গল্পে কবিতা চক্রবর্ত্তী

জল

স্কুলবাস থেকে প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ বাড়ির কাছের মোড়ের মাথায় নামে দিয়া। ওর মা রিনি, বাস আসার আগেই পৌঁছে যায় রোজ। দিয়া ক্লাস থ্রীতে পড়ে। লেখাপড়ার খুব ভালো। ভীষণ বাধ্য আর শান্তশিষ্ট মেয়ে দিয়া। স্কুলের সবাই ওকে ভালোবাসে ওর স্বভাবের জন্য। তাছাড়া ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল ও। সবসময় মুখে এক গাল হাসি। ফুলের মতো সুন্দর একটা মেয়ে দিয়া।

স্কুলবাস থেকে নেমেই বন্ধুদের উদ্দেশ্যে একটা টাটা জানায় রোজ দিয়া। তারপর মায়ের হাত ধরে স্কুলের গল্প বলতে বলতে বাড়ি ফেরে দুজনে।

আজও রিনি বাস আসার আগেই পৌঁছে গেছে মোড়ের মাথায়। বাস আসলো। দিয়া নামলো বাস থেকে। কিন্তু আজ ওর মুখটা এরকম লাগছে কেন? কেমন থমথমে যেন। হাসি নেই মুখে। বন্ধুদের টা টা করলনা আজ। কিছু কি হয়েছে? রিনি ভাবতে লাগলো। তারপর আদর করে জিজ্ঞাসা করে ফেললো, কি হয়েছে দিয়া মা তোমার? বন্ধুদের তো আজ টা টা করলে না? বন্ধুদের সাথে আড়ি হয়েছে নাকি?

কিন্তু দিয়া সেরকম কিছুই বললোনা। শুধু মাথা নাড়লো।

প্রত্যেকদিন স্কুল থেকে বাড়িতে এনে রিনি দিয়াকে হাত পা মুখ ভালো করে সাবান দিয়ে ধুয়ে দেয়। তারপর ওকে ভাত খাওয়ায়। কিন্তু আজ অদ্ভুত আচরণ করলো দিয়া। মুখে সাবান দেওয়ার সময় চোখ জ্বালা করে বলে ওকে চোখ বন্ধ রাখতে বলা হয়। বাধ্য মেয়ের মত তাই রোজ করে দিয়া। কিন্তু আজ ও কিছুতেই মুখে সাবান দিতে দেবেনা। খালি বলছে আমার চোখ জ্বালা করবে ,আমি চোখ খুলতে পারবোনা, কিছু দেখতে পারবোনা। রিনি অনেক বোঝালো যে জল দিয়ে সাথে সাথেই ধুয়ে দেবে প্রত্যেকদিনর মত। কিন্তু দিয়া উল্টে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। অগত্যা মুখ ধোয়ানো হলোনা। ভাত খাওয়াতে বসেও একদম খেতে পারলনা। খালি জল খাচ্ছে। কিছু একটা চিন্তা করে যাচ্ছে। আর মনে হচ্ছে যেন খুব ভয় পেয়েছে কিছুতে। রিনি অনেক ভাবে জানার চেষ্টা করলো স্কুলে কিছু হয়েছে নাকি। কেউ কিছু বলেছে নাকি। কিন্তু মেয়ে কিছুই বলছে না।

ভাত খাওয়ানোর পর ঘণ্টা খানেক ওকে শুতে দেয় রিনি। রোজ ঘুমায় না। হয়তো একটু কার্টুন দেখে টিভিতে। কিন্তু আজ দিয়া একদমই কার্টুন দেখলোনা। টিভি চলেই গেলো। দশ মিনিট অন্তর অন্তর খালি বাথরুমে যাচ্ছে। রিনি জিজ্ঞাসা করছে, এতবার বাথরুমে কি করছে? কিছুই বলছে না। রিনির এবার একটু যেনো ভয় ভয় লাগতে শুরু করলো। বাথরুমে বার বার কি করছে? দরজার ফাঁক দিয়ে দেখলো কলটা ধরে দাঁড়িয়ে আছে। জিজ্ঞাসা করলেও কিছু বলছে না। তবে কি খারাপ কিছু ঘটেছে, যেটা ভয় পাচ্ছে মেয়ে বলতে? এত বার বাথরুমে কেনো যাবে? চোখ বন্ধ করতে ভয় পাচ্ছে কেনো? কিসের ভয় পাচ্ছে মেয়েটা? মাথার মধ্যে খালি খারাপ চিন্তা আসছে। মেয়েকে তো শিখিয়েছে গুড টাচ্ আর ব্যাড টাচ্ সম্মন্ধে। তাহলেও, একদম তো বাচ্চা। ভীষণ খারাপ চিন্তা আসছে মনে ।

