সাপ্তাহিক টুকরো হাসিতে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় – পঁয়তাল্লিশ


টুকরো হাসি-পঁয়তাল্লিশ

আমিও হতাশ

কেকার বিয়ে ঠিক হল অবিনাশের সঙ্গে। ও একজন ডাক্তার।বাড়ির সবাই খুব খুশি। কেকার বাবা বলল,‘এখনকার দিনে এইরকম ভালো ছেলে পাওয়া যায় না। ডাক্তার হয়েও ছেলেটির কোনো অহংকার নেই। খুব সাদাসিধে।এমন একটা ছেলেকেই জামাই করতে চেয়েছিলাম।সুধাকর খোঁজটা দিল।ওর খুব কাছের লোক পাত্রের বাবা।’
এইসব কথা আড়াল থেকে শুনল কেকা।
কেকার মা ওকে বলল,‘আমরা ছেলেকে দেখেছি।আমার তো খুব পছন্দ।ছেলের বাবা মাকে তোর ছবি দেখিয়েছি।ওদের খুব পছন্দ হয়েছে তোকে।ছেলে তোর ছবিও দেখেনি। বলেছে, বাবা মায়ের পছন্দই নাকি তার পছন্দ।এমনই ভালো ছেলে।’
ছেলে তার বাবা মায়ের কথায় ভরসা করতে পারে কিন্তু কেকা ঠিক করেছে সে কারও উপর করবে না। নিজে ছেলেকে দেখবে।তার সঙ্গে কথা বলবে।তারপর সিদ্ধান্ত নেবে।বাবা মায়ের চিন্তাভাবনা বড্ড সেকেলে।এখনকার দিনে ওসব চলে না। ছেলে কতটা ভালো সেই ভালোমানুষ ছেলেতে তার চলবে কী না তা খতিয়ে দেখতে হবে।
বাবা মায়ের কথায় ভুল বোঝার দিনকাল এখন আর নেই।সে এইসব কথা বাবাকে বলতে পারবে না।মাকে বলল।
মা বলল, ‘ছেলে তোকে না দেখে তার বাবা মায়ের কথায় বিয়ে করতে রাজি হল আর তোর ছেলের সঙ্গে কথা না বললে চলছে না!তোর এত বাহানা কীসের?’
‘বাহানাই বল আর যাই বল আমি আমার মতো।আমি ছেলের সঙ্গে কথা না বলে হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবো না। সে তুমি আমাকে যাই বল।’
কেকার মা বলল,‘আমিতো ছেলের বাড়িতে গিয়ে ছেলেকে দেখেছি।কি সুন্দর দেখতে। শান্ত ভদ্র। আমাদের ওর চেম্বারে নিয়ে গেল।একটা সুন্দর জায়গায় ওর চেম্বার। কত লোকজন ছেলেটিকে ভালোবাসে। আমরা তো চোখের সামনে দেখলাম রাস্তায় ছেলেটিকে যে দেখছে সেই জোড়হাত করে বলছে, ডাক্তারবাবু নমস্কার।’
কেকা বলল, ‘সে তুমি যতই বল আমি তোমার ওই সুপাত্রের সঙ্গে কথা বলে বুঝবার চেষ্টা করব সে কেমন টাইপের ডাক্তার। আজকের দিনে চলবে কী না।’
কেকা অবিনাশের চেম্বারে গেল।সেখানে দুজন রোগী ছিল।তাদের দেখে কেকাকে বলল,‘আপনার কী হয়েছে?’
‘আমি কেকা।’
‘বসুন।’
 কেকা বসে বলল, ‘আপনাকে আমার কিছু প্রশ্ন করার ছিল।’
‘বলুন।’
‘আপনার সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।আপনি জানেন?’
‘আগে বুঝতে পারিনি। নাম শুনে বুঝলাম।’
‘আমাকে দেখে আপনার কিছু মনে হচ্ছে না?’ 
‘প্রশ্ন করবেন শুনে দিদিমনির মতো মনে হচ্ছে।’

