সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৪৪)

কেল্লা নিজামতের পথে
ইংরেজদের যেমন ফোর্ট উইলিয়াম, চন্দননগরে ফরাসিদের ছিল অঁলিন দুর্গ। এই দুর্গ আকার ও আয়তনে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের থেকেও অনেকটা বড়। তাই কলকাতায় থিতু হওয়ার পর এবং নবাবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর ইংরেজ সাহেবরা নজর দেন চন্দননগর আক্রমণের দিকে। কারণ ইউরোপে তখন ইংল্যান্ডের সাথে ফ্রান্সের যুদ্ধবিগ্রহ শুরু হয়ে গেছে। সুতরাং তার একটা প্রভাব যে এ দেশে পড়বে সেটাই স্বাভাবিক। তাই চন্দননগর আক্রমণ নিয়ে ইংরেজ কোম্পানির তখন প্রবল আগ্রহ। এদিকে কোম্পানির মধ্যে রয়েছে দ্বিধাও। কারণ চুক্তিবদ্ধ নবাব তখনও কোনো রকম ভাবে চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেননি। তাই নবাবের রাজত্বের মধ্যে অবস্থিত চন্দননগর আক্রমণ করার আগে কিছু চিন্তা তো করতেই হত। কিন্তু ক্লাইভের আগ্রাসন বহুল চর্চিত। সেখানে অন্য কারোর আপত্তি ধোপে টিকবে না সেটাই স্বাভাবিক নয় কী? মানুষটার নাম যে রবার্ট ক্লাইভ। সে তখন ইংরেজদের নেতা আর তার কথাতেই তখন চলে আপামর ইংরেজ বাহিনী। এমনকি অ্যাডমিরাল ওয়াটসন বা ড্রিক সাহেবেরও সেই ক্ষমতা নেই যে ক্লাইভের বিরোধিতা করে। সুতরাং চন্দননগর বিধ্বস্ত করার সিদ্ধান্তে একরকম শিলমোহর পড়ে গেল। নবাবের কানে খবরটা পৌঁছলে তিনিও কাশিমবাজার কুঠির ফরাসি অধ্যক্ষ ল সাহেবের অনুরোধে কিছু পরিমাণ সৈন্য প্রস্তুত রাখলেন চন্দননগরে পাঠানোর জন্য। কিন্তু এখানে প্রধান খেলাটা খেলে দিলেন একজন বাঙালি। তাঁর কথায় একটু পরে আসছি।
ক্লাইভ তার জাহাজ নিয়ে প্রথমে এসে পৌঁছোন চন্দননগরে। আর পিছনে আসতে থাকে অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। এদিকে হুগলিতে তখন ফৌজদার মহারাজা নন্দকুমার। যাঁর কথাই একটু আগে বলছিলাম। এই নন্দকুমার ইংরেজদের সুবিধা না করে দিলে কোনদিনই চন্দননগর সেইদিন ইংরেজ আওতায় আসতো না। কারণ ইংরেজদের সাথে চক্রান্ত করে তিনি সেদিন মুঘল ফৌজদের অন্যত্র সরিয়ে দেন। আর ক্লাইভের পক্ষে চন্দননগর দখল করা নিতান্ত সহজ হয়ে যায়। ফরাসীদের তখন পেল্লায় অঁলিন দূর্গ থাকলেও সৈন্যক্ষমতা খুব একটা বেশি ছিল না। শোনা যায় এখন চন্দননগরে যে জায়গায় কানাইলাল বিদ্যামন্দির, একসময় তার আশেপাশেই ছিল এই বিশাল দুর্গ। কিন্তু সেই দিনের ইংরেজ আক্রমণে এই দুর্গ এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ফরাসী শৌর্য। ইংরেজদের জাহাজ থেকে দুর্গের উপর এবং আশেপাশে নাগাড়ে গোলাবর্ষণ করে চন্দননগর শহরটাকে মারাত্মকভাবে ধস্ত করে দেওয়া হয়। সেই দিন ফরাসি অধ্যক্ষের পক্ষে ক্লাইভের বিরুদ্ধে কোন কিছু করাই সম্ভব ছিল না। কারণ ইংরেজ ক্ষমতার কাছে ভারতে তারা নেহাতই তুচ্ছ।
এই যুদ্ধে এক ফরাসি লেফটেন্যান্টের কথা বলতেই হয়। কারণ তিনি স্বজাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা না করলে হয়তো এত তাড়াতাড়ি তারা পর্যুদস্ত হতো না। কারণ শোনা যায় তখন চন্দননগরে বিভিন্ন জায়গায় এমন সব সুড়ঙ্গ ও গুপ্ত জায়গা ছিল, যা অন্য কারোর পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। কিন্তু লেফটেন্যান্ট সিজার তেরানো তলে তলে এসে যোগ দেন ইংরেজ পক্ষে। এবং চন্দননগরের সমস্ত গুপ্ত সুরঙ্গ এবং ঘাঁটির কথা অক্ষরে অক্ষরে তুলে দেন ক্লাইভ এর কানে। প্রসঙ্গত বলি, এই তো কিছুদিন আগেই চন্দননগর স্ট্র্যান্ড রোডে মাটি ধ্বসে এমন এক গুপ্ত সুড়ঙ্গ বেরিয়ে আসে। যা নিয়ে আজ পর্যন্ত কোনো চন্দননগরবাসীর বা প্রশাসনের কাছেও তথ্য ছিল না।
