শ্রীরামপুর ও আশেপাশের গ্রামগুলোতে খ্রীষ্টের বাণী ও ধর্মপ্রচারের জন্য রীতিমতো ছুটে বেড়াচ্ছেন মিশনারীরা। দিকে দিকে সভা করছেন। ড্যানিশ পৃষ্ঠপোষকতায় তাতে লোকও হচ্ছে প্রচুর। স্থানীয় বাঙালী যুবকরাও আসছেন শুনতে। গঙ্গার ধারে নিয়ম করে ধর্মবিষয়ক আলোচনা চলছে রোজ। নেতৃত্বে অবশ্যই রেভারেন্ড উইলিয়াম কেরী সাহেব। ড্যানিশ সরকার রীতিমতো নিরাপত্তা দেন তাঁকে আর তাঁর মিশনারী সঙ্গীদের। শ্রীরামপুরে কর্মসূত্রে যাতায়াত চন্দননগর নিবাসী কৃষ্ণপালের। সেই সূত্রে পরিচয়ও হয়েছে মানবদরদী কেরীসাহেবের সাথে। মিশনারীদের ধর্মসভায় হাজির হয়ে প্রভু যীশুর অলৌকিক বিভিন্ন জীবন কাহিনী শুনতে শুনতে তিনিও মোহিত হয়ে পড়লেন একেবারে। মনে মনে ইষ্ট মেনে নিলেন যীশুকেই। কিন্তু সে তো আজকের যুগের কথা নয়। তাই স্বভাবতই মেনে নিল না গোঁড়া হিন্দুসমাজ। শ্রীরামপুরের মাটিতে একেবারে হিন্দুদের নাকের ডগায় এমন ভাবে মিশনারীদের বাড়বাড়ন্ত ভালো চোখে নিলেন না হিন্দু শাস্ত্রীয় পণ্ডিতরা। লোক খেপিয়ে তুললেন তাঁরাও। কৃষ্ণপাল খ্রীষ্টান হবে শোনার পর থেকেই একটা গেল গেল রব উঠল চারপাশে। শাস্ত্রীয় পণ্ডিতদের প্ররোচনায় হাজার দুয়েক মানুষ জড়ো হয়ে আক্রমণ করল কৃষ্ণপালের বাড়ি। বাড়ি ভাঙচুর সমেত গালিগালাজ করে তারা ভীষণ ভাবে চড়াও হল কৃষ্ণপালের ওপর। কৃষ্ণ ছিলেন কর্তাভজা সম্প্রদায়গুরু। আর হলেন একেবারে খ্রীষ্টধর্মাবলম্বী। তাঁর এই হঠাৎ ধর্মান্তরকরণে মিশনারীদের ওপর তীব্রভাবে চটল হিন্দু বাঙালীর দল। ভিনদেশী বিধর্মীরা তাদের সনাতন বিশ্বাসে হাত দেবেন, তাদের ধর্মের লোকজনকে বুঝিয়ে খ্রীষ্টান করবেন, এ তারা ভালো চোখে নিল না।
কৃষ্ণপালের ওপর শুধু আক্রমণই নয়। তাঁকে রীতিমতো ধরে বেঁধে বিচারের জন্য ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে নিয়ে গেল তারা। কিন্তু যোগ্য অপরাধের প্রমাণ অভাবে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব তাঁকে মুক্তি দিয়ে সেইযাত্রাই তাঁকে রক্ষা করলেনই শুধু নয়, তাঁর নিরাপত্তার জন্য বাড়িতে বসিয়ে দিলেন সরকারি পাহাড়া। এদিকে ১৮০০ সালের ২৮শে ডিসেম্বর কেরীসাহেব তাঁর জ্যেষ্ঠপুত্র ফিলিক্সকেরী ও কৃষ্ণপালকে দুইপাশে নিয়ে গঙ্গায় স্নান করিয়ে দীক্ষা দিলেন খ্রীষ্টধর্মে। এই দীক্ষাদান অনুষ্ঠান ঘিরে চরম উত্তেজনা পুরো শ্রীরামপুর জুড়ে। অনুষ্ঠানে সাক্ষী হতে দলে দলে স্থানীয় মানুষ জড়ো হলেন গীর্জায়। উপস্থিত হলেন স্বয়ং ড্যানিশ বড়সাহেবও। তাঁর উপস্থিতিতে যে সম্পূর্ণ অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবেই সম্পন্ন হল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এভাবেই শ্রীরামপুরে মিশনারীদের উদ্যোগে প্রথম বাঙালী হিসাবে খ্রীষ্টান হয়ে বিখ্যাত হয়ে গেলেন চন্দননগরের কৃষ্ণপাল। তারপর থেকেই তিনি কেরীসাহেবের ডানহাত-বাঁহাত।
