সাপ্তাহিক গল্প নেই-তে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় – ৩৭


গল্প নেই – ৩৭

     তখন ছোটো ছিলাম। টোটনকে দেখতাম কুকুরের বাচ্চাকে নিয়ে পুকুরে ছেড়ে দিত। সেই বাচ্চা কুকুরটা কোনরকমে ডাঙায় উঠে আসত। বেঁচে গিয়ে কেঁউ কেঁউ করে অসহায়ের মতো আওয়াজ করত। আমরা বন্ধুরা ওকে এমনটা করতে মানা করতাম। ও আমাদের কথা কিছুতেই শুনত না। কুকুরটা ওদের বাড়ির কুকুর। ও বলত, এই কুকুরটা নিয়ে ও যা খুশি করতেই পারে এতে আমাদের কিছু বলার থাকতে পারে না।
   এখন যেমন কুকুর বা এমন কোনো প্রাণীকে এইভাবে কষ্ট দিলে চারিদিক থেকে প্রতিবাদ ওঠে তখন তেমন ছিল না। কুকুর কুকুরই হয়। ওটিকে লাঠিপেটা করা যায়,জলে ফেলা যায়, লেজে ফুলঝুরি বেঁধে আগুন জ্বালানো যায়।
   বাচ্চা কুকুরটি যতক্ষণ না জল থেকে সাঁতরে উঠছে আমরা দমবন্ধ করে থাকতাম। মনে হত যদি না উঠতে পারে! উঠে এলে আমরা নিশ্চিন্ত হতাম। মনে হত বেচারা এ যাত্রা বেঁচে গেল।
   আমরা যে ক’জন বন্ধু ছিলাম তারা ইচ্ছে করলে টোটন কে ধরে কঠিন শাস্তি দিতে পারতাম। তবে হয়ত ভয়ে ওই রকম কাজ আর করত না। তা কখনো হয় নি। কে আর একটি কুকুরের জন্য শুধু শুধু ঝামেলা করবে! আমরা ওর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিলাম।
    টোটোন ওর স্বভাবের কোনো পরিবর্তন করেনি। একসময় শুনলাম ও অনেকের সঙ্গে মারপিট করছে। একদিন অন্যপাড়ায় একজনের সঙ্গে মারপিট করতে গিয়ে অনেকের কাছে বেদম মার খেয়ে এল। প্রায় পনেরোদিনের মতো হাসপাতালে ছিল। তারপরে আশ্চর্যজনকভাবে শান্ত হয়ে গেল।
   তখন আমাদের সঙ্গে মিশতে এলেও আমরা সময় দিতে পারতাম না।স্কুল, কোচিং ক্লাস, পরীক্ষা এসব করেই সময় কেটে যেত আমাদের। টোটনের ওসবের বালাই ছিল না। তবে শুনেছি ও এমন ভাব দেখায় যেন সব জানে। লোকজনের সামনে মাঝে মাঝে ভুল সব বক বক করে। সবাই আড়ালে হাসে।
   এখনও মাঝে মাঝে ওই কুকুরের মুখটা মনে পড়ে। সত্যি কী অসহায় ছিল!
   মানুষকে দেখেছি অসহায় হয়ে ডি এ পাওয়ার জন্য আন্দোলন করলে তাদের ঘেউ ঘেউ করতে বারণ করা হয়। প্রথম যেদিন এই কথাটি শুনেছিলাম সেদিন আচমকা আমার সেই ছোটবেলায় দেখা ডুবে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচতে চাওয়া বাচ্চা কুকুরের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল।
   এত বছর বাদে ইদানিং খুব বেশি করে ওই বাচ্চা কুকুরটির কথা মনে পড়ে। আম্পান,ইয়াস,বাঁধ ভেঙে যাওয়া এইসবের জন্য কত মানুষ জলবন্দি হয়ে আছে। 
আজও শহরের মানুষেরও খুব খারাপ অবস্থা। জলে ডুবে থাকা বিদ্যুৎ-এর খোলা তার কেড়ে নিয়েছে অনেক প্রাণ।
   গ্রামের অবস্থা তো আরও শোচনীয়। সেই বাচ্চা কুকুরটি মতো অনেক মানুষের যাবতীয় কিছু জলে ডুবে আছে। ডুবে আছে তাদের ঘরবাড়ি, শস্য ক্ষেত আরও কতকিছু।
   উৎসব আসে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয়। ভোট আসে উল্লাস হয়। বানভাসি মানুষদের অবস্থা থাকে একইরকম ।    
একদিন জল নামে। চোখের জলও শুকোয়। শুকোতেই হয়। কেননা ওই চোখে তো বছরের পর বছর আরও জল ভরতে হবে। আমরা সাময়িক নিশ্চিন্ত হই। ভাবি যাক এবারের মতো লোকগুলি বেঁচে গেল।
   একদিন টোটনকে আমরা কিছু করতে পারিনি। যদিও সংখ্যায় বেশি ছিলাম। এখনও সংখ্যায় বেশি হলেও আমাদের বারবার ভুল করে চুপ করে থাকতে হয়।
   একদিকে বৈভব বাড়তে থাকে। নির্লজ্জ সুযোগে একদল বছরের পর বছর মহান হতে থাকে। আমাদের কিছু বলার থাকে না।
    কিছু বললেই যে ঘেউ ঘেউ করা হবে!
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।