মেয়েকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলো রিনি। অনেক আদর করে জানতে চাইলো, তোমাকে কি কেউ ব্যাড টাচ্ করেছে? মেয়ে এবারও কিছু বললোনা। খালি বললো আমার খুব ভয় লাগছে। কিন্তু কিসের জন্য সেটা বলছে না। একটু পরে মায়ের বুকের মধ্যেই পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়লো দিয়া। কিন্তু মাঝে মাঝেই ঘুমটা ভেঙে যাচ্ছিল ওর। আর ভয় পাচ্ছিল।

দিয়া ঘুমালে রিনি ফোন করলো অঞ্জনকে। অঞ্জন অফিসে ছিল। ওর বাড়ি ফিরতে প্রায় সাতটা বাজে। কিন্তু আজ রিনি, দিয়ার সব কথা অঞ্জনকে জানাতেই, ও বললো আমি এক্ষুনি আসছি। অঞ্জন রিনির গলা শুনেই বুঝতে পারলো কি ভীষণ ভয় পেয়েছে রিনি। আধ ঘণ্টার মধ্যেই অঞ্জন বাড়ি এসে গেল। মেয়ে তখনও ঘুমিয়ে আছে। রিনিকে জিজ্ঞাসা করলো অঞ্জন, দিয়ার শরীরে কোনো আঘাতের চিন্হ আছে কিনা। কিন্তু কোথাও কিছু নেই। রিনি বললো। ওর স্কুলে বন্ধুদের সাথে কোনো গন্ডগোল হয়েছে কিনা সেটাও জিজ্ঞাসা করেছে রিনি। কিন্তু সেটাও কিছু বলেনি । খালি কেমন একটা ভয়ার্ত মুখ করে মার দিকে তাকিয়ে থেকেছে। এমনিতেই খুব শান্ত মেয়ে। খুব বেশি কথা বলেনা। আজ যেন একটু বেশিই চুপচাপ।

অঞ্জন বললো, স্কুল তো এখন বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু জানতে হলে সেই কাল। তাহলে এখন কি করা যায়। ওর বন্ধুদের জিজ্ঞাসা করে যদি কিছু জানা যায়। কিছু হয়েছে কিনা।

ফোন করা হলো দিয়ার প্রিয় বন্ধু সানাকে। প্রথমে ওর মা ধরলো। তারপর সব শুনে সানাকে ফোনটা দিলো। সানাকে জিজ্ঞাসা করলো রিনি, স্কুলে কিছু হয়েছে কিনা। কিন্তু সানা বললো কিছু হয়নি তো। আমরা তো একসাথে টিফিন খেলাম। গল্প করলাম। তারপর তো সায়েন্স ক্লাস ছিল। আর তারপর তো ছুটি হয়ে গেলো। কিন্তু আজ অন্য দিনের মত দিয়া বাসের মধ্যে কথা বলছিল না। আমরা তো কত গল্প করতে করতে বাসে আসি। আজ ও আমাকে নামার সময় টা টাও করলো না।

তাহলে কি হলো?? দুজনেই চিন্তা করতে লাগলো। কাল তো স্কুলে যাবে। কিন্তু আজকের রাতটা তো দুশ্চিন্তায় দুজনে পাগল হয়ে যাবে। মেয়েটা ভয় পাচ্ছে কিসের? সেটা জানাও তো খুব দরকার।

সন্ধ্যেবেলা ঘুম ভাঙলো দিয়ার। মেয়ে তো বাবা অন্ত প্রাণ। বাবাকে দেখেই জড়িয়ে ধরলো। কিন্তু কোথায় সেই উচ্ছ্বলতা? আঁকড়ে ধরলো যেন বাবাকে। আবার কি মনে পড়তেই বাথরুমে ছুটে গেলো। এবার তার সাথে শুরু হলো বার বার জল খাওয়া। জল খাওয়া শেষ হতে না হতেই আবার জল চাই। এমন হলো, একবার তো বেশি জল খেয়ে বমি করে দিলো। কিন্তু তাও জলের গ্লাস ভর্তি করে তার সামনে রাখতেই হচ্ছে। ব্যাপারটা যে কি হচ্ছে রিনি অঞ্জন কেউ বুঝতে পারছে না।

