সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্তী (ইতিহাস কথা পর্ব ৫)

শ্রীরামপুরের কথা

ইতিমধ্যে হাজির হল মহা বিপর্যয়। মুর্শিদাবাদ থেকে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পঞ্চাশ হাজার সৈন্য, কামান, হাতি, ঘোড়া সমেত পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধসাজে রওনা হলেন কলকাতার উদ্দেশ্যে। ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ড্রেক সাহেব ও হলওয়েল সাহেব নাকি লুকিয়ে আশ্রয় দিয়েছেন রাজা রাজবল্লভের ছেলেকে। তিনি ঢাকা থেকে কলকাতায় এসে নবাবকে চোখে ধুলো দিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন ইংরেজদের ছাতার তলায়। রাজা রাজবল্লভের সাথে নবাব সিরাজের বিবাদের বিষয়টি পুরনো ও পারিবারিক। শুধু তাঁর ছেলেকে আশ্রয়দানই নয়, নবাবকে লুকিয়ে ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গও বেড়ে উঠেছে রমরম করে। দূর থেকে দেখা যায় তার নিশান। নবাবের কানে পৌঁছেছে সেই খবর। দাদু আলীবর্দির মৃত্যুর পর নতুন নবাব পদে তিনি অভিষিক্ত হলে ইংরেজ কোম্পানি নিদেনপক্ষে কোনও উপহারও পৌঁছে দেয় নি মুর্শিদাবাদের কেল্লা নিজামতে। তাই নবাবের সমস্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ এই কলকাতা আক্রমণ। ইতিহাসপ্রেমীরা কলকাতায় বিখ্যাত লালদীঘির যুদ্ধের কথা কে না জানেন। সে যাই হোক, বিরাট সমরসাজে নবাব সিরাজ ঘাঁটি ফেললেন গঙ্গার পূর্বদিকে (বর্তমান নবাবগঞ্জ)। উল্টোদিকেই শ্রীরামপুর। ড্যানিশদের সদ্য তৈরি হওয়া কলোনি। যথারীতিই অতিরিক্ত সৈন্য ও অস্ত্রের জন্য তাদের চিঠি পাঠালেন নবাব। কিন্তু নতুন বানিজ্য শুরু করেই যুদ্ধের মতো গুরুতর বিষয়ে নিজেদের জড়িয়ে ফেলবেন এমন নির্বুদ্ধির পরিচয় দিলেন না অধ্যক্ষ সর্টম্যান সাহেব। তিনিও নবাবকে সসম্মানে জানালেন নতুন উপনিবেশে তাদের সৈন্য বা অস্ত্রসরঞ্জামে অভাবের কথা। একরকম যাহোক করে দিন চলে তাদের। নবাব-ইংরেজ যুদ্ধে যোগদানের মতো শক্তি তাদের কোনোভাবেই হয় নি এখনো। প্রত্যুত্তরের চিঠি পেয়ে নবাবও কথা না বাড়িয়ে এগিয়ে গেলেন কলকাতার দিকে। তারপরের কাহিনী ইতিহাসপ্রেমীরা কে না জানেন। এমনকি এরপর পলাশীর যুদ্ধে ফরাসীরা (সিঁনফ্রে সাহেবের নেতৃত্বে) নবাবের দিকে যুদ্ধ করলেও ড্যানিশরা কোনও পক্ষেই যোগদান করাকে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় বলে মনে করেন নি। বরং তাদের মন তখন শ্রীরামপুরে। ব্যবসা আর নগরের উন্নতিই একমাত্র পাখির চোখ। যুদ্ধ করে অযথা শক্তিক্ষয়ের মতো মানুষ বিচক্ষণ সর্টম্যান বা জিনজেন্ বাল্করা নয়। তখন শ্রীরামপুর কুঠি থেকে স্থানীয় মোটা কাপড়, গুড়, চিনি, রেশম, চাল, নীল, নুন