টুকরো হাসি – চুয়াল্লিশ
বাদুড়গুলি তো আমাকে কামড়াবে
দিশাকে নিয়ে মহা সমস্যায় পড়েছে মৃদুল। করোনার জন্য যখন সব বন্ধ হয়ে গেল তখন মৃদুলকে বাড়িতে বসে অফিসের কাজ করতে দেখে খুব মজা পেয়েছিল দিশা। অফিসের রান্না নেই। জীবনে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। বেশ গড়িয়ে গড়িয়ে দিনগুলি কাটছিল।
এই ভয়ে ভয়ে থাকা নিশ্চিন্ত দিনগুলির মধ্যে হঠাৎ একদিন ভয়ে কেঁপে উঠল দিশা। চিৎকার করে মৃদুলকে ডাকল। মৃদল দেখল টিভিতে একটা সংবাদ চ্যানেল খুলে সোফার উপরে পা তুলে চোখে মুখে আতঙ্ক নিয়ে বসে আছে দিশা।
‘কি হল?’
দিশা আঙ্গুল তুলে টিভির দিকে দেখাল। মৃদুল দেখল রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহ হুক দিয়ে টেনে গাড়িতে তোলা হচ্ছে। এই দৃশ্যটি বারবার দেখাচ্ছে আর জানাচ্ছে এই খবর একমাত্র আমরাই দেখাচ্ছি। চট করে চ্যানেল পাল্টে দিল মৃদুল। যেখানে নাচ গান হচ্ছে সেখানে দিয়ে দিশাকে বলল, ‘তোমাকে কতবার বলেছি কোন খবর দেখবে না।’
দিশা বলল, ‘কি করব? এদিক ওদিক চ্যানেল দেখতে দেখতে এটা চলে এসেছে।’
মৃদুল বলল, ‘তুমি ঘরের ভেতরে বসে ভয় পাচ্ছ কেন? পা নামিয়ে বস।’
দিশা পা নামাতে গিয়েও নামাল না। তার মনের অবস্থা এমন তাতে মনে হচ্ছে যেন পা নামালেই ওই মৃতদেহগুলোতে তার পা ঠেকে যাবে।
মৃদুল অফিসের কাজ বন্ধ রেখে দিশার সঙ্গে কথা বলে ওর মন থেকে ভয় তাড়াতে চাইল। বলল, ‘অত চিন্তা কোরো না। এর মধ্যেই ভ্যাকসিন দেওয়া নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বলছে তো ওটা নিলে আর কোনো ভয় থাকবে না। তুমি কোনো খবরের চ্যানেলে না গিয়ে সিরিয়াল দেখে সময় কাটাও। না হয় বই পড়।’
বই পড়তে বলায় দিশা রেগে গেল। অনেক কষ্টে ওকে শান্ত করল মৃদুল।
এরই মধ্যে ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হতেই দুজনেই প্রথম ডোজ নিল। বেশ কিছুদিন ভালো ছিল দিশা। সে বহুদিন খবর দেখে না।
চারিদিকে যত খবর সে কিছু জানে না। এতে খুব অবাক হয়েছে ওর বান্ধবী ডায়না। এই নিয়ে দু’চার কথা শুনিয়েও দিয়েছে। বলেছে, ‘আপডেট থাক। চিরকাল বোকা হয়ে থাকিস না।’ ডায়নার অমন কটর কটর কথা শুনে দিশা আবার খবর দেখা শুরু করল।
খবরে কেউ বলছে, ভ্যাকসিন পাঠিয়েছে। আবার কেউ বলছে, না দেয়নি। এই নিয়ে সারাদিন আকচা আকচি। লাইনে দাঁড়িয়ে ভ্যাকসিন না পেয়ে অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এই নিয়ে প্রতিক্রিয়া নেওয়ার জন্য সাংবাদিকরা এর ওর কাছে ছোটাছুটি করছে। প্রায় হাডুডু খেলার মতো ব্যাপার।
বিনা পয়সার ভ্যাকসিন পয়সা দিলেই চোরাপথে পাওয়া যাচ্ছে। এই নিয়ে জানাজানি হতে চারিদিকে মজাই মজা। ভুয়ো ভ্যাকসিনও দেওয়া হয়েছে। এইসব খবরে যেন উৎসবের মতো অবস্থা। এই নিয়ে একদিন বেজায় হইচই হল। মানুষ উত্তেজিত।
একদিন ভ্যাকসিন নেবার লাইনে পুলিশের লাঠিচার্জ দেখে কেমন ভয় হল দিশার। তাদের এখনও দ্বিতীয় ডোজ নেওয়া হয়নি। পুলিশের লাঠির কথা ভেবে সারাদিন আতঙ্কে থাকে দিশা। রাতে ঘুম হয় না।
নানা নিয়ম কানুনের কথা বলা হচ্ছে। অথচ যেভাবে লাইন দিচ্ছে সবাই তাতে করোনাকে তো নিমন্ত্রণ করে আনা হচ্ছে। কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল তা বুঝে ওঠা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।
