সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৩১)

কলকাতার ছড়া

তখনও গড়ে ওঠেনি শহর কলকাতা। জব চার্নক সবে বাংলায় এসেছেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দায়িত্ব মাথায় করে নিয়ে। হুগলিতে ঘাঁটি গাড়লেও শান্তি নেই বিদেশ বিভূঁইয়ের দৈনন্দিন জীবনে। বাংলার মসনদে তখন শায়েস্তা খাঁ। ধন্যি তাঁর দাপট। সাহেব দেখলেই যেন আস্ত গিলে নেন। তাঁর কাছে জব চার্নক সাহেব আগমনের খবরও অজানা নয়। আর এটাই ভয় সাহেবদের। নবাবের আক্রমণ শুরু হলে আর হুগলিতে থাকা দায়৷ পত্রপাঠ দেশছাড়া হওয়া ছাড়া আর উপায় থাকবে না। দুর্গ বানানোর ছাড়পত্রও মেলে নি বিলতে কোম্পানির তরফে৷ তখব সবেই এদেশে গোড়াপত্তন। সাহেবদের না আছে চাল,না আছে চুলো। শুধু নবাবের চোখে ধুলো দিয়ে দিয়ে ঘুরে বেড়ানো। কলকাতার মাটিতে তখনও পা পড়েনি চার্নক সাহেবের। শহর তৈরি তো বিশ বাঁও জলে। হুগলিই তখন থাকবার জন্য শান্তির জায়গা৷ জল হাওয়াও নিরাপদ। কিন্তু সুখ আর সয় কতদিন৷ নবাব সৈন্যদের তাড়া খেয়ে হুগলী ত্যাগ করতে প্রায় বাধ্য হল সাহেব। সঙ্গে কোম্পানির সিভিল অফিসার ও কর্মচারীরাও৷ কিন্তু জায়গা জুটবে কোথায়। অবশেষে মিলে গেল থাকবার ঠাঁই৷ হিজলী। সমুদ্রের কাছাকাছি। জলে মাটিতে নুন। সেখানেই ঠাঁই গড়লেন চার্নক। হিজলীই সেই সময়ে হয়ে উঠলো কোম্পানীর ব্যবসায় প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু থাকবার জায়গা একটা হলেও স্বাস্থ্যকর একেবারেই নয়৷ জল হাওয়ায় বিষ। দুদিন সেখানকার জল পেটে পড়লেই সাহেবদের নির্ঘাত কলেরা৷ পরিণাম ভয়াবহ, এমনকি মৃত্যুও। স্বভাবতই নবাবের নজিরের বাইরে নিরাপদ আশ্রয় হলেও হিজলী হয়ে উঠলো সাহেবদের বিভীষিকা। ফলে মুখে মুখে ছড়া কাটলো বাঙালী৷

একবার খেলে হিজলী পানি
যমে মানুষে টানাটানি

সত্যিই যেন যমের সাথে বাস। হিজলীতে প্রতিদিন নিয়ম করে মরতে থাকে সাহেবরা। আবার জায়গা ত্যাগ করা ছাড়া উপায় নেই তাদের। তাই কিছুদিন হিজলীতে বসবাসের পর আবার পাল ওঠে নৌকায়। ভেসে যায় সাহেবরা। সঙ্গে ভাসতে থাকে তাদের ব্যবসার ভবিষ্যতও। এরপরই নৌকা এসে দাঁড়ায় সুতানুটির ঘাটে। নিরিবিলি বাসস্থান হিসাবে জায়গাটা ভালোও লাগে সাহেবের। নবাবের দৃষ্টির আড়ালেও। ফলে আবার শুরু হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নতুন পথ চলা। নতুন করে ভাগ্য নির্মাণের কাজ। তো যাই হোক, এদেশে কোম্পানির দিনযাপনের সাথে জড়িয়ে গেল আরো একটি জায়গার নাম। হিজলী। আজকের মেদিনীপুরে এই জায়গা এখনো দাঁড়িয়ে আছে সাহেব বেনিয়াদের সামান্য কিছুদিনের স্মৃতি বুকে নিয়ে। কিন্তু আজ আর অবশিষ্ট নেই কোনো স্মৃতিচিহ্নই। খুব স্বল্প দিনে স্বাভাবিক ভাবেই কোনো স্থাপত্য বা দুর্গের নিশান রাখা হয়নি তাদের। নবাবের জায়গায় তাঁর চোখে ধুলো দিয়ে পাকা স্থাপত্য নির্মাণের মত দুঃসাহস তারা অনেকদিনই দেখাতে পারে নি। সেদিক থেকে তাদের প্রথম নির্মাণের সাক্ষী এই শহর কলকাতাই৷ ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ। সুতানুটিতে পা দেবার অনেক পরে বহু কাঠখড় পুড়িয়ে নবাবের চোখে ধুলো দিয়ে ভিত্তি প্রতিষ্ঠা হয় দুর্গের। তাও প্রথমে কাঁচা দুর্গ। ভেতরে উপাসনাস্থল। কিন্তু সবকিছুর আগে সাহেবদের সেই হিজলীর বাস। বাদশা, নবাবদের সাথে লুকোচুরি খেলবার দিনগুলোয় বহু জায়গায় অস্থায়ী বসবাসের স্মৃতি নিয়েই পরে কলকাতায় থিতু হয় তারা। কিন্তু ছড়া ঘোরে মুখে মুখে৷ লোককথার মৃত্যু নেই। আজও তাই জীবন্ত এইসব ছড়া সবার অজান্তেই ধরে রেখেছে পুরনো কলকাতার দিনকাল।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।