এর মাসদুয়েক পরেই কৃষ্ণপালের প্রতিবেশী গোকুল মিশনারীদের কাছে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করলেন। তারপর থেকে পরপর কৃষ্ণপালের স্ত্রী, কন্যা, শ্যালিকা, জামাই, গোকুলের স্ত্রী কমলমণি খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করলেন। এরপর কয়েকজন মুসলমানও খ্রীষ্টধর্মের প্রতি আকর্ষিত হয়ে পড়েন। পিরু নামক এক স্থানীয় মুসলমান কেরীসাহেবের হাত ধরে দীক্ষাগ্রহণ করেন। তাঁর সাথে সাথে আরও দশজন মুসলমানও দীক্ষা নেন শ্রীরামপুরের মিশনারী গীর্জায়। ধীরে ধীরে স্থানীয় বাঙালী খ্রীষ্টানদের ভিড় বাড়তে থাকে। নিয়ম করে গঙ্গার তীরে চলতে থাকে যীশুর উপাসনা।
উইলিয়াম কেরী একজন বঙ্গপ্রেমিক, উদার মনের মহাত্মা। বাংলা ভাষা ও বাঙালী তাঁর প্রাণ। গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলীর অনুরোধে কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে বাংলা পড়াতে আসতেন রোজ। হঠাৎ একদিন তাঁর চোখে পড়ে গেল বাঙালী হিন্দুদের এক নির্মম ধর্মীয় প্রথা। গঙ্গায় নবজাতক শিশুকে বিসর্জন দেওয়া। এই নিষ্ঠুরতম হত্যালীলা দেখে চুপ করে থাকবার মানুষ তিনি নন। এই প্রথা রদ করবার পক্ষে সোজা অ্যাপিল করলেন গভর্নর জেনারেল লর্ড ওয়েলেসলীর কাছে। ইংরেজ সরকার বাহাদুরের কাছে তখন কেরী সাহেবের খুব কদর। স্বভাবতই নড়েচড়ে বসল কলকাতার প্রশাসন। প্রচুর বিরুদ্ধমত এলেও প্রায় কেরীসাহেবের একক প্রচেষ্টায় নিষিদ্ধ ঘোষণা হল গঙ্গায় শিশু বিসর্জন রীতি। আজকের বাঙালীও তাই কেরীসাহেবের কাছে ঋণী।
এরপর কৃষ্ণপ্রসাদ নামক এক ঊনিশ বছরের ব্রাহ্মণ যুবক খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করলেন। তিনিই প্রথম ব্রাহ্মণ যিনি মিশনারীদের কাছে দীক্ষা নিয়ে খ্রীষ্টান হন। এভাবে বাঙালী খ্রীষ্টানের সংখ্যা দিনে দিনে বাড়তে থাকলে সেইসব হিন্দু সমাজচ্যুতদের জন্য থাকবার জায়গার অভাব দেখা দিল। শেষে শেওড়াফুলীর রাজা মহাশয়ের থেকে মাহেশের কাছে একটি গ্রাম চেয়ে নেন মিশনারীরা এবং সেখানেই কৃষ্ণপাল, গোকুল, কৃষ্ণপ্রসাদরা নির্বিঘ্নে বাস করতে থাকেন। এরপরই কেরীসাহেবের উপস্থিতিতে বাঙালী খ্রীষ্টান সমাজে প্রথম বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়। কৃষ্ণপ্রসাদের সাথে কৃষ্ণপালের মেয়ের চারহাত এক করে দেন স্বয়ং কেরীসাহেব। ১৮০১ থেকে ১৮০৪ সালের মধ্যে মোট ৫২ জন বাঙালী খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করেন শ্রীরামপুরে। সংখ্যার হিসাবে নিতান্তই নগন্য হলেও ঘটনাটি লঘু করে দেখতে নারাজ মিশনারীগণ। তাদের চোখে এ এক অসাধারণ সাফল্য। তবে হিন্দুদের বুঝিয়ে খ্রীষ্টান করানোর চেয়েও গোঁড়া হিন্দুদের নির্মম সব রীতিনীতির ওপর তাদের লক্ষ্য অনেক বেশি। গঙ্গায় শিশু বিসর্জন আগেই বন্ধ করা গেছে। এবার কেরী সাহেব নজর দিলেন সতীদাহ প্রথার দিকে। কুলীন ব্রাহ্মণ ঘরে অশীতিপর স্বামীর মৃত্যুর সাথে সাথে জীবন্ত পুড়ে মরতে হয় বালবধূকে। ইংরেজ মিশনারীদের চোখে এ এক নারকীয় প্রথা। অমানবিক। শুধুমাত্র একটা ধর্মের দোহাই দিয়ে এইভাবে একটা তরতাজা প্রাণকে কিভাবে জীবন্ত বলি দেয়া যায়, তা নিয়ে ভেবেই অস্থির কেরীসাহেব ও অন্যান্য মিশনারীরা। সতীদাহ নিয়ে একটা ডিটেল রিপোর্ট বানানোর জন্য দশজনের দল তৈরি করলেন তিনি। দলভাগ করে দায়িত্ব দিলেন কলকাতা ও আশপাশের অঞ্চলে বিগত এক বছরে সতী হওয়ার রিপোর্ট প্রস্তুত করবার জন্য৷ ডিটেল রিপোর্ট তিনি তুলে দিতে চান সুপ্রীম কাউন্সিলের হাতে। কাজও হল কথামতো। খবর পাওয়া গেল কলকাতা ও পাশ্ববর্তী স্থানগুলোতে বিগত ছয়মাসেই প্রায় তিনশ নারী সতী হয়ে প্রাণ দিয়েছেন। প্রথমেই আলোচনার জন্য কেরী সাহেব বসলেন হিন্দু সমাজপতি ও শাস্ত্রীয় পণ্ডিতদের সঙ্গে৷ এরমধ্যে অগ্রগণ্য হলেন পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় তর্কালঙ্কার। সুপ্রিম কোর্টের নিয়োজিত হেড পণ্ডিত তিনি। কেরীসাহেবের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক। তাঁর ব্যাখ্যাতেই উঠে এলো সতীদাহ হিন্দুধর্মের প্রচলিত রীতি হলেও, শাস্ত্রমতে কর্তব্য সম্মত নয়। ব্যাস। লেগে পড়লেন কেরীসাহেবও। সমস্ত রিপোর্ট আবেদনসহ পাঠিয়ে দিলেন সুপ্রীম কাউন্সিলে। তারপর সেখান থেকে সেই আবেদনপত্র পৌঁছে গেল সরকার বাহাদুরের কাছে। এদিকে কলকাতায় রামমোহন রায়ও সতীদাহ নিয়ে তদ্বির করা শুরু করেছেন।
এরমধ্যেই ১৮০৫ সালে শ্রীরামপুরের শাসনকর্তা কর্ণেল ও বাইয়ের মৃত্যু হল। মিশনারীদের কাজে তিনি ছিলেন অন্যতম অগ্রণী পৃষ্ঠপোষক। এমনকি কেরীসাহেবরা শ্রীরামপুরে পা দেবার পরে তিনিই ছিলেন ত্রাণকর্তা। থাকবার জায়গা থেকে ভজনালয়, সবই কর্ণেল সাহেব নিজ উদ্যোগে ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। তাই মিশনারীদের কাছে তিনি পরিত্রাতা। তাঁর মৃত্যুর পরদিন দুপুরে মিশনারী উদ্যোগে একটি স্বরণসভার আয়োজন করা হয়। সেখানে বাই সাহেবের স্বরণীয় ঘটনার স্মৃতিচারণ করে কেরী, মার্শম্যান ও ওয়ার্ড সাহেব বক্তৃতাও দেন।