‘আপনার রোগীরা কি সব যেমন দেখলাম এইরকম গরীব গরীব মার্কা দেখতে?’
‘এই অঞ্চলে এরকম লোকজনেরাই বেশি থাকে। অসুখ বিসুখ হলে আমার কাছে আসে।’
‘ওদের মতো রোগী দেখে আপনার চলে?’
‘মোটামুটি।’
‘বড়োলোক রোগী আপনার কাছে আসে না?’
‘না যাদের টাকা পয়সা আছে তারা শহরে যায়।’
‘আপনি শহরে গিয়ে একটা চেম্বার করছেন না কেন?’
‘এই লোকগুলি তবে কোথায় যাবে? ওদের তো টাকা পয়সা নেই, আমি তাই ওদের দেখি।’
‘আপনি যদি চান আমি বাবাকে বলে আপনাকে একটা সুন্দর নার্সিংহোম তৈরি করে দিতে বলব।’
‘আমি চাইব কেন?’
‘আপনার তাতে প্রচুর রোজগার হবে।রোগী মারা যাওয়ার পরেও আপনি বেঁচে আছে বলে টাকা নেবেন।আরও নানা কারবার করতে পারবেন।তখন এত টাকা পয়সা হবে আমাদের যে আপনি ভাবতে পারছেন না।’
‘আমি আপনার বাবার কাছ থেকে টাকা চাইব কেন? যা করব আমার মতো করে আমি নিজে করব।’
‘তবে এখানে পড়ে না থেকে আপনি তো নেতা মন্ত্রী হতে পারেন।এখন তো অনেক ডাক্তার তাই হচ্ছে। আপনি তাহলে হবেন না কেন?’
‘হয়ে কি হবে?’
‘আশ্চর্য কথা!আপনি একটা সরকারি হাসপাতালের প্রধান হতে পারলে আপনার অঞ্চলে যত কুকুর আছে সবার ডায়ালিসিস করতে পারবেন। নামিদামি ওষুধ পাচার করতে পারবেন হাসপাতাল থেকে।আমি তখন পঞ্চাশ জায়গায় দরখাস্ত করে পঞ্চাশটা চাকরি পাবো।’
‘আমি তো ওসব করার জন্য ডাক্তার হইনি।’
‘তবে কি জন্য হয়েছেন? আপনি কেন পারছেন না ধরে করে একজন সাংসদ হতে। তখন তো অনেক ক্ষমতা হবে আপনার। মনে যা আসে তাই বলবেন। অন্য কেউ কিছু বলতে গেলে আপনি তার হাত থেকে কাগজ কেড়ে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলতে পারবেন। আপনার তখন অনেক ক্ষমতা হবে। আপনার তখন উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।আমার খুব গর্ব হবে।’
‘আপনার তাতে গর্ব হবে কেন?’
‘গর্ব হবে না! আপনাকে বিয়ে করলে স্ত্রী হিসেবে আমারই তো মাটিতে পা পড়বে না।’
অবিনাশ চুপ করে বসে রইল।
কেকা বলল,‘যেমন আপনার চেম্বারের অবস্থা তেমনই রোগীদের। নিজের উন্নতির কথা ভাবুন। আমার বাবা বলেছে আপনি খুব আদর্শবান ছেলে। আমি ওই আদর্শ দিয়ে কি করব? আদর্শ দিয়ে কি আমি চা বানিয়ে খাবো? শুনুন আমার মায়ের চোখে আপনি সুপাত্র।আমার এমন সুপাত্র চলবে না।কোটি কোটি টাকা কামাতে হবে। বুঝলেন কোটি কোটি টাকা। পারবেন?’
‘আমি ওসবে নেই।’
‘তবে আমিও আপনার সঙ্গে বিয়েতে নেই।আপনি ফোন করে আমার বাবা মাকে বলে দেবেন যে,তাদের মেয়েকে পছন্দ হয়নি।’
‘এই মিথ্যা কথাটা আমাকে বলতেই হবে?’
‘তার মানে? আমাকে আপনার পছন্দ হয়েছে? তবে আমি যা কিছু বললাম তাতে আপনি রাজি?’
‘না। আমার দ্বারা ওসব হবে না।’
‘তবে আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারব না।’
‘আপনার মধ্যে এত সব চাহিদা তো আপনাকে দেখে বোঝা যায় না।’
‘আপনি যে কোনো কম্মের না।এই সময়ে অচল সেটা কিন্তু দেখলেই বোঝা যায়।যুগ কত এগিয়ে চলেছে। আর আপনি আদর্শ ধরে ঝুলে আছেন। আমি হতাশ।’
অবিনাশ বলল, ‘আমিও হতাশ।’

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।