প্রতি সময়েই দেখা গেছে বিশ্বাসঘাতকতাই নিয়ন্ত্রণ করে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি। এক একটি বিশ্বাসঘাতকতা এক এক সময় যুদ্ধের পরিণতি নির্ণয় করে দেয়। এবং সেক্ষেত্রে বাকি বীরত্বটুকু পরিণত হয় কেবল প্রহসনে। চন্দননগর জয় করার ক্ষেত্রে তাই নন্দকুমার এবং ফরাসি তেরানোর ভূমিকা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এভাবে দীর্ঘদিনের ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগরের দখল চলে গেল ইংরেজদের হাতে। ইংরেজ আগ্রাসনের আগুন বারবার পুড়িয়েছে বাংলার বিভিন্ন দিক। এবং এই আগ্রাসনে সবথেকে যে শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে তা হল মুর্শিদাবাদ। কারণ অন্যান্য শহরগুলি ধীরে ধীরে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারলেও মুর্শিদাবাদ আর পারেনি। হারিয়ে গেছে কালের গ্রাসে।
তখন ইংরেজরা ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিল মুর্শিদাবাদের দিকেই। কারণ সেটাই ছিল তাদের পাখির চোখ। আর নবাব সিরাজউদ্দৌলার মত খামখেয়ালী নবাব তাদের সেই চাল কোনদিনই ধরতে পারেননি। প্রচুর সৈন্যক্ষমতা নিয়েও তাই তিনি বারে বারে মাত হয়েছেন ইংরেজ চালে। তিনি বুঝে ওঠার আগেই ইংরেজরা পাশার দান এগিয়েছে।
এদিকে চঞ্চলমতি নবাব কী করবেন তা নিজেই ঠিক করে উঠতে পারছেন না। কোন সমীকরণের হিসাব করলে ভবিষ্যতের জন্য তা লাভজনক হবে তা বুঝে উঠতেই দিন কেটে যায় সিরাজের। আর সেই সুযোগে ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ বাংলা দাঁড়ায় তার বিরুদ্ধে। কেউ সরাসরি আবার কেউ পিঠের পিছনে। কিন্তু তার দুর্ব্যবহার যতই বাড়তে থাকে ততই জমিদার, আমির ওমরাহ, সাধারণ কর্মচারী থেকে শুরু করে সব ধরনের মানুষ তার বিরুদ্ধে চলে যেতে শুরু করে। আর সেই সঙ্গে যুক্ত হয় এই ইংরেজ নামের বাঘা তেঁতুল সম্প্রদায়। যারা নবাবকে এক মুহূর্তও শান্তিতে থাকতে দেয়নি কখনও৷ চুক্তির পর থেকে বিভিন্ন সময়ে চুক্তির শর্ত মানা হচ্ছে না বলে বলে তারা নবাবকে ব্যস্ত করে তোলে। আসলে চুক্তি করে শান্তিতে থাকা তো তাদের উদ্দেশ্যই ছিল না। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বাংলা দখল। নবাব আর কী করে সেই চক্রান্তের কথা জানবেন। ফলত তিনি চুক্তির পর থেকে নিশ্চিন্ত হতে চাইলেও এক মুহূর্তের জন্যও তা হতে পারেননি। ধীরে ধীরে নিজের পরিণামের দিকে যাওয়াই ছিল তার কপাল। তিনিও বদলাতে পারেননি নিজেকে। ফলে বিপদের সময় তার পাশে কেউ থাকবে এমন ব্যক্তি তামাম মুর্শিদাবাদের ছিল তখন হাতে গোনা। তাই সেই সময় কোনো একজনকে বিশ্বাসও তিনি চোখ বুজিয়ে করতে পারতেন না। এমন অবস্থায় তার পক্ষে মুর্শিদাবাদের মসনদ ধরে রাখা একরকম ছিল প্রায় অসাধ্য। আর সেই সুযোগেই নিজেদের পথ পরিষ্কার করেছে ইংরেজ। ধীরে ধীরে মুর্শিদাবাদ এগিয়ে গেছে তার নিয়তির দিকে।