সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৩৩)

কেল্লা নিজামতের পথে
সিরাজউদ্দৌলা চরিত্র বিশ্লেষণ করতে বসলে প্রতিমুহূর্তে ধাক্কা খেতে হয় কোন এক অজানা ভগ্ন প্রাচীরে। আজকের মুর্শিদাবাদ জুড়ে শুধুই এমন অজস্র ভগ্ন প্রাচীর। আর সেসব ঘিরে থাকা বহু বহু গল্প। গল্প থাকা ভালো কিন্তু তা যখন জলজ্যান্ত ইতিহাসকে বিকৃত করে দেয় তখন তা আর এলাকাভিত্তিক বেড়াজালে আবদ্ধ থাকে না। এই গল্পগুলোই সীমানা অতিক্রম করে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। আমি মুর্শিদাবাদ ঘুরেছি অজানাকে জানবো বলে। মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি বিভিন্ন জানা-অজানার পরিসরে। কেউ বলেছেন সিরাজ দোষী, কেউ বলেছেন সিরাজ মুর্শিদাবাদের নায়ক। এইসব মিলেমিশেই একাকার হয়েছে চাপা পড়ে থাকা আর একটা মুর্শিদাবাদ। ভাগীরথীর আশেপাশে আজও যেন এক চাপা কান্না। কুকুর শেয়াল শুকর ঘুরে বেড়ানো ঘাট গুলো কেমন যেন বিচ্ছিন্ন এবং একাকী। জৌলুস তো নেই ই৷ উপরন্তু আশপাশটা যেন ভয়ানক একা। সবকিছু মিলামিশে গিয়ে ইতিহাসের যেন একটা দলা পাকানো বহু প্রাচীন মৃতদেহ।
এমন ভগ্নপ্রায় মুর্শিদাবাদই আমায় টানে। আশপাশে ঘুরে বেড়ানো মুখগুলো যেন ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে নিজেদের মতো। আর্তিটুকু ভীষণ স্পষ্ট। ইংরেজরা দেশে এসেছিল ঠিকই, শুধু পতন ঘটিয়েছিল একটা আস্ত মুর্শিদাবাদের। গড়ে তুলেছিল কলকাতা। আজকের কলকাতা মহানগরী। যেন আস্ত একটা মুর্শিদাবাদ অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে জাঁকিয়ে বসেছিল গঙ্গাপাড়ের আর এক অজপাড়াগাঁ কলকাতায়। সে গল্প না হয় পরেই বলা যাবে। আপাতত আমাদের কাহিনীতে ভেঙে পড়েনি মুর্শিদাবাদ। তখনও দাপিয়ে সিংহাসনে আসিন রয়েছে নবাব সিরাজউদ্দৌলা। রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই উত্তপ্ত। বাংলার আশেপাশের সমস্ত হিন্দু রাজন্যবর্গ এবং মুর্শিদাবাদের প্রবীণ হিতৈষীগণ প্রত্যেকেই প্রায় সিরাজ বিরোধী।
সিরাজ চরিত্র মানুষের সামনে ফুটিয়ে তুলতে গেলে আর একটি ঘটনার উল্লেখ করতেই হয়। ঢাকার ডেপুটি নবাব তখন আলীবর্দীর বড় জামাই নওয়াজেশ মহম্মদ। অর্থাৎ ঘষেটির স্বামী। কিন্তু তার রাজপাট সামলায় তারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু দেওয়ান হোসেন কুলি খাঁ। নওয়াজেশের সাথে ভালো সম্পর্কের ফলে তার গৃহে হোসেন কুলির অবাধ যাতায়াত। আর ঢাকার আইন কানুন নিয়ে আলাপ আলোচনা তো আছেই। সবে মিলিয়ে নওয়াজেশ আর হোসেন কুলির সম্পর্ক খুবই ভালো। আর সেই থেকেই নওয়াজেশ পত্নী ঘষেটির সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েই মুর্শিদাবাদের আকাশে বাতাসে ওড়ে বহু কথা, কানাঘুষো। চারিদিকে প্রসঙ্গ কেবল হোসেন কুলি আর ঘষেটি বেগমের প্রণয়। আবার তার সাথে যুক্ত হয়েছেন সিরাজের মা আমিনা বেগমও। হোসেন কুলির সাথে তার ঘনিষ্ঠতাও সর্বজন আলোচিত। এই ত্রিকোণ সম্পর্ক নিয়ে মুর্শিদাবাদের আকাশ তোলপাড়। স্বভাবতই কথা গেল সিরাজ ও আলীবর্দীর কানে। ছেড়ে দেবার পাত্র আর যেই হোন, সিরাজ নয়। সে উদ্ধত স্বভাবের৷ ফলতই তার হাতে তৈরি হল হোসেন কুলি হত্যার ব্লু প্রিন্ট। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল এই নকশায় শিলমোহর দিলেন স্বয়ং নবাব আলীবর্দী। কূলের মান ও সম্ভ্রম বাঁচাতে তিনিও হাত তুলে নিলেন হোসেন কুলির ওপর থেকে৷ তৈরি হয়ে গেল হত্যার ষড়যন্ত্র। নেতৃত্বে সেই সিরাজ। অবাক করার মত বিষয় হল এই হত্যাকাণ্ডে শিলমোহর দিলেন নওয়াজেশও। সবাই মিলে একমত হয়ে হোসেন কুলিকে একঘরে করা হল। এমনই এক দিনে নওয়াজেশের সাথে দেখা করে ফেরবার পথে সিরাজ এসে দাঁড়ালেন হোসেন কুলির ঘরের সামনে। আদেশ দিলেন হোসেন কুলিকে সামনে আনার জন্য। তার আদেশ মতো পাশ্ববর্তী হাজী মেহেদীর ঘর থেকে টেনে নিয়ে আসা হল হোসেন কুলির মত হতভাগ্যকে। সিরাজ আদেশে মুহূর্তে প্রকাশ্য রাজপথে দিনের আলোয় নগরবাসীর সামনেই খণ্ড খণ্ড করে ফেলা হল তাকে৷ সে এক নারকীয় দৃশ্য। হোসেন কুলির রক্তে ভেসে গেল রাজপথ। তার সাথে হত্যা করা হল তার অন্ধ ভাইকেও। নির্দোষের দণ্ডলাভের মত বিনা কারণে সেইদিন প্রাণ দিলেন তার ভাই হায়দার কুলিও৷ এই নারকীয় হত্যা কোনোদিন পিছু ছাড়েনি সিরাজের। মৃত্যুর আগে পর্যন্তও এই দিনটা তাড়া করে বেড়িয়েছে তার মতো দোর্দণ্ডপ্রতাপ নবাবকেও। মুতাক্ষরীণ রচয়িতা গোলাম হোসেন এই দিনের হত্যাকাণ্ডকেই সিরাজ পতনের মূল কারণ হিসাবে দেখিয়ে গেছেন। সত্যিই এই ঘটনা আশ্চর্যজনক। নবাব দরবারের একজন কর্মচারীকে হত্যা করবার জন্য এমন সম্মিলিত ষড়যন্ত্র ও রাজপথে তাকে হত্যা মুর্শিদাবাদ আগে কখনো দেখেনি। কোনো আইন নেই, নিয়ম নেই, বিচার নেই। মা ও মাসির সাথে প্রণয়ের শাস্তি দিনের আলোয় প্রকাশ্য হত্যা। এ যেন নিয়মকানুন শিকেয় ওঠা এক দেশের কথা। এরপরেও নবাব সিরাজ পতনের জন্য যাঁরা শুধু মিরজাফর বা জগত শেঠকে দায়ী করে বিশ্বাসঘাতক বলেন, তাঁরা একটু ভেবে দেখবেন। এই আর্জি রইল।
ঘটনাবলীকে সামনে থেকে দেখা গোলাম হোসেন তাঁর মুতাক্ষরীণে লিখছেন – সিরাজউদ্দৌলা হোসেন কুলি হত্যার প্রধান উদ্যোগী। কিন্তু একজন লোককে এইরূপে নিহত করবার জন্য সকলে সম্মতি দিলে, তাদের কাউকেই সিরাজ অপেক্ষা কম দোষী বলা যায় না। পারিবারিক কলঙ্ক নিবারনের জন্য অনেকেই আকস্মিক অনেক হত্যাকান্ড ঘটিয়ে ফেলে। কিন্তু এমন পরামর্শ করে নবীন প্রবীণ এক হয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটানো ইতিপূর্বে প্রায় কখনো ঘটেনি। গোলাম হোসেন বলছেন, এই নির্দোষীর রক্তপাত চিরদিনের জন্য আলীবর্দীর বংশে কলঙ্ক লেপন করে রেখেছে এবং এটিই তার ধ্বংসের মূল কারণ।
গোলাম হোসেনের এই বক্তব্য সিরাজ চরিত্র নিরূপণে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। নবাব হওয়ার আগে থেকেই সিরাজ কেমন ছিলেন তা গোলাম হোসেনের থেকে ভালো কেউ জানেন না। শুধু এই হত্যাকাণ্ডই নয়, সিরাজের হাতে সম্পন্ন হয়েছে এমন অনেক নারকীয় ও হটকারি কার্যকলাপ। দূরদর্শী হলে সে কোনদিনই এসব কাজ করতে পারত না। নিজের গায়ের জোরে পৃথিবী জয় করতে গেলেও নিজের ভবিতব্যকে জয় করতে পারেনি সে। পারার কথাও নয়। অন্তর্ঘাতের শিকার সে একা নয়। তার আগে বহু অন্তর্ঘাতের নায়ক সে নিজে। সে হোসেন কুলি হোক অথবা সওকত জঙ্গ৷ সিরাজের হাত থেকে বাঁচেননি প্রিয় দাদু আলীবর্দীও৷ তার লোভের আগুনে পুড়তে হয়েছে সকলকেই। আর সেই আগুনই একদিন ভস্মীভূত করে দিয়েছে তাকেই। নাহলে কৃষ্ণনগরের ধার্মিক ও প্রজাবৎসল রাজা কৃষ্ণচন্দ্র বিনা কারণে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে যোগদান করেন, এমন হতে পারে না।