সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ২৩)

কেল্লা নিজামতের পথে

খোসবাগের ভেতরটা আজও ভীষণ সুন্দর। সামনের মুখ্য দরজা থেকে পরপর লম্বালম্বি অনেকগুলো দরজা। তাকালে একদম সোজা দেখা যায় অনেকটা ভেতরে অবস্থিত নবাব আলীবর্দী, নবাব সিরাজের কবরকক্ষটি। আর একদম পেছনে নবাব আলীবর্দী খাঁর বানানো মসজিদ। হেঁটে যাবার পথে পরপর অনেকগুলো সমাধি। একদম প্রথমে আলীবর্দীর মায়ের। তাঁর সমাধির জন্যই প্রথম খোসবাগ তৈরি করেন আলীবর্দী। এরপর তাঁর বংশের সবকটি কবর দেওয়া হয় সেখানেই। গাইডরা অনেকে অনেক কথাই বলেন। কিন্তু এসবের পিছনে যে যুক্তি অনেকটাই কম তা আগেই বলেছি। যেমন ঘসেটি বেগম ও আমিনা বেগম যেখানে পলাশীর যুদ্ধের পর ঢাকার জিঞ্জিরা প্রাসাদে বন্দী ছিলেন এবং সেখানেই বুড়িগঙ্গার জলে তাদেরকে ডুবিয়ে মারা হয়। আর সূদুর ঢাকার কাছে ডুবন্ত মৃতদেহ মুর্শিদাবাদের খোশবাগে এনে সমাধি দেয়া হলো, এ তথ্য অনেকটাই অতিরঞ্জিত বলেই মনে হওয়া স্বাভাবিক নয় কি? এরকম আরও কত অসামঞ্জসতা। মাটির নীচে শুয়ে থাকা মুর্শিদাবাদ এক রকম। আর উপরের গল্প গুলো যেন আর একটা প্যারালাম হিস্ট্রি জোন। অর্থাৎ সবটাই নিজেদের মত করে নিজেদের স্বার্থে বিরচিত।
আগেই বলেছি, আলীবর্দীর শাসনকাল শান্তির ছিল না। নিজের রাজত্বের পুরোটা সময় বাড়াটা দস্যুদের বাংলা আক্রমণ তো ছিলই। কিন্তু তারপরেও আলীবর্দির জন্য অপেক্ষা করেছিল আর এক ভয়ানক খবর। বিহারের শাসনকর্তা তখন সিরাজের বাবা জৈনুদ্দিন আহমেদ খান৷ মানুষ হিসেবে তিনি খুব একটা রাজনৈতিকভাবে ঘোরালো পেঁচানো স্বভাবের নন। সবকিছু সাদামাটা ভাবে ভাবতেই ভালোবাসেন৷ কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি এতোই কাঠামোহীন যে সরলতার জায়গা বড় কম। জৈনুদ্দিনেরও হল তাই৷ বিহারে তখন আলীবর্দীর দরবার থেকে বিতাড়িত কিছু আফগান সৈন্য বিক্ষুব্ধ হয়ে দল গড়েছেন। আর ঠিক তখনই বিহারে রয়েছেন জৈনুদ্দিন। এদিকে জইনুদ্দিন তখন ভাবলেন এই সৈন্যদের সঙ্গে বসে একটা বোঝাপড়া করে নেওয়া খুব দরকার। যা ভবিষ্যতে রাজ্য শাসনের ক্ষেত্রে পথ সুগম করবে। তো সেই মতো মর্মে আবেদন পাঠানো হলো আলীবর্দী খাঁকে। প্রথমটায় গররাজি হলেও পরে জামাই এর অনুরোধে তিনি আর না করতে পারলেন না। এদিকে আফগান সৈন্যদের দরবারে ডেকে বসলেন জৈনুদ্দিন। আর আলোচনার ফাঁকেই সব সৈন্যরা নির্মমভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল জৈনুদ্দিন আহমেদের উপর। নৃশংসভাবে হত্যা করল তাকে। এক কথায় যার বর্ণনা দেওয়া