ইত্যাদি নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে ডেনমার্কে। আর সেখান থেকেও আসছে বিভিন্ন বিদেশী জিনিস, যার স্থানীয় চাহিদা প্রচুর। তখন ড্যানিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রধান বিজনেস এজেন্ট বিখ্যাত সওদাগর জন পামার সাহেব। তিনিও ড্যানিশদের বাণিজ্য এজেন্ট হিসাবে লক্ষাধিক টাকা লাভ করার কথা বইতে লিখে গেছেন। এছাড়া স্থানীয় গোস্বামীদেরও ড্যানিশদের সাথে বানিজ্যে সহায়তা করে প্রতিপত্তিশালী হয়ে ওঠার কথা আগেই বলেছি। অল্প কয়েক বছরেই ড্যানিশদের বানিজ্য সাড়া ফেলে দেয় কলকাতাতেও। এরমধ্যেই ট্রাঙ্কুবার থেকে ডাক আসায় সর্টম্যান সাহেবকে শ্রীরামপুর ত্যাগ করতে হয়। প্রত্যাশা মতোই নতুন দায়িত্ব পান ক্যাপ্টেন জিনজেন্ বাল্ক। আজকের শ্রীরামপুরের বিভিন্ন বড় রাস্তাও তখন তাঁর প্ল্যানমাফিক তৈরি করা বলে জানা যায়। শ্রীরামপুরের ইতিহাসে জিনজেন বাল্ক একটি বড় নাম।
বর্গী আক্রমণের সময়ে ড্যানিশ গর্ভমেন্ট কলকাতার ইংরেজ কাউন্সিলের কাছে সাহায্য চেয়ে চিঠি পাঠায়। শ্রীরামপুরের সরকারী ভবন থেকে পাওয়া একটি পুরনো নথি এই তথ্যে শিলমোহর দিচ্ছে। চিঠিতে লেখা-
“ফ্রেড্রিক্স নগরস্থ ভদ্রলোকগণ বর্গীর আক্রমণ আশঙ্কায় ভীত হইয়াছেন। বর্গীর আক্রমণ হইতে দেশরক্ষা করিবার নিমিত্ত চারিটী কামান ও তদুপযুক্ত গোলা বারুদ ও অস্ত্র আবশ্যক।”
ইংরেজ কোম্পানি আর্জি অনুযায়ী সাহায্য না পাঠালেও ফেরত চিঠি দিয়ে নিজেদের অপারগতার কথা লেখেন বলেই জানা যায়। যদিও এর আগে বা পরেও সরাসরি শ্রীরামপুর নগরে বর্গী মারাঠাদের আক্রমণের কোনও ঘটনা ঘটেনি। কিছুদিন শাসনকর্তা থাকবার পর ১৭৬৩ সালে ক্যাপ্টেন জিনজেন্ বাল্কও ভারতে ড্যানিশ বানিজ্যের অন্যতম রাজধানী ট্রাঙ্কুবার শহরে ফিরে যান। এরপর প্রধানের দায়িত্ব পান মিঃ এম ডেমার্ক। তাঁর মেয়াদ ছিল চার বছর। এরপর ১৭৬৭ সালে শ্রীরামপুরের ড্যানিশ প্রধান হন মিঃ বয়েক। কিন্তু এরমধ্যেই কোম্পানি সেখানে তৈরি করে শ্রীরামপুরের প্রথম খ্রীষ্টান গীর্জা ও উপাসনাস্থল। পুরনো নথি থেকে জানা যাচ্ছে গীর্জা নির্মাণ করতে তখন মোট ১৩৩৮৬ টাকা খরচ হয়।
ইতিমধ্যে ইউরোপে ইংরেজদের সাথে যুদ্ধ বাঁধে আমেরিকা, ফ্রান্স ও হল্যান্ডের। প্রভাব এসে পড়ে এই কলকাতাতেও। কলকাতা থেকে ইংল্যান্ডগামী সমস্ত জাহাজই প্রায় একে একে মরিসস্ দ্বীপের কাছে লুঠ করে নেয় নেয় ফরাসীরা। ইংরেজদের তখন কাঠখড় পুড়িয়ে সদ্য জমিয়ে তোলা ব্যবসা। প্রায় একা হাতে নতুন গড়ে তোলা কলকাতা শহর। তার ওপর এমন হঠাৎ আসা বিপর্যয়। এদেশ থেকে নিজেদের দেশে পণ্য রপ্তানি প্রায় শিকেয় ওঠবার জোগাড়। তাদের এই বিপদের মাঝে লাভের সুবর্ণ সুযোগ এসে গেল শ্রীরামপুরে