে অজস্র বিড়াল ঘোরাফেরা করছে। কুকুরও নজরে পড়েছে অনেক সময়। রোগ ছড়িয়ে পড়ার সুন্দর ব্যবস্থা।
কখনো কোনো রুগিকে বাড়ি নিয়ে আসবার সময় গিয়েছি পরিচিত লোকের সঙ্গে। আচমকা চারিদিক থেকে ঘিরে ধরেছে পাওনাদার। সুস্থ করে হাসপাতাল থেকে প্রিয়জনকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আনন্দ মাটি করে দিয়েছে এরা। আমাদের মনে একটা খুশির ভাব ছিল। যতটা সম্ভব হয়েছে ঘিরে থাকা লোকজনদের সাধ্য মতো খুশি করতে চেষ্টা করেছি। এই ভয়ংকর পাওনাদারেরা কিছুতেই যেন সন্তুষ্ট নয়। এতটাই বেশি চাহিদা তাদের, যা কিছুতেই মিটতে চায় না।
যদিও যখন রুগি ভর্তি ছিল তখন কোনো প্রয়োজনে এদের কখনোই চট করে পাওয়া যায়নি। সাহায্য চাইতে গেলে এরা পাশ কাটিয়ে গেছে। আয়া রাখতে হয়েছে। প্রয়োজনের সময় সে অদৃশ্য। একটা আড্ডার জটলা থেকে যখন খুঁজে এনেছি, দেখেছি ডাকার জন্য সে খুবই অসন্তুষ্ট।
রুগি বিছানায় শুয়ে অসুস্থ শরীর নিয়ে নিজের চোখে দেখেছে এদের হাতে অন্য রুগির হেনস্থা। আমাদের বলেছে, কিছু না বলতে। বলা হয়নি। সামান্য সময়ের জন্য রুগিকে দেখতে আসা। কিছু করার নেই। বাকি সময় তো হাসপাতালে এদের আওতায় রুগিকে রাখতে হবে!
দরকারের সময় যাদের দেখিনি, ডেকে পাইনি রুগিকে বাড়ি নিয়ে যাবার সময় এদের চাহিদার কাছে শেষ পর্যন্ত মেজাজ হারাতে বাধ্য হয়েছি। হাসপাতালের কাছাকাছি যে পরিচিত লোকজন আছে সবাইকে খবর দিতে যখন এসেছে তাদের দেখে পাওনাদারেরা অল্পে সন্তুষ্ট হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে।
কাউকে সুস্থ করে নিয়ে যাওয়ার সময় যেমন, তেমন কোন রুগি মারা গেলেও। একই অবস্থা। এই বিশালবাহিনীকে দেখেছি প্রায় প্রতিটি হাসপাতালে। যেন সব একই মেশিনে তৈরি। কেমন পাথরের চোখের মতো স্থির চাউনি। এদের শেখানো হয়েছে মানুষ হিসেবে কেউ ছোটো নয়। সবার সমান অধিকার আছে। এই অধিকার চাইলে পাওয়া যায় না। ছিনিয়ে নিতে হয়। এইসব শুনে করে খাওয়ার যে উল্লাস তাদের ভিতরে তা যে অন্যের কাছে ভয়ানক হয়ে দেখা দিচ্ছে এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়নি।
এটা যেমন দেখেছি সত্তরের দশকে তারপর আশি,নব্বই পেরিয়ে এই সেদিনও অভিজ্ঞতা একই রকম রয়ে গেছে। মানুষের অবস্থা হয়েছে তপ্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে লাফ দেওয়ার মতো।
সেই সত্তরের দশকে আমার একজন পরিচিত ছেলে একটি হাসপাতালের রুগিদের খাবার দিত। আমাকে বলেছিল, ‘একদিন অফিস যাওয়ার পথে আমার এখানে এসে খেয়ে যেও।’
হাসপাতালের খাবারের যে অবস্থা বিভিন্ন সময়ে আমি দেখেছি বা শুনেছি সেই কথা মনে করে তীব্র আপত্তি জানালাম। এই হাসপাতালেই আমার বন্ধুর সঙ্গে এসেছিলাম ওর মায়ের জন্য খাবার নিয়ে। যে খাবার দেওয়া হত তা খেতে পারা যেত না। বললাম, ‘ওই খাবার আমি খেতে পারব না।’
‘তোমার জন্য আলাদা খাবার থাকবে।’
বলেছিলাম, ‘রুগিদের তো তেমন খাবার দেওয়া হয় না। যা দাও তা তো মুখে দেওয়া যায় না। পুষ্টি তো অনেক দূরের কথা।’
আমার কথা শুনে যা বলল তাতে বুঝলাম খাবার দেওয়ার জন্য যোগ্য হতে গেলে যে পরিমাণ কাঠ-খড় পোড়াতে হয় তাতে রুগিদের জন্য ভালো খাবার দেওয়ার উপায় থাকে না। এটা শুধু এই একটি হাসপাতালে নয়, সব হাসপাতালেই। ফেল কড়ি মাখো তেল। দিনের পর দিন যা চলেছে আজও তাই হয়ে আসছে।
যদি আমার এই কথা কেউ মানতে না চান তবে তাঁকে বলব যে কোনো হাসপাতালে ছদ্মবেশে আমজনতার সঙ্গে গিয়ে দশদিন থেকে আসুন তাহলেই বুঝবেন কত ধানে কত চাল। কাউকে ভুল করেও যেন বলবেন না যে আপনি কোন রাজার জামাই। তবে বুঝবেন যা বলছি তা ঠিক না ভুল।
