সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ২০)

কলকাতার ছড়া

তখন কলকাতা গোড়াপত্তনের সময়। জানবাজারে ধনী জমিদার প্রীতিরাম মাড় প্রজাদরদী। জাতিতে শূদ্র হয়েও কেবল প্রজাপ্রেমের বলে কলকাতায় তাঁর অগাধ সম্ভ্রম। পলাশির যুদ্ধের চার বছর আগে আমতায় গরীর ঘরে জন্মানো প্রীতিরাম দাস কালে কালে হয়ে উঠলেন জানবাজারের প্রজাপালক। বর্তমান বাংলাদেশের মকিমপুরেও ছিল তাঁর বিস্তীর্ণ জমিদারী। ছেলেবেলায় জানবাজারের মান্না পরিবারের কাছে আশ্রয় লাভ ও পরে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে রসদ জোগানো দিয়ে জীবন শুরু তাঁর। সময়ের সাথে সাথে তাঁর প্রতিপত্তি লাভ। তখন কলকাতা ছিল এমনই। কেউ অতি সাধারণ থেকে উত্তরোত্তর উন্নিত হত সমাজের মাথা হিসাবে, আবার কেউ রাজা উপাধি নিয়ে মেতে থাকতো খেউড় আর মোচ্ছবে। তবে আমাদের জানবাজারের প্রীতিরাম দাস বড় সংযমী আর প্রজাদরদী জমিদার। দুই পুত্র হরচন্দ্র আর রাজচন্দ্রকে নিয়ে তাঁর ভরা সংসার। কিছুদিন ঢাকায় ইংরেজ সরকারী দপ্তরে কাজ করবার পরে তিনি চব্বিশ বছর বয়সে কলকাতা ফিরে এসে মান্নাবাড়ির যুগল মান্নার মেয়েকে বিয়ে করেন। ব্যবসায় তাঁর অগাধ উন্নতি সেকালের কলকাতায় চর্চার বিষয়। আসলে বাণিজ্যের অভাবও ছিল না সেকালে। ইংরেজ সরকারের আনুকুল্যে বিলেতে দেশীয় দ্রব্যের রপ্তানি করে পয়সা আয় ছিল কলকাতার বাঙালি সমাজের কাছে অতি পরিচিত দৃশ্য। কিন্তু প্রীতিরামের আয়ের উৎস একটু আলাদা। নিজের ক্রয় করা জমিদারী থেকে বাঁশ, কাঠ কলকাতায় এনে তা রপ্তানি করা ছিল তাঁর প্রধান ব্যবসা। এমনকি বেলেঘাটায় একটা আড়তও তৈরি করেন সব দ্রব্য রাখবার জন্য। তখন অনেকগুলো বাঁশ একসঙ্গে বেঁধে নদীতে ভাসিয়ে দূরদূরান্ত থেকে কলকাতায় আনা হত। একেই বলা হত বাঁশের মাড়। আর সেই থেকেই তাঁর বংশ মাড় বংশ বলে পরিচিত। শোনা যায় পরবর্তী সময়ে বেলেঘাটা আড়তে সহজে বাঁশ আনবার জন্যই এই বংশের বিখ্যাত লোকমাতা ও প্রীতিরামের পুত্রবধূ রাণী রাসমণি একটি খাল কাটেন। যে খাল আজও বেলেঘাটা খাল হিসাবে দেখা যায়। বাঁশ ছাড়াও বেলেঘাটার আড়তে রাখা হত লবন। ১৮০৩ সালে নির্মাণ করেন জানবাজারের প্রাসাদ। আজও সেই প্রাসাদ বর্তমান। কলকাতার ইতিহাসে প্রীতিরাম ও তাঁর পুত্রবধূ রাসমণি কেবল উজ্জ্বল নাম নয়, প্রাতঃস্মরণীয়ও বটে। কিন্তু সারাজীবন সমস্ত প্রজাহিতৈষী কাজ করেও প্রীতিরাম তুলতে পারেন নি নিজের জন্ম পরিচয়। নিজের পরিবার থেকে মুছতে পারেন নি শূদ্র তকমা। এমনকি পরবর্তী সময়ে রাণী রাসমণির দক্ষিণেশ্বর মন্দির প্রতিষ্ঠা নিয়েও কলকাতা হয়ে ওঠে উত্তাল। এমনকি