ড্যানিশদের কাছে। তারা যুদ্ধের আবহে ইংরেজ পণ্য ড্যানিশ জাহাজে দ্বিগুণ মাশুল দিয়ে নির্বিঘ্নে ইংল্যান্ড পৌঁছে দেবার প্রস্তাব রাখলে তা একরকম লুফে নেয় কলকাতার ইংরেজ কাউন্সিল। এরপরেই শ্রীরামপুরের গঙ্গার ঘাট থেকে ইংরেজ ও ড্যানিশদের পণ্য বোঝাই করে পরপর জাহাজ ছাড়তে শুরু করে ইউরোপের পথে। ড্যানিশ কোম্পানির অফিসার থেকে কেরানী, রাতারাতি বড়লোক হতে কেউ আর সময় নিলো না তেমন। তখন শ্রীরামপুরের ঘাটে রোজ ভিড়তে লাগলো তিন-মাস্তুল ওয়ালা বিশাল বিশাল বানিজ্য জাহাজ। এইভাবে ব্যবসায় চড়চড় করে উন্নতির পরে ১৭৮৬ খ্রীস্টাব্দে গঙ্গার ধারে ড্যানিশ গর্ভমেন্টের ইচ্ছায় তৈরি হল বিখ্যাত ড্যানিশ সরাইখানা ও আমোদপ্রমোদের হোটেল ‘ডেমমার্ক ট্যাভার্ন’। যা আজও নতুন রূপ নিয়ে শ্রীরামপুরে দাঁড়িয়ে রয়েছে মাথা তুলে। এখনো গঙ্গার ধারে ট্যাভার্নের চেয়ারে বসে এককাপ কফির ধোঁয়া উড়ে এলে যেন শোনা যায় ড্যানিশ কোম্পানির ক্যাপ্টেনদের গেট টুগেদারের হুল্লোড় আর জাহাজের বাঁশি। ড্যানিশ কোম্পানির রাতারাতি বিশাল উন্নতির মধ্যেই ১৭৮৯ সালে মিঃ বয়েক অবসর নেন। এরপর নতুন শাসনকর্তা হন কর্নেল ও বাই। শ্রীরামপুরের ইতিহাসে ও বাই সাহেবও একটি উল্লেখযোগ্য নাম।
নতুন বন্দর হিসাবে নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় কলকাতার অভিজাত বাঙালীরাও শ্রীরামপুরে জমি কেনায় ও বাস করায় আগ্রহ দেখাতে শুরু করেন। ঠিক কলকাতায় যেমন একসময় দলে দলে মানুষ আসা শুরু করেছিল শুধুমাত্র ইংরেজ কোম্পানির হাত ধরে কিছু উপার্জনের জন্য। তেমনই শ্রীরামপুরেও বাড়তে শুরু করে বহিরাগত মানুষজনের ভিড়। এমনকি কলকাতার শোভাবাজারের বিখ্যাত রাজা বাহাদুরও শ্রীরামপুরে জমি কিনে রেখেছিলেন বলে শোনা যায়। ধীরে ধীরে ড্যানিশদের চেষ্টায় শ্রীরামপুর হয়ে ওঠে বাংলার এক বিখ্যাত বন্দর নগরী। প্রচুর বহিরাগত আগমনের ঘটনাকে উল্লেখ করিয়ে Sanders সাহেব লিখছেন – “Serampur formerly the house of refugees for insolvent debtors and rogues.”
ইংরেজ শাসিত কলকাতায় তখন বিদঘুটে সব আইন কানুনের গেরো। লঘু পাপে গুরুদণ্ড। শাস্তিও ভয়াবহ। কলকাতার রাজপথে জনসমক্ষে মহারাজা নন্দকুমারের ফাঁসীর ঘটনা কে না জানে। ইংরেজ শাসনে তখন মানী লোকেরও সম্মান শিকেয় ওঠার অবস্থা। এই অবস্থায় মান বাঁচাতে ও আয় উপায়ের একটা বন্দোবস্ত করে নিতে শ্রীরামপুর হয়ে উঠলো বাঙালীর প্রিয় গন্তব্য। প্রচুর মানুষের ভিড়ে রীতিমতো এক জাঁকজমকপূর্ণ মস্ত শহরে পরিণত হতে শুরু করলো শ্রীরামপুর। কলকাতার অদূরেই ড্যানিশ সরকারের অধীনে গোড়াপত্তন ঘটলো এক সমান্তরাল কলকাতার।

ক্রমশ…
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।