এসব নিয়ে বেশি ভাবতে নেই একথা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে গেছে মৃদুল। সে দিশাকে একদিন বলল, ‘যেদিন টিভি আর খবরের কাগজ থাকবে না সেদিন করোনাও হাওয়া হয়ে যাবে। তুমি করোনা নিয়ে ভাববে না।’
ভয়ে ভয়ে হলেও দিশা মাঝে মাঝে মৃদুলকে লুকিয়ে টিভি খুলে খবর দেখছে। ডায়না বলেছে খবর না দেখলে পিছিয়ে পড়তে হবে। ফলে টিভি দেখছে আর না ভেবে স্থির থাকতে পারছে না। আজকাল সব কাজে কেমন ভুল হয়ে যাচ্ছে। টালমাটাল হয়ে আছে মাথাটা।
এইসব শুনে সবাই মৃদুলকে পরামর্শ দিচ্ছে দিশাকে ডাক্তার দেখাতে। একজন ভালো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কে দেখাতে পারলে ভালো হয়। তখন দিশা নিশ্চয়ই স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
অখিল ফোন করে মৃদুলকে একজন ডাক্তারের সন্ধান দিতে সে দিশাকে সেখানে নিয়ে যাবার কথা ভাবল। একমাস পরে দিন পাওয়া গেল। এতদিন মৃদুল কি করবে? কি করে সামলাবে দিশাকে। বুঝতে পারল না।
একদিন দিশা বলল, ‘জানো আজকে শুনলাম নিপা ভাইরাস নাকি আবার ফিরে এসেছে।’
‘আবার তুমি খবর দেখেছ? বলেছি না ওসব ছাতার মাথা দেখবে না।’
‘কি করব! চ্যানেলটা এসে গেল তো।জানো কাল আমি যে আপেলটা খেয়ে ছিলাম সেটাতে কেমন একটা দাগ ছিল। তোমাকেও তো দিলাম।’
‘ওইরকম দাগ থাকে। ওতে অত ভাবার কিছু নেই।’
দিশা বলল, ‘আমার কি মনে হয় জানো ওটা বোধহয় বাদুড়ে কামড়ানোর দাগ। আমার খুব ভয় করছে।’
তারপর থেকে দিশার শুধু একটা কথাই মনে হয় যে তার নিপা ভাইরাস হয়েছে। এইভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর দিশার মনের সাংঘাতিক অবস্থা। একদিন বলল, ‘দেখ আমার মনে হচ্ছে গাদা গাদা বাদুড় এসে আমার গায়ে পড়ছে।’এই বলে সে তার গা থেকে বাদুড় তুলে নিয়ে মেঝেতে ফেলতে লাগল।
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার দিন দিশা বলল, ‘ডাক্তার কিছু করতে পারবে না। তুমি বন দপ্তরের অফিসে খবর দাও।ওরা এসে আমার গা থেকে বাদুড়গুলিকে নিয়ে যাক। জঙ্গলে রেখে আসুক। তা না হলে আমি নিপা ভাইরাসেই মারা যাব।’
মৃদুল বলল, ‘সে না হয় আমি খবর দেব, এখন তো ডাক্তারের কাছে চল। দেখি ডাক্তারবাবু কি বলেন।’
সব শুনে ডাক্তারবাবু গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘এসব হচ্ছে দুর্বল মনের লক্ষণ। যা দেখেছেন সব মনের ভুল। আমি যেমন বলব তা শুনলে আর মেনে চললে আপনি ভালো হয়ে যাবেন। মনটাকে শক্ত করতে হবে। বিচলিত হতে দিলে চলবে না।’
দিশা তার হাত থেকে শাড়ি থেকে বাদুড় তুলে তুলে ডাক্তারের দিকে ছুড়তে লাগল। বলল, ‘ডাক্তারবাবু আপনার চেম্বারের মধ্যে একটা দুটো নয় অনেক অনেক বাদুড় আছে। সব আমার গায়ে বসছে। বিশ্বাস করুন আমি একটুও মিথ্যা বলছি না।’
দিশার দিকে তাকিয়ে ডাক্তারবাবুর চোখ গোল গোল হয়ে গেল।
দিশাকে দেখে মৃদুলের মনে খুব কষ্ট হচ্ছে। সে ভাবল কি হয় দেখা যাক। ডাক্তারবাবু যদি ওর অযথা বাদুড় দেখার রোগ সারাতে পারে তবে সে বেঁচে যায়।
দিশা তার গা থেকে বাদুড় তুলে তুলে ডাক্তারের দিকে ছুড়ে দিচ্ছে আর বলছে, ‘এই দেখুন ডাক্তারবাবু কত বাদুড়। আপনি তো আমার কথা বিশ্বাস করছেন না। এখন আমি আপনার গায়ে সব ফেলে দিচ্ছি।’
ডাক্তারবাবু আতঙ্কে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আরে করছেন কি? এভাবে আমার গায়ে ছুড়লে বাদুড়গুলি তো আমাকে কামড়াবে।’