রাত হলো। আজ বাবা মা দুজনের মাঝে শুয়েছে দিয়া। একবার বাবাকে জড়িয়ে ধরছে, একবার মাকে। ঘুমাতে পারছে না মেয়েটা। অনেক বার রিনি জিজ্ঞাসা করেছে। কিন্তু অঞ্জন বলেছে, ওকে আর কিছু জিজ্ঞাসা করার দরকার নেই । মেয়েটা আরো ভয় পাচ্ছে। তাই দুজনেই চেষ্টা করছে মজার কথা বলে ব্যাপারটা সহজ করতে। দিয়া কিন্তু চুপ করেই আছে। কিছু একটা চিন্তা করছে।আর থেকে থেকে ভয়ে কেঁপে উঠছে।

ভোর হওয়ার অনেক আগেই ঘুম ভেঙে গেছে অঞ্জনের।আসলে ঘুম তো হয়নি। ওই একটু তন্দ্রা মতন। দেখলো মেয়ে তাকিয়ে আছে। হেসে গুড মর্নিং বললো অঞ্জন। হঠাৎ দিয়া বললো আচ্ছা বাবা, পৃথিবীতে যদি জল না থাকে তবে কি হবে? অঞ্জন বললো,জল ছাড়া কি কিছু হয়? জল তো আমাদের সব কিছুতে লাগে। তাই তো তার আর এক নাম জীবন। কিন্তু তুমি এই কথা কেনো জিজ্ঞাসা করলে???

অঞ্জন দেখলো দিয়া অনেকটা স্বাভাবিক এখন। কথা বলছে ভালো করে। এবার নিশ্চয় জানা যাবে। এই কথাটা চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। যাতে আসল ব্যাপারটা জানা যায়। রিনিও ওদের কথা শুনে তাকিয়ে আছে। অঞ্জন আবার জিজ্ঞাসা করলো, তুমি এখন কেন জলের কথা বললে? আর জল থাকবেই বা না কেনো?

তখন দিয়া বললো, কাল সায়েন্স ক্লাসে আণ্টি বলছিলো,খুব তাড়াতাড়ি নাকি পৃথিবীতে আর খাওয়ার জল থাকবে না। আমরা নাকি এত অপচয় করছি তাই জন্য। জলের আর এক নাম জীবন। কিন্তু আমরা সেই জলের অপচয় করি। কত জল নষ্ট করি। রাস্তার ধারে বাসে আসতে আসতে তো দেখি, কলের থেকে জল এমনিই পড়ে যাচ্ছে। বাড়িতেও কত সময় কল খোলা থাকে। এমন করতে করতে তো একদিন পৃথিবীতে সত্যিই আর জল থাকবে না। আর জল না থাকলে আমরা তো তেষ্টায় মরে যাবো। মা মুখে সাবান দিয়ে দিলে আমার তো খুব চোখ জ্বালা করে। কিন্তু জল না থাকলে আমি সেই সাবান ধোব কি দিয়ে? আমার খুব জ্বালা করবে। কি হবে তাহলে পৃথিবীতে জল সব ফুরিয়ে গেলে? বলোনা বাবা, কি হবে তাহলে? আমরা সবাই মরে যাবো জল তেষ্টায়? তুমি আমি মা….সবাই? কাল আণ্টি পড়ানোর পর থেকে আমার খুব ভয় করছে বাবা। এত কথা বলে আবার বাবাকে আঁকড়ে ধরলো দিয়া।

হতবাক অঞ্জন রিনি। তাহলে এই ব্যাপার। অঞ্জন দিয়াকে বোঝালো, তাহলে আমাদের এই অপচয় বন্ধ করতে হবে। সবাইকে মিলে সেটা করতে হবে। তাহলেই আর জলের কষ্ট থাকবেনা। অনেক বোঝানোর পর দিয়া স্বাভাবিক হলো। কিন্তু একটা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল অঞ্জন রিনি সহ আমাদের সবাইকেই। ভয় শুধু আমরা যেগুলোতে ভাবি, সেটা ছাড়াও অন্য কিছুতে হতে পারে। ওই বাচ্চার মাথায় যে চিন্তাটা ঢুকেছে, আমরা বড়োরা তো অনেকসময় সেটা ভাবিনা? ভাববার সময় বোধহয় এসেছে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।