সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৮)

কেল্লা নিজামতের পথে
খুঁজতে গেছি কেল্লা নিজামত। কিন্তু চারপাশে কত বাড়ি। সমগ্র অঞ্চলটায় হাজারদুয়ারি ছাড়া আর কিছু খুঁজেই পাওয়া যায় না ঠিকমতো। এত বছরের রাজনীতি, ষড়যন্ত্র, বিভিন্ন স্বার্থে ইতিহাস চাপা দেওয়ার চেষ্টা, এই সবকিছু নিয়েই আধুনিক মুর্শিদাবাদ। শুধু ভাগীরথীর দুপাশে ছড়িয়ে থাকা অজস্র ঐতিহাসিক নিশান। সে একটা ইটই হোক, অথবা একটা জীবন্ত প্রাসাদ। এসব ঘুরতে ঘুরতেই ঠিক করলাম সকাল সকাল খুঁজতে যাব হীরাঝিল। অর্থাৎ নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাধের হীরাঝিল প্রাসাদ। এই প্রাসাদটি নিয়ে তাঁর আবেগ কিছু কম ছিল না। এসব কথা আগেও বলেছি। কিন্তু যেটা বলিনি তা হল প্রাসাদের বর্তমান অবস্থা। একটা মাঠের উপর দাঁড়িয়ে কেউ যদি বলে যে দাঁড়িয়ে রয়েছি একটি সুবিশাল প্রাসাদের উপর, আদৌ কি তা বিশ্বাসের জায়গা তৈরি করে? বিষয়টি যেন ঠিক সেরকমই। একপাশে কুল কুল করে বয়ে যাওয়া ভাগীরথী, আর তার পাশেই ঘন বাঁশঝাড়। আর এই পুরো বাঁশঝাড় অঞ্চলটিই আদপে নবাব সিরাজের হীরাঝিল। চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে তার চিহ্ন। সরু সরু ভাঙা বাংলা ইট আর দেয়াল, চাতাল, মেঝে, পাঁচিল এইসবের ভাঙাচোরা অংশ। প্রায় সমগ্র অঞ্চলটাই ভাগীরথীর ভাঙ্গনে বিধ্বস্ত। তার সঙ্গে সংস্কার না হওয়ার চিহ্ন পরিষ্কার। দেখতে দেখতে মনে পড়ল একটা দিনের কথা। যেদিন প্রহসনের পলাশী থেকে উটের পিঠে চেপে নিজের হীরাঝিলে একরকম পালিয়ে এসেছিলেন নবাব। আর তারপর ক্লাইভ ও দলবল মুর্শিদাবাদ দখল করার আগেই নকরের ছদ্মবেশে নৌকা করে সঙ্গে স্ত্রী লুৎফুন্নিসা ও কন্যা উম্মে জোহরাকে নিয়ে রাজমহলের দিকে যাত্রা শুরু করেছিলেন নবাব। এই তার রাজত্বের অবসান। আর মাত্র কয়েকটা দিনের এক অন্ধকার জীবনের সূচনা। ২৪শে জুন থেকে ৩রা জুলাই, সময়টা খুবই হাতেগোনা। অংকের হিসেবে ফেললে মাত্র ৯ টা দিন। কিন্তু পরাজিত নবাব সিরাজের জন্য এ এক আশ্চর্য জীবনের অধ্যায়। সেই থেকেই হীরাঝিল খালি। প্রাসাদের দখল নেয় নবাব মীরজাফর ও ক্লাইভের দল। কিন্তু কেউ আর ভালোবাসেনি হীরাঝিলকে। আজও তাই ভাঙা হীরাঝিল সিরাজেরই৷ ভালো কি খারাপ সে তর্ক আপাতত তোলা থাক৷ সেসব নিয়ে আলোচনা তো হবেই। কিন্তু আপাতত হীরাঝিলের ভাঙা ইটগুলোর দিকে তাকালে আজও ঝলসে যায় চোখ। একটা মস্ত প্রাসাদ মাটিতে মিশে যেতে সময় নেয়নি খুব বেশিদিন৷
সিরাজ আর নেই৷ নেই তার হীরাঝিলও। কিন্তু আছে নিস্তব্ধতা। আর একরাশ চাপাকান্না।
কিন্তু কান্নাটা কিসের? যেদিন থেকে নাসিরী রাজবংশের প্রতিষ্ঠা মুর্শিদকুলীর হাতে, সেইদিন থেকেই মুর্শিদাবাদের গোড়াপত্তন। আর তার সাথে সাথে এক আশ্চর্য সময়চক্রের সূচনা সেখানে। জাহাঙ্গীর নগর থেকে মুখসুদাবাদ। পথটা সুগম ছিল না কোনদিনই। কিন্তু নাসিরী রাজবংশের স্থায়িত্ব বেশি কাল নয়। মুর্শিদকুলি, সুজাউদ্দিন এবং সরফরাজের পরে এক হিসাবনিকাশের অধ্যায়। মুর্শিদকুলির জামাই সুজাউদ্দিন, আর সুজাউদ্দিন-এর ছেলে সরফরাজ। তিন প্রজন্মের যোগ্য উত্তরসূরী পাওয়ার আগেই গিরিয়ার প্রান্তরে আলীবর্দী খান যে এভাবে স্বয়ং আক্রমণ করবেন তরুণ সরফরাজকে, তা ভেবেই দেখেনি আগে কেউ। সুতরাং মুর্শিদকুলি থেকে সিরাজউদ্দৌলা, এই যাত্রাপথে ভাগীরথীর জল গড়িয়েছে অনেক। উত্থান পতন হয়েছে