অসম্ভব। শুধু তাকেই নয়, হত্যা করা হলো আলীবর্দির দাদা এবং জৈনুদ্দিন আহমেদের বাবা হাজী আহমেদকে। গ্রেপ্তার হলেন আমিনা বেগম। পুরো শহরে প্রকাশ্য রাস্তায় মৃতদেহ ঘোরানো হল। এই ছিল সে যুগের এক রীতি। শাসক কে হত্যা করে প্রকাশ্যে তা প্রদর্শন না করলে যেন যুদ্ধ জয়ের আনন্দ অসম্পূর্ণ থেকে যেত। তাই হত্যার পর মৃতদেহকে প্রদর্শনীর মতো ব্যবহার করা ছিল সে যুগের এক যুদ্ধজয়ের কীর্তি। এরপর নগরের কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে নিল আফগানরা। এদিকে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড নাড়িয়ে দিয়েছিল মুর্শিদাবাদে থাকা আলীবর্দীকে। দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য অবস্থায় তিনি ছুটলেন বিহার। কিন্তু তার তখন চলবার শক্তিও যেন নেই৷ তবু বিহার গিয়ে আফগানদের দাঁড়িয়ে উদ্ধার করলেন নিজের জমি। বিহারের শাসন করতে হলো সিরাজ। আর তার সহায়তায় রইলেন জানকী রাম৷ এই গেল তাঁর সাজানো সাম্রাজ্য। দিনের পর দিন শত্রুদের আক্রমণে যা জেরবার হয়ে উঠেছিল। আবার তার দক্ষতাতেই তা হয়েছে শাপমুক্ত। জৈনুদ্দিনের এই অস্বাভাবিক মৃত্যু কোনদিনই মেনে নিতে পারেননি নবাব আলীবর্দী। স্বভাবতই বেগম সরফুন্নেসা বেগমও ডুবে থাকতেন শোকের সাগরে। এই অন্ধকার যেন কোনদিনই কাটেনি ওই বৃদ্ধ দম্পতির বুকে। এদিকে ঘরের অশান্তি বলতে তখন মূর্তিমান সিরাজ স্বয়ং৷ তাকে নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। তার সমস্ত অত্যাচার সহ্য করে তাকে স্নেহ দিয়ে বড় করে তোলাও আলীবর্দীর জীবনের যেন এক অধ্যায়৷ সেই অধ্যায়ও বর্ণময়৷ সিরাজ একদিনে বাঙালী সমাজের কাছে ত্রাস হয়ে ওঠেনি। সিরাজের অনেক গুণ। যুদ্ধবিদ্যায় সে পারদর্শী। সৈন্যচালনায় দে দক্ষ। রাজত্ব সামলানোয় সে কঠোর। অপরাধীর কাছে সে বিচারক। কিন্তু তাতে আর কি! সবের পরেও সে মুর্শিদাবাদ তথা বাঙালীর কাছে ত্রাস। এমন নাতিকে থামলে শিখিয়ে তাকে পরবর্তী নবাব ঘোষণা করে যাওয়া আলীবর্দীর কাছে ছিল এক নতুন চ্যালেঞ্জ। আলীবর্দী তা চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর আগে আর দেখে যাননি তার প্রিয় নাতির করুন পরিণতি। যে ইংরেজদের থেকে তাকে সাবধানে থেকে কৌশলী পথে এগুলো শিক্ষা দিয়ে গেছিলেন দাদু আলীবর্দী। সিরাজ সেই জায়গাটাতেই করে ফেলেছিলেন মস্ত ভুল। ভুল করে হাত দিয়ে ফেলেছিলেন একেবারে ভিমরুলের চাকে। বাকি ফল তো ইতিহাস বিলক্ষণ জানে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।