জানবাজারের বাড়ি দুর্গাপুজো শুরু করলে ও কলকাতার রাস্তায় রুপোর তৈরি জগন্নাথ দেবের রথ বের করলে ভয়ানক সমালোচনার মুখে পড়েন রাণীমা। যে সময়ে কলকাতার দূর্গাপুজো ছিল ইংরেজ রাজপুরুষদের তোষামোদ করার এক সহজ পন্থা, সেই সময় ধর্মীয় আচরণবিধি পালন করে নিষ্ঠা নিয়ে দূর্গার আরাধনা শুরু হয় জানবাজার রাজবাড়িতে। তখন রাসমণির দূর্গাপুজোয় একজনও ইংরেজ সাহেব আমন্ত্রিত হতেন না রাজঅন্তঃপুরে। কেবলমাত্র বাঙালি নিষ্ঠায় পরিচালিত হওয়া এটিই কলকাতা শহরের প্রথম দুর্গোৎসব। পরিবারের উপর থেকে শূদ্র নাম তুলতে চাওয়া প্রীতিরাম শেষ পর্যন্ত বিফলমনোরথ হয়ে বলতেন –
“দুলাল হল সরকার, ওঙ্কুর হলো দত্ত
আমি কিনা থাকব যে কৈবত্ত সেই কৈবত্ত ||”
কালে কালে এই ছড়া মুখে মুখে ফিরত কলকাতাবাসীর। প্রীতিরাম চলে গেছেন। রেখে গেছেন তাঁর সাধের জানবাজার রাজবাড়ি। কলকাতার লোকগাথায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন রাণী রাসমণি। আজও বাবুঘাট, আহিড়িটোলায় গঙ্গার ধারে অধিষ্ঠিত তাঁর তৈরি করা ঘাট। বাবুঘাটের ওপরে ফলকে আজও জ্বল জ্বল করে –
“….this ghaut constructed in the year 1830
at the expense of Baboo Rajchunder Doss”
একবার জানবাজার বাড়িতে দূর্গাপুজোর সময় ষষ্ঠীর সকালে কলাবৌ স্নান করাতে ঢাক ঢোল পিটিয়ে রাজপথ ধরে বাবুঘাট যাওয়ার সময় হাজির হল অদ্ভুত এক বিপদ। প্রবল ঢাকের শব্দে কাঁচা ঘুম ভেঙেছে এক সাহেবের। গঙ্গায় পৌঁছনোর আগেই পুরোহিতকে আটকে বিস্তর ঝামেলা বাঁধান সাহেব। জাত্যাভিমান তাদের চরিত্রের ধর্ম। কলকাতায় ঔপনিবেশিক গোড়াপত্তনের পর থেকেই হোয়াইট টাউনকে কৌশলে নেটিভদের থেকে আলাদা করে রাখা তাদের স্বভাবসিদ্ধ চরিত্র। এমনকি কলকাতা শাসন করলেও কখনো তথাকথিত ব্ল্যাক টাউন ঘুরেও দেখে নি সরকার বাহাদুর। আর এসবের মধ্যেই কলকাতা দেখেছিল রাণীমার ইংরেজ বিরোধী গর্জন। প্রবল পরাক্রমী ইংরেজ বাহাদুরের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহসে তিনিই কলকাতা শহরে অগ্রগণ্য ও পথপ্রদর্শক।
যাই হোক, সেইদিনের মামলা গড়িয়েছিল আদালত পর্যন্ত। ইংরেজ পরিচালিত কোর্টে ৫০ টাকা জরিমানাও হল রাণীমার। কিন্তু ছাড়বার পাত্র নন তিনিও। জানবাজার থেকে বাবুঘাট পর্যন্ত বিস্তীর্ণ রাস্তা তিনি দিলেন বাঁশের খুঁটি দিয়ে আটকে। গাড়ি চলা তো দূর, মানুষ গলবারই জায়গা রইল না রাণীমার বেঁধে দেওয়া রাস্তায়। শেষ পর্যন্ত আপোষে বিষয়টি মেটানো ছাড়া আর উপায় রইল না সাহেবদের। কলকাতার মানুষ মুখে মুখে আওড়াতো-
“অষ্ট ঘোড়ার গাড়ি দৌড়ায় রাণী রাসমণি
রাস্তা বন্ধ করতে পারল না ইংরেজ কোম্পানী।”