সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৩৮)

কেল্লা নিজামতের পথে
সিরাজের পতন ও মুর্শিদাবাদের ধ্বংসের পেছনে সিরাজের অহেতুক তীব্র ইংরেজবিদ্বেষ এবং আমির ওমরাহদের সাথে দুর্ব্যবহার সব থেকে বেশি দায়ী বলে ঐতিহাসিকরা বারে বারে উল্লেখ করেছেন। অনেকে মনে করেন ইংরেজদের সমুচিত শিক্ষা দিতে কাশিমবাজার কুঠি আক্রমণ করেই যদি নবাব শান্ত থাকতেন এবং সাহেবদের সঙ্গে কিঞ্চিৎ আলাপ আলোচনায় বসতেন তাহলে হয়তো ইতিহাস আলাদাভাবে লেখা হত। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। কাশিমবাজার কুঠি তছনছ করার পর নবাব হাত বাড়ালেন কলকাতায়। মুর্শিদাবাদ থেকে প্রায় পঞ্চাশ হাজার সৈন্য সঙ্গে করে গঙ্গার পাড় ধরে হেঁটে চললেন কলকাতার দিকে। একমাত্র লক্ষ্য ইংরেজদের কলকাতাছাড়া করা। সাহেবরা দীর্ঘদিন ধরে ওই কলকাতাটুকু নিয়েই নিজেদের মতো তৈরি করেছিলেন রাজপাট। আদায় করেছিলেন কলকাতার জমিদারি। তাই তাদের কাছে কলকাতার আবেগও অনেক বেশি। কিন্তু ঘটনাক্রমে তারা নবাবের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়েন ধীরে ধীরে। আর তার ফলেই চঞ্চল তরুণ নবাব সসৈন্যে যাত্রা করেন কলকাতা অভিমুখে। ইতিহাসবিদদের মতে এই কলকাতা আক্রমণ নবাবের পতনের প্রধান একটি কারণ। সত্যিই কি ইংরেজ বণিকদের সাথে সমঝোতায় এসে আলোচনায় বসলে সমস্যার সমাধান হত না?
ভাগীরথীর পশ্চিমে দাঁড়িয়ে এই কথাগুলো ভাবছিলাম এক মনে। ঠিক আমার উল্টোদিকেই হিরাঝিলের ভগ্নাবশেষ। আজও যেন সেখানে স্তুপাকার হয়ে আছে সিরাজের ভেঙে যাওয়া সাম্রাজ্য ও স্বপ্ন। ভাগীরথীর বয়ে যাওয়া জলের দিকে তাকিয়ে যেন দেখতে পাচ্ছিলাম জাঁকজমকপূর্ণ মুর্শিদাবাদের প্রতিচ্ছবি। আর শুনতে পাচ্ছিলাম দোর্দন্ডপ্রতাপ নবাব সিরাজউদ্দৌলার কলকাতা অভিমুখে যুদ্ধযাত্রা। যুদ্ধই কি ছিল সমঝোতার একমাত্র পথ? তাহলে ঠিক তার এক বছর আগেও ইংরেজদের সাথে কেন যুদ্ধ করলেন না নবাব আলীবর্দী খাঁ? মুতাক্ষরীণকার গোলাম হোসেন লিখছেন, দরবারে বসে আলীবর্দী খাঁ মুর্শিদাবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়েছেন বারবার। দক্ষিণের ক্ষমতাশালী শাসক নাসির জঙ্গের সাথে নাতি সিরাজের তুলনা করে তিনি বলছেন, “ভবিষ্যতে হয়তো ওই টুপিওয়ালাগুলোই আমার দেশ অধিকার করে নেবে”। তার এই আশঙ্কা ঐতিহাসিকদের কাছে এক প্রামাণ্য দলিল। অর্থাৎ নিজের দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলার প্রতি স্বয়ং আলীবর্দিরও যে বিশ্বাসে ঘাটতি ছিল তা গোলাম হোসেন স্পষ্ট করে গেছেন। নিজের মৃত্যুর পর মুর্শিদাবাদের নিজামতবৃত্তি ও নাতি সিরাজউদ্দৌলার জীবন নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতেন আলীবর্দী। কারণ তিনি জানতেন মাথার ওপর বিদেশি বণিকদের চাপ দিনে দিনে বাড়ছে। তার ওপর ঘরোয়া শত্রুর অভাব নেই। আর সেই চাপ নিয়ে রাজ্যপাট অটুট রাখার ক্ষমতা আর যারই থাক, ভোগবিলাসী ও ইন্দ্রিয় পরায়ণ সিরাজের কোনদিনই ছিল না।
কাশিমবাজার কুঠি আক্রমণ করে সাহেবদের সমুচিত শিক্ষাদানের পরে দুই পক্ষের একটা মুচলেখা স্বাক্ষর হয়েছিল। এরপর নবাব যদি কিছুদিন ইংরেজদের গতিবিধির উপর লক্ষ্য রাখতেন, তবে তাঁর খুব একটা কি ক্ষতি হয়ে যেত? উপরন্তু তার কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি যুদ্ধযাত্রায় প্রস্তুত হন। আর এই আকস্মিক কলকাতা আক্রমণ ইংরেজরা কোনদিনই মেনে নিতে পারেনি।
