সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ২৪)

কলকাতার ছড়া

গাঁজা গুলির আড্ডা শুধুমাত্র আজকের জিনিস নয়। সেকালেও পাড়ার মোড়ে মোড়ে চলতো গাঁজার ঠেক। বাগবাজারে পক্ষীর দলে গাঁজার ঠেকের কথা তো আগেই বলেছি। গাঁজায় টান দিয়েই তারা গানে গানে কলকাতা মাত করেছিল। এছাড়াও কলকাতার আশেপাশে বিভিন্ন জায়গায় চণ্ডু বা গুলীর আখড়া। সে কোন্নগর হোক অথবা বটতলা, বৌবাজার হোক বা কালীঘাট। আখড়ায় আখড়ায় চলতো গাঁজার দিব্য সুখ টান। কখনো বাবু শিবকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের মত কেউ কেউ তাদের আখড়া থেকেই তুলে এনেছেন সমাজের মূল আলোয়। বিখ্যাত করেছেন তাদের। আবার কেউ কেউ হারিয়ে গেছেন অন্ধকারে। কিন্তু ছড়ার এক পংক্তিতে বেঁধে রেখে এই নেশার আখড়াদের স্মরণীয় করে গেছে সেকালের কলকাতা শহর। কলকাতাবাসী মুখে মুখে বলত-

“বাগবাজারে গাঁজার আড্ডা, গুলীর কোন্নগরে,
বটতলার মদের আড্ডা, চণ্ডুর বৌবাজারে,
এই সব মহাতীর্থ যে না চোখে হেরে,
তার মত মহাপাপী নাই ত্রিসংসারে।”

ব্যঙ্গাত্মক ছড়া সাহিত্যে বাঙালির জুড়ি মেলা ভার। ঘটমান বিভিন্ন সামাজিক ছবি প্রতি যুগে উঠে এসেছে কথ্য ছড়ায়। রাস্তাঘাট ঢাক ঢোল পিটিয়ে গান ধরেছে কবির দল। পুরনো কলকাতার সামাজিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হল এই ছড়াগুলো। এবার বলি বটতলার কথা। আজও চটুল সাহিত্যকে নির্দেশ করতে ‘বটতলার সাহিত্য’ শব্দবন্ধটি ভীষণ প্রচলিত৷ কিন্তু ‘বটতলা’ শব্দেই অশ্লীল নয়। প্রথম দিকের এক অদ্ভুত অন্ত্যজ সাহিত্যের বার্তা আজও বয়ে নিয়ে যায় এই বটতলা। শোভাবাজার চিৎপুর অঞ্চলে এক বিশাল বটগাছকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে এই সাহিত্যের পসরা। সে এক দিন ছিল। তুলনায় কম শিক্ষিত খেটে খাওয়া মানুষ দিন ফুরোলে আড্ডা দিত বটতলায় আর পড়তো হাজার রকমারি বৈচিত্রময় বই। কী নেই সেই তালিকায়। পুঁথি, পাঁচালি থেকে শুরু করে ব্যঙ্গাত্মক রসাত্মক গল্প। কোনোকিছুরই বিক্রিতে ভাঁটা নেই। ফলে তার আশপাশে গড়েও উঠলো প্রচুর ছাপাখানা। সময়টা বাংলার নবজাগরণের। কুলীন সাহিত্যিকরা তখন রচনা করে চলেছেন এক একটা কালজয়ী সাহিত্য। কিন্তু সে আর সাধারণ অল্প শিক্ষিত বাঙালিকে ছুঁতে পারে কই। সাধারণ মেয়েদের ও অল্প শিক্ষিত মানুষদের জন্য সাহিত্য রচনায় প্যারীচাঁদ মিত্র, রাধানাথ শিকদাররা একটা মোক্ষম চেষ্টা করেছিলেন বটে, কিন্তু তাও যে পুরোপুরি বাঙালি সমাজে হৃদয়ঙ্গম হয়ে ওঠে তেমনটা নয়। ফলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে বটতলা। আর সেখানকার আড্ডা। আর আড্ডায় মদ গাঁজার ঠেক থাকবে তা অতি সাধারণ একটি বিষয়। সাহিত্য ও আড্ডার ঠেকে ভিড়ও জমালো মানুষ। আড্ডাপ্রিয় বাঙালি। নাহলে কি আর একটা আস্ত জায়গার নাম বৈঠকখানা রোড হয়? আজও সারা শহর জুড়ে পুরনো বাড়ির সামনে শুনশান পড়ে থাকে আড্ডার রোয়াকগুলো। অনেক আড্ডার সাক্ষী তারা।
এছাড়াও গুলীর আড্ডায় জুড়ি মেলা ভার কলকাতা নিকটস্থ গ্রাম কোন্নগরের। গঙ্গার ধারে গুলীর ঠেক। পিছিয়ে ছিল না বৌবাজারও। সেখানেও পাড়ায় পাড়ায় আড্ডা। অভিজাত বাবু থেকে শুরু করে নীচু তলার খেটে খাওয়া মানুষ, কার আগমন নেই। ফলে বাংলার সব জায়গাতেই আড্ডা ও নেশার আখড়া থাকলেও আবশ্যিক ভাবে কিছু জায়গার নাম উঠে এসেছিল ছড়াতে। আর ব্যঙ্গার্থে এইসব জায়গার জন্য ব্যবহৃত হল ‘মহাতীর্থ’ শব্দটি। এটাই তো সাহিত্যে প্রয়োজনীয় রসবোধের উপকরণ। আজব কলকাতার আজব উত্থান। সময়ের চাকায় চাপা পড়ে যাওয়া বিভিন্ন টুকরো ঘটনা। আজও সেইসব স্মৃতির অবতারণাই যেন ফিরিয়ে আনে পুরনো দিনগুলোকে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।