সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৩২)

কলকাতার ছড়া 

“পিরালী কায়েত তাঁতী আর সোনার বেনে
করলে আবাদ তারা দেশ বয়ে ধন এনে।”

এই মহানগরীর নেই আদি নেই অন্ত। একেবারে অজ পাড়াগাঁ থেকে হঠাৎ করে গড়ে ওঠা ঝাঁ চকচকে শহর। আর তার নেপথ্যে যারা তাদের কথা না বললেই নয়৷ আজকের জনঅরণ্যের এই শহরে প্রথম নাগরিক হলেন বসাক আর শেঠ। এই বসাক পরিবারের শোভারাম বসাকের নামেই আজকের শোভাবাজার। যদিও ভিন্নমতও আছে। সদ্য এদেশে আসা ইংরেজ কোম্পানির সাথে ব্যবসা করে প্রতিপত্তি বাড়ানো বাঙালীর সংখ্যা নেহাত কম নয়৷ কলকাতায় কোম্পানির বাড়বাড়ন্ত ব্যবসা ও কাঁচা টাকার টানে বিভিন্ন দিক থেকে ছুটেও আসতে লাগলো ছাপোষা বাঙালী পরিবার। নিজেদের দেশ ভিটে ছেড়ে কলকাতায় থেকে কোম্পানির সাথে ব্যবসা করে তাদের বিস্তর আয় উপায়ও হতে শুরু করলো। আজও শহরের বিভিন্ন প্রাসাদোপম বাড়ি সেযুগে প্রতিপত্তির সাক্ষী দেয়। এরকমই একটি বাড়ি জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। বর্ধমানে নিজের গ্রাম ছেড়ে গোবিন্দপুরে চলে এসেছিলেন পঞ্চানন কুশারী। ইংরেজদের জাহাজ তখন প্রতিনিয়ত নোঙর ফেলে কলকাতার গঙ্গায়। মালপত্র ওঠানো নামানোর জন্য প্রয়োজন প্রচুর মানুষের। আর সেই লোক যোগানের কাজটাই করতেন পঞ্চানন। কুলী মজুরদের কাছে তিনি হয়ে গেলেন পঞ্চানন ঠাকুর। আর সেই থেকেই আজকের ঠাকুরবাড়ি। বাংলা যখন মুসলিম শাসনাধীন, তখনই জাত খুইয়ে সমাজচ্যুত ব্রাহ্মণরা পিরালী বলে পরিচিত ছিলেন। পুরনো মঙ্গলকাব্যে পাওয়া যায়,

“পিরুল্যা গ্রামেতে বৈসে যতেক যবন
উচ্ছন্ন করিল নবদ্বীপের ব্রাহ্মণ
কপালে তিলক দেখে যজ্ঞসূত্র কাঁধে
ঘর দ্বার লোটে আর লৌহ পাশে বাঁধে।”

অর্থাৎ পিরুল্যা গ্রামে ব্রাহ্মণ থেকে যবন হওয়া পরিবারই পিরালী। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিবার ঠিক তেমনই পিরালী ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়ভুক্ত। কলকাতায় আসার পর পঞ্চাননকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। তাঁর দুই ছেলে জয়রাম ও রামসন্তোষ শহরেই পেয়ে যান আমিনের কাজ। জয়রাম ঠাকুরের তিন সন্তান। নীলমণি, দর্পনারায়ণ আর গোবিন্দরাম। উত্তর কলকাতায় আজও বিভিন্ন রাস্তা এঁদের সাক্ষ্য বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। পাথুরিয়াঘাটায় বাড়ি করে এই তিন ভাই উঠে এলেও পরে নীলমণি ঠাকুর নিজের পাথুরিয়াঘাটার সম্পত্তি বেচে চলে আসেন জোড়াসাঁকোয় এবং নির্মাণ করেন আজকের এই ঠাকুরবাড়ি। লেখা হয় ঠাকুর পরিবারের নতুন ইতিহাস।
তখন টাকা আয়ের প্রচুর সুযোগ কলকাতায়। উড়ছে কাঁচা টাকা। ইংরেজ কোম্পানির দপ্তরে প্রচুর কাজ। আর সেই সুযোগকে কাজে লাগাতেই যেন মরিয়া একদম বাঙালী বণিকের দল। শেঠ আর বসাকরাও ঠিক এমনই বণিক। কলকাতার পুরনো বাসিন্দা হিসাবে কোম্পানির তরফে তাঁদের ওপরেই এসে পড়ে শহর রক্ষণাবেক্ষণের কাজ। জঙ্গল কেটে রাস্তা বানিয়ে তাঁরা নিজে হাতে ধরে যেন নির্মাণ করেন কলকাতাকে। এমনকি কোম্পানি তাদের খাজনাও মুকুব করে দিতে দুবার ভাবেনি। তখনো পলাশির যুদ্ধ হয়নি। নবাবকে পরাস্ত করে কলকাতার দখল হাতে তুলে নেয় নি কোম্পানি। কিন্তু বাণিজ্য চলছে অবাধে। কিছু জানিয়ে আবার কিছু নবাবের চোখে ধুলো দিয়েই। আর একসবের সাক্ষী কলকাতার পুরনো বাঙালী পরিবারেরা। ইংরেজদের দালালি করে তাঁদের অগাধ সম্পত্তি। এমনকি গঙ্গাজল শিল করে নাম ছাপিয়ে বিদেশে পাঠিয়েও আসতো নগদ টাকা। আর সাথে ছিল উপরি আয়ের সুযোগও। আর তাতেই আসল রমরমা। টাকার ওপর টাকা করার আদপকায়দা তাদের অক্ষরে অক্ষরে জানা। সোনার বেনে অর্থে সুবর্ণবণিক। আর সেখানেই নাম করতে হয় রাজারাম মল্লিকের৷ জব চার্ণকের খাস লোক রাজারামেরও ব্যবসায় বাড়বাড়ন্ত। একরকম তাঁর পরামর্শেই চার্ণক সাহেবের কলকাতার স্থায়ী বাস৷ আর কোম্পানির সৌজন্যে রাজারামের বড়বাজারে বসবাস৷ তাও বিনা খাজনায়। এভাবেই কলকাতার সুখ দুঃখের সাথে ধীরে ধীরে জুড়ে যায় এইসব পরিবারের নাম। আর আজও জনবিস্ফোরণের মহানগরী কোথাও যেন লুকিয়ে রেখেছে সেইসব হারানো দিনলিপি।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।