নবাবের কলকাতা আক্রমণের আশঙ্কায় তঠস্থ ছিল ইংরেজ কোম্পানি। এমনকি ১৭৫৬ সালের ১লা জুন কাশিমবাজারে ওয়াটসকে কলকাতা কাউন্সিল চিঠি দিয়ে জানায় যে নবাবের কথা অনুযায়ী তারা পেরিনস পয়েন্টে নির্মাণ ভেঙে দিতেও প্রস্তুত। এই পেরিনস পয়েন্ট হলো বর্তমানের বাগবাজার। তখন বাগবাজারে গঙ্গার ধারে পেরিন সাহেবের একটি পেল্লায় বাংলো বাড়ি ছিল। গঙ্গায় বাঁধা থাকত তার বাণিজ্য জাহাজ। কলকাতা থেকে দেশীয় পণ্যদ্রব্য ইউরোপে আমদানি রপ্তানি করে তার প্রচুর প্রতিপত্তি হয়েছিল একসময়। সেই থেকেই সেখানকার নাম পেরিনস পয়েন্ট। ফলে নিজেদের বাঁচাতে নবাবকে সন্তুষ্ট করবার জন্য কোম্পানি এক রকম উঠে পড়ে লাগে। কারণ মুর্শিদাবাদ থেকে আসা নবাবের বিশাল বাহিনীকে প্রতিরোধ করার মত ক্ষমতা তখনও ইংরেজদের হয়নি তা তারা বিলক্ষণ জানতো। কিন্তু কোনভাবেই সমঝোতার মানুষ নবাব সিরাজ নন। ওই জুন মাসেই কলকাতায় খবর প্রচারিত হয়ে গেল, নবাব সিরাজউদ্দৌলা মুর্শিদাবাদ থেকে পঞ্চাশ হাজার সৈন্যবাহিনী নিয়ে আক্রমণ করতে চলেছেন কলকাতা। এরপর কলকাতা কাউন্সিল ঢাকা, জগদিয়া, বালেশ্বর প্রভৃতি কুঠির কর্মচারীদের চিঠি দিয়ে কলকাতায় আসতে আদেশ করলো। এমনকি চিঠি গেল বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সিতেও। কিন্তু সেখান থেকে সৈন্য কলকাতায় এসে কোম্পানির ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে, এমন সময় তাদের হাতে ছিল না। ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে তখন মাত্র ১৯০ জন পুরুষ কর্মচারী, যার মধ্যে ১৬০ জন সাহেব। এই ছিল পঞ্চাশ হাজার নবাবী সৈন্য কে প্রতিহত করবার জন্য সার্বিক ইংরেজ সৈন্যদল। তাও তারা প্রকৃত যুদ্ধ ও বন্দুক চালনায় রীতিমতো অপটু।
এদিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছেন বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব। লক্ষ্য কলকাতা বিজয়। এর মধ্যে আবার গঙ্গার ধারে একটি ছোট্ট নবাবী কেল্লা ইংরেজরা দখল করে নিলে নবাব আরো চটে গেলেন। আজ যেখানে শিবপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন, সেখানে ছিল সেই কেল্লাটি। যুদ্ধে খাদ্য ও পণ্য সরবরাহ এবং বিভিন্ন সুযোগ সুবিধার জন্য এই কেল্লাটি হঠাৎ দখল করে কোম্পানি। নবাবের আগমনের খবর পাওয়ার পর কলকাতা শহর তখন ছত্রভঙ্গ। যে যার মতো ছুটে বেড়াচ্ছেন চারদিকে। ইংরেজ রাজপুরুষ থেকে শুরু করে সকল কর্মচারীরা এসে আশ্রয় নিয়েছে ওই ছোট্ট ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লার ভেতর। নবাবের ভয়ে সেখানে কারারুদ্ধ করা হয়েছে রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণবল্লভকে। সাহেবরা যেন তখন সর্ষের মধ্যে ভূত দেখছে। এদেশীয় যাকে পারছে ধরে পুরে দিচ্ছে কারাগারে। সিরাজের বাহিনী ১৫ই জুন হুগলিতে এসে পৌঁছল। সেখান থেকেই গঙ্গা পেরোনোর সমস্ত প্রস্তুতি নেওয়া হলো। গঙ্গার পূর্ব তীরে কলকাতা। তাই হুগলি থেকে গঙ্গা পেরিয়ে তীরবর্তী এলাকা দিয়ে কিছুটা হেঁটে গেলেই পেরিনস পয়েন্টে পৌঁছে যাওয়া যায়।
পথে আসতে আসতে চুঁচুড়ায় ও চন্দননগরে ওলন্দাজ ও ফরাসিদের সাহায্য চাইলেন নবাব। এছাড়াও শ্রীরামপুরে তখন দিনেমারদের বাস। তাদের কাছেও পৌঁছে গেল নবাবের চিঠি। কিন্তু বুদ্ধিমান ইউরোপীয়রা সরাসরি ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগদান না করলেও নবাবকে নৈতিক সমর্থন যুগিয়ে দিলেন। ক্রমে ইংরেজরা বুঝে গেল যে আর অনুরোধ, উপরোধ, কাকুতি মিনতির কোন ফল নেই। এখন কলকাতা বিপন্ন। আর তাদের যেভাবেই হোক দাঁড়াতে হবে বাংলা বিহার উড়িষ্যার শক্তিশালী নরপতির বিরুদ্ধে। এভাবেই ধীরে ধীরে তৈরি হলো কলকাতা যুদ্ধের প্রাথমিক জমি।