ঢের। কিন্তু রয়ে গেছে কান্নাটুকু। গিরিয়ার যুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী আলীবর্দী খাঁয়ের একসময়ের মনিব সুজাউদ্দিনের ছেলে সরফরাজকে আকস্মিক আক্রমণ এবং তাকে হত্যা যে কান্নার সৃষ্টি করেছিল, সেই আবর্তেরই যেন সর্বশেষ পরিণতি ঘটে তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলার নারকীয় হত্যার মধ্য দিয়ে। শুধু পার্থক্য প্রহসনের। তবু কেন বাঙালির মনে সারফরাজ কোনদিনই সিরাজউদ্দৌলা হয়ে উঠতে পারলেন না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। কিন্তু ভাবতে বসলে দেখা যায়, সরফরাজ থেকে আলীবর্দী, এই যাত্রাপথটি ইতিহাসের বুকে যতটা সুগম হয়ে উঠেছিল, সিরাজ থেকে ক্লাইভ, সেই পালা পরিবর্তনের পথ মোটেই সুস্পষ্ট ছিল না। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও শাসকের পদে থেকে লড়াইটা কোনদিনই সুখের হয়ও না৷ কিন্তু একদিনের প্রহসন নবাবকে রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছিল মুর্শিদাবাদের বাইরে বেরোবার। কিন্তু সরফরাজের মৃত্যু লাল করেছিল মুর্শিদাবাদকে। তাই তরুণ দুই নবাবের পরিণতি তুলনা করলে সকলের অজান্তেই ভারাক্রান্ত হয় মুর্শিদাবাদ।
যাই হোক হীরাঝিল প্রসঙ্গে বলি, এ এক অন্ধকার নৈ:শব্দ্যের প্রতীক। কিন্তু একটা সময় যখন ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায় লোকচক্ষুর অন্তরালে, তখন তাকে জাগানো নিয়ে মাথাব্যথা করে না কেউ। বিলাসী নবাব সিরাজের কোনদিনই দাদুর চেহেল সেতুন প্রাসাদ পছন্দ ছিল না। তাই নিজের প্রাসাদের আনাচে-কানাচে যেন নিঃসংকোচে নক্ষত্র ঢেলে দিয়েছিলেন। আলো আর আলো, হাসি আর প্রাণের উৎসব। এই নিয়ে হীরাঝিল। মাত্র ২৭০ বছরের একটি ঝলমলে প্রাসাদ কী করে সম্পূর্ণ ধ্বংস পুরীতে পরিণত হয়, তা যেন অবাক করে সবাইকে। দিল্লি এবং আগ্রাতে আজও বাদশাদের নির্মিত সমস্ত ভবন অক্ষত অবস্থায় বেঁচে রয়েছে। আজও মাথা তুলে রয়েছে হাজার বছর আগের নালন্দা। নিজের অস্তিত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে ২৬০০ বছর আগের মহেঞ্জোদারো। তবে কি করে হারিয়ে যায় হীরাঝিল? তাহলে কি মুছে দেওয়ার চেষ্টা? পলাশীর যুদ্ধের পরে মুর্শিদাবাদ যায় ক্লাইভদের দখলে। ঘটা করে নবাব হন মীরজাফর। নিজে হাত ধরে মীরজাফরকে সিংহাসনে গিয়ে বসিয়ে দেন ক্লাইভ। আর তারপর থেকেই মুর্শিদাবাদে শুরু হয় নতুন প্রহসন। নগর, গ্রাম, পরগণা গেল ইংরেজ সাহেবদের হাতে, আর নামকাওয়াস্তে নবাব রইলেন মীরজাফর। এদিকে প্রায় নিয়ম করে চলতে থাকলো আলীবর্দী মীরজাফরকে মুছে দেওয়ার চেষ্টা। হীরাঝিলের ক্ষতি করা থেকে শুরু করে সিরাজ ঘনিষ্ঠ প্রায় সমস্ত তরফের মানুষজনকে হত্যা করা, সবকিছুই চলল অবাধে। সৌজন্যে ক্লাইভ সাহেব এবং মীরজাফরের দুর্ধর্ষ বড় ছেলে মীরণ। দেখুন, গল্পে গল্পে উঠে এলো আরো এক চরিত্রের নাম। এই চরিত্রের কথা যতই বলা হয় ততই যেন শেষ হয় না। ইংরেজ সাহেবরা নবাব সিরাজকে ছাড়া যদি আর কাউকে একটু মাত্রও ভয় পেয়ে থাকে তা হলো মীরণ। মীরণের কথা না হয় পরেই বলা যাবে। কিন্তু এইসব মিলিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে বিভিন্ন প্রশ্ন। আর তা অস্বাভাবিকও নয়। তাই মুর্শিদাবাদের কান্নাগুলো জড়ো হলে, যেন মাথা তুলে জেগে ওঠে অজানা আর এক মুর্শিদাবাদ। ভাগীরথীর দুই পাড়ে জ্বলে ওঠে আলো।