সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ২৩)

কলকাতার ছড়া 

সাহেবদের হাত ধরে কলকাতায় গড়ালো রেলগাড়ীর চাকা। কলকাতাবাসীর কাছে সে এক আজব দৃশ্য। লাইনের ওপর দিয়ে শব্দব্রহ্ম তুলে পরপর কামড়াগুলো ছুটে চলেছে নির্দিষ্ট গন্তব্যে। ঘোড়া গাড়ী, গোরুর গাড়ী আর পালকিতে চাপা বাঙালীর কাছে সে এক নতুন অভিজ্ঞতা। ছড়া বাঁধলো কলকাতার সঙের দল। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে গাইলো-

“কলের গাড়ি বানিয়েছে সাহেব কোম্পানি
হাওড়া শিয়ালদহে রেলের আমদানি
কত শত লোক নিয়েছে গার্ড ড্রাইভার
কলিকাতার দপ্তরে বিদেশি কারবার।”

এই কলের গাড়ী চড়বার জন্য হুড়োহুড়িরও অন্ত নেই। ১৮৫৪ সালের ১৫ই আগস্ট প্রথম রেল চলে হাওড়া থেকে হুগলী পর্যন্ত। কলকাতায় দিকে দিকে রেলগাড়ী নিয়ে ছড়া বাঁধে কবির দল। রূপচাঁদ পক্ষী থেকে ছন্দের যাদুকর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সকলেই রেলকে তুলে ধরেন কবিতা ও ছড়ায়।
সংবাদ প্রভাকরে কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত লিখলেন—

“টাকা ছেড়ে থাবড়ায়, পার হয়ে হাবড়ায়
চালিয়েছে রেলওয়ে পথে।
হুগলির যাত্রী যত, যাত্রা করি জ্ঞান হত
কলে চলে স্থলে জলে সুখ।
বাড়ী নহে বড়ো দূর, অবিলম্বে পায় পুর
হয় দূর সমুদয় দুখ।”

সরকারি উদ্যোগে প্রথম হাওড়া থেকে হুগলীর মধ্যে রেল চালু হলেও পরে বিভিন্ন ন্যারো ও মিটার গেজ রেলপথ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল ম্যাকলয়েড লাইট রেল ও মার্টিন রেল। কালীঘাট ফলতা লাইট রেল, হাওড়া আমতা, হাওড়া শিয়াখালা লাইট রেল তুমুল সাড়া ফেলে জনমানসে। একসময় ম্যাকলয়েড সাহেবের রেল চেপেই আদিগঙ্গার পাড় ঘেঁষে কালীঘাটে তীর্থ যাত্রা করতো বাঙালি। ১৯১৭ সালের ২৮শে মে তৈরি হয় প্রায় ২৭ মাইল কালীঘাট ফলতা লাইট রেলপথ। মিশরে ইজিপ্টিয়ান ডেল্টা রেলওয়ের অর্ডারে ইংল্যান্ডে বহু রেল কামড়া তৈরি হলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বাজারে সবকটি কামড়া মিশরে পাঠানো যায় নি। আর তখনি ম্যাকলয়েড কোম্পানি সেই উদ্বৃত্ত কামড়াগুলো কিনে তা পাঠিয়ে দেয় কলকাতায়। আর সেইসব কামড়া ইঞ্জিনের সাথে জুড়েই তৈরি হয় ম্যাকলয়েড রেল। এর সাথে সাথেই ন্যারোগেজ লাইনে জুড়ে যায় বাংলার আহমেদপুর – কাটোয়া, বর্ধমান – কাটোয়া আর বাঁকুড়া – দামোদর। অর্থাৎ এই বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্তও দাপিয়ে কলকাতায় চলতো সাহেবদের লাইট রেল। কিন্তু স্বাধীনতার ১০ বছর পরে আদিগঙ্গার পাড়ে এই রেলট্র‍্যাক বাতিল ঘোষনা করে রেল কোম্পানি। আজ আর ট্রেনে চেপে যাওয়া যায় না ফলতা। ডায়মন্ড হারবার রোডের ভিড় ঠেলে সড়কপথে পৌঁছতে ভুগতে হয় বিস্তর। এখনকার নিউ আলিপুরের কাছ থেকে তখন শুরু হত এই রেলযাত্রা। প্রথমে বেহালা ঘোলসাহাপুর থেকে ফলতা রুট শুরু হলেও পরে বাড়ানো হয় যাত্রাপথ। ইংরেজ ব্যবসায়ী টমাস অ্যাকুইনাস মার্টিনের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে মার্টিন রেল পরিষেবা চালু করেন বাঙালি ব্যবসায়ী স্যর রাজেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। ১৮৯০ সালে তাঁরা গড়ে তোলেন তাঁদের কোম্পানি ‘মার্টিন অ্যান্ড কোং’। পরে কোম্পানির দায়িত্ব নেন তাঁর পুত্র বীরেন মুখোপাধ্যায়। যাঁর স্ত্রী ছিলেন লেডী রাণু মুখোপাধ্যায়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ স্নেহধন্য রাণুও যোগ্য সহায়তা করেন পারিবারিক ব্যবসার। এঁদের হাত ধরেই কলকাতায় রেলদর্শন বাঙালির। আজকের দিনে দ্রুতগামী রেলে যাত্রা করা জলভাত হয়ে গেলেও সেযুগে টিকিট কেটে কাঠের কামড়ায় পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাওয়া এক অন্য অনুভূতি ছিল বাংলাবাসীর কাছে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।