শুধু এই! আছে হরেকরকম। রুগির অপারেশন হবে। ডাক্তারের কথা মতো ওষুধপত্র স্যালাইনের বোতল কিনে দেওয়া হল। অপারেশনের পরে সবাই রুগি নিয়ে আমরা ব্যস্ত। একজন ডাক্তারবাবুর কথায় আবার যখন স্যালাইন আনতে পাঠাচ্ছি তিনি অবাক হয়ে বললেন, ‘আপনাদের আবার কিনতে হবে কেন? যখন অপারেশন হয়েছে অনেক কিছুর প্রয়োজন হয়নি। গিয়ে খোঁজ করুন।’
গেলাম। যেখানে অপরেশন হয়েছিল সেখানে যারা ছিল অস্বীকার করল। বললাম, ‘থানায় জানাব।’
বিকেলে আমার ডাক পড়ল। পুলিশকে জানাব বলেছি এত সাহস আমার! তাদের প্রচন্ড রাগ। ধমকের সুরে বলল, ‘আপনার রুগি কিন্তু এই হাসপাতলে আছে। থাকবে। এটা মাথায় রাখবেন। আমাদের পুলিশ দেখাবেন না।’
সেদিন কিল খেয়ে তা হজম করা কাকে বলে সেটা বুঝেছিলাম। বহু বছর ধরে এই ভাবে নানান বিষয়ে কিল খেয়ে হজম করার শক্তি আয়ত্ব করতে হয়েছে আমাদের।
আমাদের ভিতরের আস্ফালন রুদ্ধদ্বারে মাথা কুটে মরেছে। এখন শুনি রাজ্যের দিকে দিকে হাসপাতালগুলি নাকি সুপার-ডুপার হিট ছবির মতো হয়েছে। হয়নি। ছবি হিট দেখালেও জনগণকে সব গোলা গল্প খাইয়ে দেওয়া হয়েছে।
তাই যদি হত তবে পায়ে আঘাত পেয়ে জেলায় চিকিৎসা না পেয়ে ছুটে আসতে হয় কলকাতায়? সেখানেও এমনই চিকিৎসাব্যবস্থা যে এক মাসের মধ্যেও পায়ের চোটের কোন উন্নতি হয় না!
দুর্ঘটনায় রাজার দুলালের চোখে আঘাত লাগলে রাজ্যে চিকিৎসা না করে যেতে হয় অন্যত্র!
মনে হল রুগ্ন শরীরে পাউডারের প্রলেপ ও ঠোঁটে রঙ লাগিয়ে চোখ ভোলানোর চেষ্টা করা গেলেও মন যে কিছুতেই ভোলে না।
তবে আমজনতা যায় কোথায়! গেলাম রবীন্দ্রসদনের কাছে একটি হাসপাতলে। টিকিট নিতে হবে দু’টাকা দিয়ে। বিশাল একটা লাইনের পিছনে দাঁড়ালাম। একবার ভাবলাম বাড়ি চলে যাই। পরক্ষণেই মনে হল যারা দাঁড়িয়ে আছে ওরাও তো মানুষ। সবাই পারলে আমি পারব না কেন।
রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন এসেছে চিকিৎসার আশায়। অনেকের সঙ্গে আলাপ করলাম। শুনলাম কার কি রোগ হয়েছে। আগের দিন এসে কেমন করে স্টেশনে রাত কাটিয়েছে। গ্রামের গল্প। কেমন করে দিন কাটে তাদের।
যখন একটা টিকিট পেলাম দেখলাম আমার নম্বর চারশোর উপরে।
এই হাসপাতালেই তো প্যানিক অ্যাটাক নামে একটি রাজকীয় রোগের সমাধান হতে শুনেছি। শুধু অ্যান্টাসিড আর ঘুমের ট্যাবলেট খাইয়ে। চিকিৎসা শাস্ত্রের এই মহান পীঠস্থানে সুচিকিৎসা পাওয়ার জন্যই বুঝি এত লোকের সমাগম! আহা আমি এইখানে! এই তীর্থস্থানে।
তারপরেও অপেক্ষার যেন শেষ নেই। আমার পরেও তো লাইনে অনেক লোক দাঁড়িয়েছিল। আমি যখন ডাক পেলাম তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে।
একজন ডাক্তারের মুখোমুখি বসলাম। আমার অসুবিধার কথা বললাম। মন দিয়ে শুনলেন তিনি।
একটা ঘরে চারজন ডাক্তার বসেছেন। সুন্দর চেহারা তাঁদের। সবাই আমার চাইতে বয়সে ছোটো। বললাম, ‘আমার আপনাদের একটা কথা বলার ছিল।’
সবাই অবাক হয়ে তাকাল।
একজন বললেন, ‘বলুন।’
বললাম, ‘সকাল থেকে আপনারা এত রুগি দেখেই চলেছেন। এরপরেও এতটুকু বিরিক্ত না হয়ে আপনারা হাসিমুখে থাকেন কি করে?’
এমন অদ্ভুত প্রশ্নের উত্তর দেবার কথা বোধহয় কখনো ভাবেননি তাঁরা। আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
বললাম, ‘এইজন্যই আপনাদের শুধু ডাক্তার না, আপনারা জানেন অনেকে দেবতাও বলে।’
তাঁরা আমাকে কিছু বলবার আগেই আমি ঘরের বাইরে চলে এলাম।